সিলেটের আকাশ
তখন শরতের মেঘেদের মিছিলে সাদা। ইহসানের মনে হচ্ছিল, সেই মেঘগুলো আসলে
মেঘ নয়, বরং গৃহহীন মানুষদের দীর্ঘশ্বাস। গত তিন মাস ধরে এক
চিলতে ছাদের খোঁজে সে আর তার স্ত্রী সুরাইয়া যেন কোনো এক অনন্ত গোলকধাঁধায় বন্দি।
শহরের প্রতিটি
গলির মোড়ে ‘টু-লেট’ লেখা বোর্ডগুলো তাদের কাছে মনে হয় এক একটি উপহাস। কখনো ভাড়া
যেন আকাশের চাঁদ ছোঁয়ার স্পর্ধার মতো, আবার কখনো সস্তায় যা
মেলে তা মানুষের বাসযোগ্য নয়—যেন কোনো এক বিষণ্ণ গুহা। ইহসানের মনে হয়, সিলেটের বৃষ্টিগুলো আসলে আকাশ থেকে ঝরে পড়া নোনা জলের কান্না, যারা মাটি খুঁজে পায় না।
একদিন বিকেলে
সুরাইয়া যখন ফেসবুকে আঙুল বোলাচ্ছিল, ঠিক তখনই সেই জাদুকরী
বিজ্ঞাপনটি চোখে পড়ল। একটি বাসা—নাম যেন তার ‘নূরের কুটির’। বাড়ির মালিকের
কণ্ঠস্বর ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল ঠিক যেন কোনো পুরনো গ্রামোফোন রেকর্ডের মিহি
সুরের মতো। অতিশয় অমায়িক, বিনীত। ভিডিও কলে বাসাটি দেখে
সুরাইয়ার দুচোখ বিস্ময়ে প্রজাপতির মতো ডানা ঝাপটাতে লাগল। জানলার ওপাশে সবুজ
পাহাড়ের হাতছানি, ঘরের ভেতর রোদ খেলা করছে ঠিক যেন কচি ধানের
শীষের ওপর ভোরের আলো। অথচ ভাড়া? সে তো নামমাত্র।
ইহসান একটু থমকে
দাঁড়াল। অভিজ্ঞতার ধুলোবালি তার মনে সন্দেহের মেঘ জমাল। সে বিড়বিড় করে বলল, "সুরাইয়া, গোলাপ যদি বড্ড বেশি লাল হয়, তবে তার কাঁটাও কি একটু বেশি ধারালো হয় না? এত কম
ভাড়ায় এমন স্বর্গ কি মর্ত্যে সম্ভব?"
কিন্তু সুরাইয়ার
চোখে তখন নতুন বাসায় নতুন সংসারের রঙিন স্বপ্ন। বাচ্চা দুইটা এবার হয়তো শহরের নামী দামি স্কুলে পড়ার সুযোগ পাবে। সেই স্বপ্নের চাপে ইহসান এক বিকেলে অফিস থেকে
ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সাথে ছোট মেয়ে মারিয়া আর সুরাইয়া। তারা যখন বাসাটির সামনে
পৌঁছাল,
মনে হলো চারপাশের বাতাস থেকে চন্দনের ঘ্রাণ আসছে। বাড়ির সিঁড়িগুলো
যেন অপেক্ষারত কোনো পুরনো সুফী সাধকের মতো শান্ত।
মালিক ভদ্রলোক
সামনে এলেন। সাদা জুব্বা, মুখে এক চিলতে মিষ্ট হাসি। যেন এক টুকরো
মেঘের তৈরি মানুষ। বাসাটি দেখালেন তিনি। দেয়ালে দেয়ালে স্মৃতির আল্পনা, কপাটের ফাঁক দিয়ে চুইয়ে পড়ছে প্রশান্তি। সুরাইয়া তো মনে মনে আসবাবপত্রও
সাজিয়ে ফেলেছে। কিন্তু গল্পের মোড় ঘুরল তখনই, যখন ড্রয়িংরুমে
বসে চূড়ান্ত কথা শুরু হলো।
ভদ্রলোক হঠাৎ
গম্ভীর হলেন। তার চোখের মণি দুটো যেন মুহূর্তেই কাঁচের মার্বেলের মতো শীতল হয়ে
গেল। তিনি বললেন, "বাবা ইহসান, বাসা
তোমাদের। তবে একটা ক্ষুদ্র শর্ত আছে। ভেতরের দুটো ওয়াশরুমের একটা আমার অফিসের পিয়ন
আর স্টাফদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। তারা যখন খুশি আসবে, ব্যবহার
করবে।"
মুহূর্তে সেই
সুগন্ধি বাতাস যেন তেতো হয়ে গেল। ইহসানের কানে কথাগুলো বাজল ঠিক যেন শান্ত পুকুরে
কেউ বড় একটা পাথর ছুঁড়ে মেরেছে। সে অবাক হয়ে বলল, "চাচা,
এটা কেমন কথা? পর্দানশীন পরিবার নিয়ে থাকব,
সেখানে বাইরের মানুষ ঘরের ভেতর আনাগোনা করবে? এটা
তো আমার সার্বভৌমত্বে আঘাত!"
অমনি সেই অমায়িক
ভদ্রলোকের মুখোশটা যেন খসে পড়ল। তার মুখের রেখাগুলো বদলে গিয়ে এক নিষ্ঠুর জমিদারের
অবয়ব নিল। তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, "শোন বাবা, এই শহরে মাথার ওপর ছাদ দেওয়াটা হলো করুণা। আমি দাতা, তোমরা গ্রহীতা। আমার শর্তই এখানে শেষ কথা। ফকিরের আবার পছন্দের অধিকার
কিসের?"
কথাগুলো যেন
বিষাক্ত তীরের মতো ইহসানের বুকে বিঁধল। সে দেখল, সেই সুন্দর ঘরের
দেয়ালগুলো থেকে যেন রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। মারিয়ার হাতের খেলনাটা মেঝের ওপর পড়ে গিয়ে
শব্দহীনভাবে ভেঙে গেল। যে ঘরকে তারা স্বর্গ ভেবেছিল, তা আসলে
এক অহংকারী সোনার খাঁচা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অপমানে ভারী হয়ে
উঠল তাদের বুক। ইহসান সুরাইয়ার হাত ধরল। তারা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পেছনে পড়ে রইল
সেই জাদুকরী বাসা আর এক দাম্ভিক মানুষের কদর্য রূপ। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ইহসানের
মনে হলো,
সিলেটের প্রতিটি ইট যেন তাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
রাস্তায় নামতেই
আবার সেই পরিচিত বৃষ্টি শুরু হলো। কিন্তু এবারের বৃষ্টিতে কোনো সুর ছিল না। ইহসান
আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "হে মালিক, তুমি ছাড়া তো আমাদের আর কোনো আশ্রয়দাতা নেই।" শাহজালালের পুণ্যভূমির
আকাশে তখন মাগরিবের আজান ধ্বনিত হচ্ছে। সেই আজানের সুরে এক অদ্ভুত একাকীত্ব ছিল,
আবার ছিল এক পরম আশ্বাস। তারা তিনজনে ভিজতে ভিজতে হাঁটছিল। তাদের
পদচিহ্নগুলো বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু বুকের
ভেতর থেকে যাওয়া সেই গৃহহীন হওয়ার হাহাকারটুকু মোছার মতো কোনো জল পৃথিবীতে নেই।
রাতের অন্ধকারে সিলেট শহরটা যেন এক বিশাল মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে, যেখানে সাধারণ মানুষগুলো কেবলই আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরে মরা ক্লান্ত পথিক।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।