অপেক্ষার রুহানি রাত

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

অপেক্ষার রুহানি রাত

রাত অদ্ভুত। বড় অদ্ভুত এই হাসপাতালের রাত
।

চারপাশ যখন নিস্তব্ধতায় ঢেকে যায়, তখন এক অন্য জগৎ নেমে আসে এখানে। ছাতকের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর বুকে তখন মেঘের দীর্ঘশ্বাস। একটানা বৃষ্টির শব্দে পুরো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন এক ঘোরের মধ্যে ডুবে থাকে। বাইরের স্যাঁতসেঁতে, ভারী বাতাস জানালার কাচে ধাক্কা খায়। আকাশটা যেন এক বিশাল কালো চাদর মুড়ি দিয়ে নীরবে কাঁদছে। তাপমাত্রা হয়তো তিরিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু বাতাসের আর্দ্রতায় এক দমবন্ধ করা ভারি অনুভূতি। সুরমার পানি বিপৎসীমার ষোলো সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। ঠিক তেমনি যেন উপচে পড়ছে এই হাসপাতালের ভেতরের না-বলা বেদনাগুলো।

কিন্তু এই দেয়ালের ভেতরে, নার্স আয়েশার চোখে কোনো ঘুম নেই। ঘুম তার কাছে এক নিষিদ্ধ নগরী। চারপাশের পৃথিবী যখন গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন সে জেগে থাকে। কাউকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরানোর এক পবিত্র অপেক্ষায় প্রহর গোনে সে।

মাঝেমধ্যে কোনো রোগীর সুস্থতার হাসি দেখে তার বুকটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। আবার কখনো এই নিঃশব্দ রাতটাই কিছু মানুষকে তার হৃদয়ের ক্যানভাসে চিরতরে গেঁথে দেয়। আয়েশার কাছে এই হাসপাতাল কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র নয়। এটি এক রুহানি খানকাহ। এখানে জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি এক ঝুলন্ত সেতুতে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ।

করিডোরের নিভু নিভু আলোয় আয়েশা হেঁটে চলে। তার জুতোর শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। কিন্তু এই নীরবতারও একটি নিজস্ব ভাষা আছে। আয়েশা কান পাতলে শুনতে পায় নীরবতার শব্দ। সেই শব্দে মিশে থাকে অগণিত মানুষের না-বলা প্রার্থনা, অনুশোচনা আর ফিরে পাওয়ার আকুতি।

আয়েশার ভেতরে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য সংঘাত চলে। মানুষের অস্তিত্ব এক অদ্ভুত রণক্ষেত্র। একদিকে 'নফস' বা প্রবৃত্তি, যা তাকে বারবার প্রলুব্ধ করে। আয়েশার ক্লান্ত শরীর যখন অবসাদের ভারে নুয়ে পড়তে চায়, তখন নফস তার কানে ফিসফিস করে বলে— 'বিশ্রাম নাও। পৃথিবী এখন ঘুমের কোলে সমর্পিত, তুমিও তোমার ক্লান্ত চোখ দুটি বন্ধ করো।' নফসের এই ডাক বড়ই শক্তিশালী, বড়ই আদিম।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার 'কলব' বা হৃদয়ের গহিন থেকে এক ঐশী স্পন্দন জেগে ওঠে। কলব হলো সেই পবিত্র আয়না, যেখানে স্রষ্টার নূর প্রতিফলিত হয়। আর তার 'রূহ' বা আত্মা, যা সরাসরি মহান প্রভুর আদেশে সৃজিত, তা এক অদৃশ্য ইশকের টানে আর্তনাদ করে ওঠে। রূহ যেন বলে ওঠে— 'কীসের ঘুম? সৃষ্টির সেবায় নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার মাঝেই তো প্রকৃত মারেফাত লুকিয়ে আছে।' নফস, কলব আর রূহের এই ত্রিমুখী সংঘাতে আয়েশার কলব সবসময় রূহের পক্ষ নেয়।

তার ভেতরের নফসে আম্মারা (অবাধ্য প্রবৃত্তি) ধীরে ধীরে নফসে মুতমাইন্নাহ (প্রশান্ত আত্মা)-তে রূপান্তরিত হতে থাকে। সে যখন রোগীদের চার্ট মেলায়, তখন তার মনে হয় সে যেন মানুষের আত্মার স্তরগুলো মেলাচ্ছে। সে হাঁটে। সাত নম্বর ওয়ার্ডের দিকে।

