ইসলামের প্রতিটি ইবাদত কেবল বাহ্যিক আচার নয়, বরং তা
আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক একটি সোপান। রোজা বা 'সওম' মুমিনের
আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তাকে 'তাকওয়া'র উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়। তবে এই আধ্যাত্মিক সফর তখনই
সার্থক হয়, যখন তা মহান রবের নির্ধারিত সীমানা বা 'হুদুদুল্লাহ'র যথাযথ
অনুসরণে সম্পন্ন হয়। পবিত্র কুরআনে রোজা পূর্ণ করার যে সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে, তা নিয়ে
গভীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক পর্যালোচনার দাবি রাখে।
কুরআনিক দলিল ও আধ্যাত্মিক ইশারা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা রোজার সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে ইরশাদ
করেছেনঃ
ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ
(সূরা
বাকারা, আয়াতঃ ১৮৭)
অনুবাদঃ
"অতঃপর তোমরা রোজা পূর্ণ করো রাত
পর্যন্ত।"
আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাঃ এখানে 'ইলাল লাইল' (রাত
পর্যন্ত) শব্দবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আধ্যাত্মিক সাধকদের মতে, 'নাহার' বা দিন হলো
জগত ও নফসের ব্যস্ততার প্রতীক, আর 'লাইল' বা রাত হলো মাশুকের (আল্লাহর) সাথে নিভৃত মিলনের সময়।
পূর্ণ অন্ধকার যখন ধরণীকে ঢেকে দেয়,
তখনই মুমিনের অন্তরে দুনিয়াবী কোলাহল
স্তিমিত হয়। সুতরাং রোজা কেবল না খেয়ে থাকা নয়, বরং দিনের আলো ফুরিয়ে রাতের
নিস্তব্ধতা নামা পর্যন্ত ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে নফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
প্রতিষ্ঠা করা।
রাত ও সন্ধ্যার পার্থক্যঃ একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
কুরআনের পরিভাষায় 'লাইল' (রাত) এবং 'শাফাক'
(সন্ধ্যা) এক নয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ
فَلَا أُقْسِمُ بِالشَّفَقِ * وَاللَّيْلِ وَمَا وَسَقَ
(সূরা
ইনশিক্বাক, আয়াতঃ ১৬-১৭)
অনুবাদঃ
"আমি শপথ করছি সন্ধ্যার রক্তিম আভার
এবং রাতের, আর যা কিছু তা ঢেকে নেয় তার।"
এ থেকে স্পষ্ট যে, সূর্যাস্তের পর আকাশে যে লাল আভা (শাফাক) থাকে, তা হলো
সন্ধ্যা। আর এই আভা যখন পুরোপুরি বিলীন হয়ে অন্ধকার ঘনীভূত হয়, তখনই 'লাইল' বা রাত
শুরু হয়। সুফি দর্শনে, যতক্ষণ আসমানে সূর্যের প্রভাব (আলো) থাকে, ততক্ষণ
পূর্ণ সমর্পণ প্রকাশিত হয় না। অন্ধকার আসার অর্থ হলো আমিত্বের বিনাশ এবং রবের
সত্তায় নিমজ্জিত হওয়া।
আহলুল বাইয়েত (আ.) ও সুফি গবেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
হাদিসে সাকালাইনের নির্দেশনানুযায়ী, কুরআন ও আহলুল বাইয়েত
অবিচ্ছেদ্য। আমিরুল মুমিনীন মাওলা আলী (আ.) এবং ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর আমল ও
শিক্ষা থেকে জানা যায়, তাঁরা রোজা পূর্ণ করার ক্ষেত্রে রাতের আগমনকে অত্যন্ত
গুরুত্ব দিতেন।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি
সূর্যাস্তের পর আকাশের পূর্ব দিগন্তের লালিমা (সুফরা) অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা
করতেন। এটিই হলো প্রকৃত 'লাইল' বা রাতের সূচনা।
সুফি দর্শনঃ ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর মতে, ইবাদতের
