স্পেনের সিউটা (Ceuta) অভিবাসী কাণ্ড ও মানবিক বিপর্যয়: নেপথ্যের ভূ-রাজনীতি ও নফসের প্রবঞ্চনা

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

স্পেনের সিউটা (Ceuta) অভিবাসী কাণ্ড ও মানবিক বিপর্যয়: নেপথ্যের ভূ-রাজনীতি ও নফসের প্রবঞ্চনা

শুরুটা হোক সমুদ্রের গর্জনের কথা দিয়ে। আটলান্টিকের হিমশীতল স্রোত আর ভূমধ্যসাগরের মোহনায় জিব্রাল্টার প্রণালীর কাছে যখন রাতের আঁধার নামে, তখন ঢেউয়ের শব্দে মিশে থাকে অসংখ্য মানুষের নীরব কান্না। মরক্কোর উপকূল থেকে স্পেনের ছিটমহল সিউটার (Ceuta) দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু এই সামান্য জলপথটুকুই হাজারো মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে জীবন আর মৃত্যুর এক ভয়ানক সীমারেখা। একটু উন্নত জীবন, একটু সুখের আশায় মানুষ যখন উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়, তখন সভ্যতার দিকে তাকিয়ে একটি প্রশ্নই বারবার মনে জাগে—মানুষ তার নিজের জীবনের চেয়েও কি মরীচিকার মোহে বেশি অন্ধ?
স্বপ্নের মোড়কে মৃত্যুর ফাঁদ এবং নফসের দাসত্ব
উন্নত জীবনের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা যখন অন্ধ মোহ বা 'নফস'-এর চরম দাসত্বে পরিণত হয়, তখন মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মরক্কো থেকে স্পেনে পৌঁছানোর জন্য পিঠে স্রেফ একটি প্লাস্টিকের বোতল বেঁধে, কিংবা রাবারের টায়ারে ভেসে মানুষ যে মৃত্যুকূপে ঝাঁপ দিচ্ছে, তা আমাদের একটি রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পার্থিব সুখ, চাকচিক্য আর ইউরোপীয় সমৃদ্ধির জন্য মানুষ কতটা মরিয়া হলে নিজের অমূল্য জীবনকে এভাবে তুচ্ছ করতে পারে?
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এক মহৎ উদ্দেশ্যে, তাকে দিয়েছেন বিবেক ও 'আশরাফুল মাখলুকাত' বা সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা। কিন্তু ভোগবাদী পৃথিবীর চাকচিক্য মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, সে তার সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে কেবলই পার্থিব সুখের পেছনে ছুটছে। নফসের এই অন্ধ প্রবৃত্তি কেবল আত্মঘাতীই নয়, বরং এটি এক সুস্পষ্ট মানবিক বিপর্যয়। যখন মানুষ তার মানবিকতা ও বিবেকের ঊর্ধ্বে গিয়ে কেবল বস্তুগত সুখের আশায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে, তখন তা মহান আল্লাহর মানব সৃষ্টির মহান উদ্দেশ্যকেই প্রকটভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
ভূ-রাজনীতির দাবাখেলা: পর্দার আড়ালের কুশীলব
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের হিসেবে যখন এই ঘটনার গভীরে দৃষ্টিপাত করা হয়, তখন কেবল মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাই এর একমাত্র কারণ হিসেবে প্রতিভাত হয় না। এই মানবিক বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে এক সুকৌশলী ও নিষ্ঠুর ভূ-রাজনৈতিক দাবাখেলা। স্পেনের সিউটা সীমান্তে হঠাৎ করে হাজার হাজার অভিবাসীর ঢল কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র।
সমসাময়িক বিশ্বে স্পেন যখন ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে মানবিকতার পক্ষে একটি জোরালো অবস্থান নিয়েছে, ঠিক তখনই মরক্কো হাঁটছে ভিন্ন পথে। মরক্কো ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বা 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর চুক্তি করেছে, যার নেপথ্যে ছিলেন 
 মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্পেনের এই ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের চরম প্রতিশোধ নিতেই মরক্কো সীমান্ত শিথিল করে অভিবাসীদের স্পেনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। এই সমীকরণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সুকৌশলী চাল থাকাটা একেবারেই অমূলক নয়। স্পেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করতে নিরীহ অভিবাসীদের গুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে মানবিক বিপর্যয়ের রূপকার
আজকের বিশ্ব পরিস্থিতিতে এটি অত্যন্ত সুম্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আগ্রাসী নীতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সারা বিশ্বেই এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং ফিলিস্তিনের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনকে দুর্বল করতে তিনি এমন এক ভূ-রাজনৈতিক জাল বুনেছেন, যেখানে আটকা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। মরক্কোর সাধারণ যুবকদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কেবল স্পেনকে শায়েস্তা করার জন্য। এর চেয়ে বড় অমানবিকতা আর কী হতে পারে? মানুষের জীবন আজ পরাশক্তিগুলোর কাছে দাবার বোর্ডের চেয়ে বেশি কিছু নয়।
মানবতার কান্নার প্রহর
আজকের এই পৃথিবীতে মানুষের জীবনের মূল্য যেন সবচেয়ে সস্তা পণ্য। একদিকে নফসের তাড়নায় উন্নত জীবনের অন্ধ মোহ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে সাগরের অতল গহ্বরে, অন্যদিকে ক্ষমতালিপ্সু রাষ্ট্রনায়কদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সেই মৃত্যুকে করছে ত্বরান্বিত। সিউটার এই অভিবাসী সংকট কেবল একটি সীমান্ত সমস্যা নয়, এটি বিশ্ববিবেকের কাছে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
যতদিন পর্যন্ত মানুষ তার নফসের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে না পারবে, এবং বিশ্বনেতারা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতাকে স্থান না দেবেন, ততদিন ভূমধ্যসাগরের নোনা জল নিরীহ মানুষের অশ্রু আর রক্তে ভারী হতেই থাকবে। এই নির্মম সত্য আমাদের কাঁদায়, আমাদের ভাবায় এবং মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর শঙ্কার জন্ম দেয়। মানুষ যদি তার স্রষ্টার দেওয়া বিবেককে জাগ্রত না করে, তবে এই সুন্দর পৃথিবী অচিরেই এক সুবিশাল বধ্যভূমিতে পরিণত হবে।

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default