মাঝরাতে যখন সে কোনো যন্ত্রণাকাতর রোগীর কপাল থেকে ঘাম মুছে দেয়, তখন তার চোখের সামনে বাস্তবতার সীমারেখা মুছে যায়। সে স্পষ্ট দেখতে পায়, রোগীর কপালের সেই ঘামের বিন্দুগুলো সাধারণ কোনো তরল নয়। তা যেন নূরের ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গ হয়ে জ্বলে ওঠে, নিভিয়ে দেয় যন্ত্রণার আগুন। কখনো কোনো রোগীর ব্যথাতুর দীর্ঘশ্বাসে সে দেখতে পায় এক অলৌকিক দৃশ্য। সেই দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই হাসপাতালের হিমশীতল মেঝের ওপর, এক শুকনো কাল্পনিক মরুভূমিতে হঠাৎ করেই ফুটে ওঠে ধবধবে সাদা বিশ্বাসের ফুল।

এই দৃশ্যগুলো তাকে অবাক করে না। সে জানে, ইশকে ইলাহির পথে হাঁটলে চোখের পর্দা সরে যায়। তখন সাধারণ জগতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মারেফাতের জগত দৃশ্যমান হয়।

সাত নম্বর বিছানায় শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ।

তার শরীর জীর্ণ। শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত দুর্বল। ছাতকের সুরমা নদীর পানি যেমন বর্ষায় ফুলে-ফেঁপে ওঠে, ঠিক তেমনি এক অজানা আধ্যাত্মিক প্রেমে তার বুকটা কাঁপছে। তার রোগটা শারীরিক নয়, তার রোগটা বিরহের। প্রভুর সাথে মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তার প্রতিটি শ্বাস যেন জিকিরে পরিণত হয়েছে। ছাতক ও সুনামগঞ্জের মরমী মাটি, যেখানে দুর্বীন শাহ আর ক্বারী আমীর উদ্দিনের মতো সাধকেরা ইশকের গান গেয়েছেন, এই বৃদ্ধ যেন সেই মাটিরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আয়েশা ধীর পায়ে তার শিয়রে গিয়ে দাঁড়ায়।

বৃদ্ধের ঠোঁট দুটি শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ফাটল ধরা মাটি যেমন বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকে, তার ঠোঁটও যেন এক ফোঁটা পানির অপেক্ষায়। আয়েশা একটি কাঁচের গ্লাসে পরিষ্কার পানি নিয়ে আসে।

পানির গ্লাসটা হাতে নিতেই আয়েশার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে এক পবিত্র ও বিষাদময় ইতিহাস। আহলুল বাইতের ইতিহাস। কারবালার সেই তপ্ত, জ্বলন্ত প্রান্তর। ফোরাত নদীর তীরে পানির জন্য নবীপরিবারের সেই অবর্ণনীয় হাহাকার। আয়েশার চোখ ভিজে আসে। কত বড় ত্যাগ, কত বিশাল সবর! চরম তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলেও, হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার সত্যের পথ থেকে একচুলও সরে যাননি। আল্লাহর ফয়সালার ওপর কী অটুট তাওয়াক্কুল! সেই পবিত্র রক্তে লেখা আছে রাসূলপ্রেমের (সা.) চরম পরিণতি।

আজ এই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা তৃষ্ণার্ত বৃদ্ধকে দেখে আয়েশার মনে হলো, প্রতিটি মুমিনের ভেতরেই একখণ্ড কারবালা লুকিয়ে থাকে। যেখানে নফসের এজিদ প্রতিনিয়ত রূহের হোসাইনকে তৃষ্ণার্ত করে মারতে চায়। কিন্তু যারা আহলুল বাইতের প্রকৃত অনুসারী, তারা ত্যাগের এই পরীক্ষায় হাসিমুখে উত্তীর্ণ হয়। ইশকের ময়দানে তারা কখনো পিছপা হয় না।

"বাবা, একটু পানি পান করবেন?" আয়েশা নরম গলায় ডাকে।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। কী অদ্ভুত প্রশান্ত সেই চোখ! সে চোখে মৃত্যুর কোনো ভয় নেই, হারানোর কোনো আক্ষেপ নেই। আছে শুধু এক অনন্ত যাত্রার আনন্দ। জোসনার হাসি যেন থমকে আছে তার ওই দৃষ্টিতে।

