হরমুজ প্রণালীঃ বিশ্ব অর্থনীতি ও ইরানের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0
হরমুজ প্রণালীঃ বিশ্ব অর্থনীতি ও ইরানের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল

পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত এক সংকীর্ণ জলপথের নাম হরমুজ প্রণালী। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল একটি ভৌগোলিক রেখা মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ বা নাড়ি। বর্তমানে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই জলপথটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কেন হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘চোক পয়েন্ট’?
ভৌগোলিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত সংকীর্ণ। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত। কিন্তু এই ক্ষুদ্র পথ দিয়েই বিশ্বের মোট সমুদ্রজাত তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার পরিভাষায় একে বলা হয় ‘গ্লোবাল এনার্জি চোক পয়েন্ট’। অর্থাৎ, এই পথটি সামান্য সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে স্থবির হয়ে যেতে পারে বিশ্ব অর্থনীতি। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ইরান এই ভৌগোলিক সুবিধাকে তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ বিশ্ব জ্বালানি বাজারের চাবিকাঠি
হরমুজ প্রণালীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পার হয়। কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ? তার কয়েকটি কারণ নিচে দেওয়া হলোঃ
তেল ও এলএনজি সরবরাহঃ বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ—সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক এবং কাতার—তাদের জ্বালানি রপ্তানির জন্য এই পথের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
বাজারের স্থিতিশীলতাঃ বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি এই প্রণালীর নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করে। এখানে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হতে পারে।
এশীয় অর্থনীতির নির্ভরতাঃ চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর শক্তির প্রধান উৎস আসে এই পথ দিয়ে।
কৌশলগত ও সামরিক অবস্থানঃ ইরান বনাম মার্কিন ৫ম নৌ-বহর
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান এবং ওমানের মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বিদ্যমান। তবে কৌশলগতভাবে ইরান এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ইরানের সক্ষমতাঃ ইরানের নৌ-বাহিনী এই সংকীর্ণ পথে বড় জাহাজের পরিবর্তে দ্রুতগামী ছোট নৌযান (Speedboats) এবং সামুদ্রিক মাইন (Mines) ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে। যা এই পথে চলাচলকারী বিশাল তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য বড় হুমকি।
আমেরিকার উপস্থিতিঃ অন্যদিকে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ৫ম নৌ-বহর (US 5th Fleet) এই জলপথের নিরাপত্তা এবং অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে। ফলে এই অঞ্চলে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য স্নায়ুযুদ্ধ চলে।
ইরানের ‘ট্রাম্প কার্ড’ বা তুরুপের তাস
ইরান কেন হরমুজ প্রণালীকে তাদের প্রধান হাতিয়ার মনে করে? এর পেছনে রয়েছে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা।
১. নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাবঃ যখনই আমেরিকা বা পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ইরান পাল্টা এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
২. বিশ্ব অর্থনীতিতে ভীতিঃ ইরান জানে, তারা যদি এই পথটি বন্ধ করে দেয়, তবে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৩০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ভয়টিকেই তারা দরকষাকষির টেবলে 'শেষ চাল' হিসেবে ব্যবহার করে।
সাফল্যের সম্ভাবনাঃ বাস্তববাদ বনাম সীমাবদ্ধতা
রাজনৈতিক 'রিয়েলিজম' বা বাস্তববাদের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরানের এই কৌশলের যেমন সাফল্য আছে, তেমনি রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা।
সাফল্যের সম্ভাবনা
যদি ইরান সফলভাবে এই পথটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে তারা আমেরিকাকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে পারবে। তেলের দাম বাড়লে পশ্চিমা দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে, যা জোরালো রাজনৈতিক চাপের সৃষ্টি করবে।
সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি
মিত্রদের অসন্তুষ্টিঃ চীন ইরানের অন্যতম বড় মিত্র। ইরান যদি পথ বন্ধ করে দেয়, তবে চীনের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে ইরান তার গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুদের হারাতে পারে।
বিকল্প পথঃ বর্তমানে সৌদি আরব এবং ইউএই লোহিত সাগর বা পাইপলাইনের মাধ্যমে বিকল্প পথে তেল পাঠানোর চেষ্টা করছে, যা হরমুজের গুরুত্ব কিছুটা কমাতে পারে।
সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক আইন
হরমুজ প্রণালীতে কোনো ভুল পদক্ষেপ বড় ধরনের যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ যেখানে সব দেশের জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার (Freedom of Navigation) রয়েছে। ইরান যদি এই অধিকার খর্ব করে, তবে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হবে এবং এর ফলে আমেরিকা বা ন্যাটো জোট সরাসরি সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারে।
সংকট ও সমাধানঃ স্থিতিশীলতার কার্যকর উপায় (Path to Resolution)
হরমুজ প্রণালীর সংকট কেবল সামরিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী কৌশলঃ
কূটনৈতিক সংলাপঃ পরমাণু চুক্তি বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে উত্তেজনা কমবে।
আঞ্চলিক জোটঃ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা, যাতে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই এই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
জ্বালানি বৈচিত্র্যঃ বিশ্বকে ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হতে হবে, যাতে একটি নির্দিষ্ট জলপথের ওপর নির্ভরশীলতা কমে।
পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালী কেবল একটি ভৌগোলিক সংকীর্ণ পথ নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষাকারী দণ্ড। নিকট ভবিষ্যতে এই প্রণালীর গুরুত্ব কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি তেলের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততক্ষণ ইরান এই ‘তুরুপের তাস’ ব্যবহার করতে থাকবে। তবে সংঘাত এড়াতে বিশ্ব নেতাদের উচিত সামরিক শক্তির আস্ফালন কমিয়ে টেকসই কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটা।

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default