প্রতিটি সেকেন্ডই আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত। সময়ের আগে ইফতার করা যেন আধ্যাত্মিক
মেহমানদারির দস্তরখান থেকে আগেই উঠে যাওয়া। হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)
শিখিয়েছেন, ধৈর্যই হলো বেলায়েতের চাবিকাঠি। সূর্যাস্তের রক্তিম আভা বিদায় নিয়ে
যখন আঁধার নামে, তখন রোজাদারের অন্তরে যে প্রশান্তি আসে, তা-ই হলো
প্রকৃত ইফতার বা আল্লাহর দিদার।
হাদিসের আলোকবর্তিকা
হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছেঃ
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَঃ إِذَا أَقْبَلَ اللَّيْلُ مِنْ هَا هُنَا، وَأَدْبَرَ النَّهَارُ مِنْ هَا هُنَا، وَغَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ
(সহীহ
বুখারী ও মুসলিম)
অনুবাদঃ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যখন
সূর্য ডুবে যায় এদিক (পূর্ব) থেকে রাত ঘনিয়ে আসে এবং ওদিক (পশ্চিম) থেকে দিন চলে যায়, তখন রোজাদার ইফতার করবে।"
এখানে তিনটি শর্তের সমন্বয় করা হয়েছে। শুধু সূর্য ডোবাই নয়, বরং 'রাতের আগমন' (ইকবালুল
লাইল) নিশ্চিত হওয়া জরুরি। বহু সাহাবী ও তাবেয়ী মাগরিবের সালাত আদায়ের পর ইফতার
করতেন যাতে রোজার পূর্ণতা নিশ্চিত হয়।
সুফি সাধক এবং আধ্যাত্মিক গবেষকদের মতে, রোজা কেবল পানাহার বর্জন নয়, বরং এটি নফসের (প্রবৃত্তি) ওপর রূহের (আত্মা) বিজয়। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত 'এহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন' গ্রন্থে রোজার তিনটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন। সুফি ঘরানার সেই গভীর আধ্যাত্মিক নিয়মগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলোঃ
১. রোজার তিনটি স্তর (মাকামাত)
সুফিগণ রোজাকে সাধারণ উপবাস থেকে পৃথক করে তিনটি স্তরে বিন্যস্ত
করেছেনঃ
- আম রোজা (সাধারণ স্তর): কেবল
পেট ও যৌনাঙ্গের ক্ষুধা নিবারণ থেকে বিরত থাকা। এটি শরীয়তের প্রাথমিক বিধান।
- খাস রোজা (বিশেষ স্তর): চোখ,
কান, জিহ্বা, হাত
ও পা-সহ শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা। একে বলা হয় 'জাওয়ারিহ' বা
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোজা।
- খাসুল খাস রোজা (সর্বোচ্চ
স্তর): অন্তরকে
আল্লাহ ছাড়া অন্য সব চিন্তা (গাইরুল্লাহ) থেকে মুক্ত রাখা। যদি অন্তরে
দুনিয়াবী কোনো তুচ্ছ চিন্তা স্থান পায়,
তবে সুফিদের মতে সেই উচ্চতর রোজা
ভেঙে যায়।
২. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আধ্যাত্মিক সওম
সুফি সাধকগণ ইফতারের আগ পর্যন্ত প্রতিটি অঙ্গের জন্য আলাদা নিয়ম
পালন করেনঃ
- চক্ষুর রোজাঃ যা কিছু আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় বা যা দেখা
নিষেধ, তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া। এমনকি ইবাদতের সময়ও
দুনিয়াবী চাকচিক্যের দিকে না তাকানো।
- জিহ্বার রোজাঃ মিথ্যা,
গীবত (পরনিন্দা), তর্কা-তর্কি
এবং অহেতুক কথা থেকে জবানকে তালাবদ্ধ রাখা। সুফিগণ মনে করেন, গীবত
করলে রোজার আধ্যাত্মিক নূর নষ্ট হয়ে যায়।
- কর্ণের রোজাঃ যা বলা নিষেধ, তা শোনাও নিষেধ।
নিন্দুকের কথা শোনা মানে সেই পাপে অংশ নেওয়া।
৩. ইফতার ও সেহরিতে পরিমিতিবোধ (কিল্লাতুত্ব তায়াম)