তিনি আয়েশার হাত থেকে পানির গ্লাসটা নিলেন। এক চুমুক পানি পান করে চোখ বন্ধ করলেন। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

"মা রে," বৃদ্ধ খুব নিচু স্বরে, কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, "এই যে পানি দিয়ে তুই আমার দেহের তৃষ্ণা মেটালি, আল্লাহ যেন তাঁর রহমতের নূর দিয়ে তোর কলবের তৃষ্ণা মিটিয়ে দেন।"

আয়েশা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হলো, এই দোয়া কোনো সাধারণ মানুষের নয়। এই দোয়া আরশ থেকে সরাসরি নেমে আসা কোনো ঐশী বার্তা।

"মৃত্যুকে ভয় করছে না আংকেল?" আয়েশা কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করে।

বৃদ্ধ হাসলেন। সে এক মায়াবী হাসি। "মৃত্যু? মৃত্যু তো কোনো শেষ নয় মা। মৃত্যু হলো এক অনন্ত সুড়ঙ্গের দরজা। সুফিবাদের ভাষায় যাকে 'ফানা' বলে, আমি তো সেই ফানার জন্যই এতকাল অপেক্ষা করেছি। নিজের অস্তিত্বকে, নিজের 'আমি'কে মুছে ফেলাই তো প্রকৃত প্রেম। যতদিন এই নফসের খাঁচায় বন্দি আছি, ততদিন তো আসল স্বাধীনতা নেই। যেদিন এই মাটির দেহ মাটিতে মিশে যাবে, সেদিনই তো আমার রূহ তার আদি ঠিকানায়, মহান রবের দরবারে ফিরে যাবে। এটাই তো 'বাকা' বা অনন্ত জীবন।"

কথাগুলো বলতে বলতে বৃদ্ধের চোখ থেকে এক ফোঁটা অনুতপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আয়েশা অবাক বিস্ময়ে দেখল, এক অলৌকিক দৃশ্য। সেই অশ্রু সাধারণ কোনো নোনা জল নয়। তা যেন এক নূরানী ঝরনা হয়ে বয়ে যাচ্ছে বৃদ্ধের গালের ভাঁজ বেয়ে। সেই ঝরনার আলোয় হাসপাতালের অন্ধকার কোণগুলোও আলোকিত হয়ে উঠল। সেজদার পানিতে যেমন মুমিনের পাপ ধুয়ে যায়, তেমনি এই এক ফোঁটা অশ্রু যেন পৃথিবীর সমস্ত মলিনতাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিচ্ছে। ফানাফিল্লাহর স্তরে পৌঁছে গেলে মানুষের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এবাদতে পরিণত হয়, তার প্রমাণ আয়েশা নিজের চোখেই দেখছে।

"তুমি অনেক রাত জাগো মা," বৃদ্ধ আবার বলতে শুরু করলেন। তার কণ্ঠস্বর এখন আরও দুর্বল হয়ে আসছে। "মানুষের সেবা করো। মনে রেখো, আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করার চেয়ে বড় কোনো ইবাদত নেই। রাসূলে করিম (সা.) বলেছেন, যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না। এই যে রাতের পর রাত তুমি নিজের ঘুম বিসর্জন দিয়েছ, এই ত্যাগের প্রতিটি মুহূর্ত তোমার আমলনামায় নূরের কালিতে লেখা হচ্ছে।"

আয়েশার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। সে তো কেবল তার চাকরিটুকু করছে। কিন্তু এই বৃদ্ধ তার সাধারণ কাজটিকে মারেফাতের এক উচ্চতর স্তরে নিয়ে গেলেন।

রাত আরও গভীর হয়। সুরমা নদীর তীরের হিমেল বাতাস হাসপাতালের জানালার গ্রিল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করে। বাতাসে একটা স্যাঁতসেঁতে বুনো গন্ধ। বাইরে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দগুলো যেন এক ঐক্যবদ্ধ জিকিরের ধ্বনি তুলছে— 'আল্লাহু... আল্লাহু... আল্লাহু।' প্রকৃতির প্রতিটি কণা যেন আজ এক ঐশী প্রেমে মাতোয়ারা।

বৃদ্ধের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি কমতে শুরু করেছে। আয়েশা তার পাশে রাখা মনিটরের দিকে তাকায়। সবুজ রেখাগুলো ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ঘরে কোনো মৃত্যুর শোক বা আতঙ্ক নেই। বরং পুরো ঘরটা এক অবর্ণনীয় প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে।

আয়েশা বুঝতে পারে, সময় ঘনিয়ে এসেছে। সে বৃদ্ধের কানের কাছে মুখ নিয়ে আলতো করে কালেমা শাহাদাত উচ্চারণ করতে থাকে। বৃদ্ধের ঠোঁট দুটিও কাঁপছে। তিনিও নিঃশব্দে পড়ছেন— 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।'

হঠাৎ করেই মনিটরের সবুজ রেখাটা সোজা হয়ে গেল। একটানা একটা তীক্ষ্ণ শব্দ জানান দিল, একটি হৃদপিণ্ড তার চিরস্থায়ী বিশ্রামে চলে গেছে।

কিন্তু আয়েশার কাছে মনে হলো না যে কেউ মারা গেছে। বরং সে তার আধ্যাত্মিক দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেল, বৃদ্ধের শরীর থেকে এক জ্যোতির্ময় রূহ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। সেই রূহটি আর কোনো খাঁচায় বন্দি নয়। তা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন। ঘরের টিউবলাইটের আলো যেন সেই ঐশী তাজাল্লির কাছে ম্লান হয়ে গেল। আয়েশা অনুভব করল, এক উষ্ণ, পবিত্র বাতাস তার পাশ দিয়ে বয়ে গেল। সেই বাতাসে ছিল জান্নাতের সুবাস।

সে গভীর মমতায় বৃদ্ধের চোখ দুটি বন্ধ করে দিল। মুখের ওপর টেনে দিল সাদা চাদর। এই সাদা চাদর কোনো কাফন নয়, এটি যেন এক বিজয়ীর আচ্ছাদন। যে নফসের বিরুদ্ধে আজীবন জিহাদ করে, অবশেষে রবের ডাকে সাড়া দিয়ে ইশকে ইলাহির মহাসাগরে বিলীন হয়ে গেছে।

কিছুক্ষণ পর।

দূরের কোনো এক মসজিদ থেকে ভেসে এল ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি। 'আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার।' সেই ধ্বনি সুরমা নদীর কুয়াশা ভেদ করে, বৃষ্টিস্নাত ছাতকের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলল। 'আস-সালাতু খাইরীল আমাল'— সকল কাজের চেয়ে নামাজ উত্তম। আজানের প্রতিটি শব্দ যেন আয়েশার আত্মাকে স্পর্শ করে যাচ্ছে।

আয়েশা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টি থেমে গেছে। পুব আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাতের কালো মেঘগুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। সেই মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ভোরের সূর্য। কিন্তু আজকের রোদটা অন্যদিনের মতো নয়। এই আলোতে যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা মিশে আছে। আয়েশার মনে হলো, এ যেন রোদের কান্না। এক পবিত্র আত্মার বিদায়ে প্রকৃতিও যেন নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিমের আকাশে বিলীন হতে যাওয়া চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সেখানে লেগে আছে এক ম্লান জোসনার হাসি— এক চিরস্থায়ী প্রশান্তির হাসি।

হাসপাতালের করিডোরে আবার মানুষের আনাগোনা শুরু হচ্ছে। নতুন দিনের কোলাহল। আয়েশার শিফট শেষ হয়ে আসছে। তার শরীর ক্লান্ত, কিন্তু কলব এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ। সে জানে, আগামীকাল রাতে আবার তাকে এই নিস্তব্ধ করিডোরে ফিরে আসতে হবে। আবার কোনো যন্ত্রণাকাতর মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। আবার শুরু হবে তার অপেক্ষার প্রহর।

কারণ, এই রাতের হাসপাতালটা সত্যিই অদ্ভুত। এখানে নার্সের চোখে ঘুম নয়— কাউকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরানোর, কিংবা কাউকে তার অনন্ত ঠিকানায় সঁপে দেওয়ার এক পবিত্র অপেক্ষা থাকে। আর এই অপেক্ষার প্রহরেই, নিঃশব্দ রাতে, সুরমার তীরে নীরবে ঝরে পড়ে নূরের তাজাল্লি। দীর্ঘশ্বাসগুলো বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগে বলে যায়, প্রেম কখনো মরে না, তা কেবল রূপ বদলায়। ফানা থেকে বাকার দিকে এগিয়ে যায় অনন্ত এক গন্তব্যে।
 

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default