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এবং বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর মতে, সারাদিন না
খেয়ে থেকে ইফতারের সময় পেট ভরে হরেক রকম খাবার খাওয়া রোজার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত
করে।
- আধ্যাত্মিক যুক্তিঃ যদি ইফতারের সময় সারাদিনের খতিয়ে যাওয়া খাবার উসুল
করে নেওয়া হয়, তবে নফস বা রিপুগুলো দমনের পরিবর্তে আরও
শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
- নিয়মঃ সুফিগণ ইফতারে সামান্য পানি বা খেজুর গ্রহণ করতেন
এবং পেটের এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখতেন যাতে রাতে 'তাহাজ্জুদ' ও
'জিকির'-এ অলসতা না আসে।
৪. ‘মুরাকাবা’ ও ‘দায়েমি জিকির’
সুফি সাধকদের রোজা কেবল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়, বরং তা ২৪
ঘণ্টার ইবাদত।
- তারা শ্বাস-প্রশ্বাসের
সাথে আল্লাহর জিকির (জিকরে কালবি) জারি রাখেন।
- মুরাকাবাঃ ইফতারের আগে এবং সেহরির পরে তারা নিভৃতে বসে ধ্যান
করেন যে, আল্লাহ তাদের দেখছেন। এই অনুভুতিকেই 'ইহসান' বলা
হয়।
৫. আহলুল বাইয়েত (আ.)-এর রোজা ও ত্যাগ
মওলা আলী (আ.) এবং মা ফাতিমা (সা.আ.)-এর সেই বিখ্যাত ঘটনা সুফিদের
প্রেরণা, যেখানে তাঁরা নিজেরা রোজা রেখে ইফতারের খাবার ক্ষুধার্ত এতিম, মিসকিন ও
বন্দীকে দিয়ে দিয়েছিলেন এবং শুধু পানি দিয়ে ইফতার করেছিলেন।
- শিক্ষাঃ নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার
দেওয়া (ঈসার) হলো সুফিদের রোজার অন্যতম প্রধান রুকন।
৬. ইফতারের মোক্ষম সময়ে আল্লাহর দিদার
সুফিগণ মনে করেন, ইফতারের সময়টি হলো মাশুকের (আল্লাহর) সাথে মিলনের
মুহূর্ত। তাই তারা এই সময়ে দুনিয়াবী গল্পগুজব না করে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে
আল্লাহর করুণার অপেক্ষা করেন। আমাদের পূর্বের প্রশ্নে উল্লিখিত 'রাত
পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করা'র যে তাত্ত্বিক বিষয়টি ছিল, সুফিগণ সেই
অন্ধকার নামা পর্যন্ত অপেক্ষা করাকে আল্লাহর নূরে বিলীন হওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখেন।
সুফিদের কাছে রোজা হলো একটি আয়না, যা দিয়ে নিজের ভেতরের পশুত্বকে
চেনা যায়। তারা বলেন, "তাকওয়া কেবল খাবারের অভাবে আসে না, বরং তা আসে
আল্লাহর মহব্বতে নিজের আমিত্বকে কুরবানি করার মাধ্যমে।"
আমার প্রিয় পাঠক ও সালিকগণ,
ইবাদত কেবল একটি যান্ত্রিক পালন নয়, এটি একটি
প্রেমের পরীক্ষা। কুরআন যেখানে 'রাত পর্যন্ত'
রোজা পূর্ণ করার আদেশ দিয়েছে, সেখানে
সামান্য তড়িঘড়ি করে নিজের আমলকে ঝুঁকির মুখে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
তাকওয়া হলো সেই সূক্ষ্মবোধ যা মানুষকে আল্লাহর নির্ধারিত সীমানার
ব্যাপারে সচেতন করে। আসুন, আমরা লোকদেখানো বা প্রচলিত রীতির ঊর্ধ্বে উঠে পবিত্র
কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ এবং আহলুল বাইয়েতের পবিত্র জীবনাদর্শের আলোকে আমাদের
রোজাগুলোকে পূর্ণতা দান করি। সন্ধ্যা আর রাতের পার্থক্যের মাঝে যে আধ্যাত্মিক
রহস্য লুকিয়ে আছে, তা উপলব্ধি করাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর সন্তুষ্টি মাফিক আমল করার তাওফিক দান করুন। এলাহী আমিন।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।