সম্পাদকের পছন্দ
এই সপ্তাহের সেরা
সমর্পণ
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
মহাকালের দর্পণ
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
যান্ত্রিক সম্মতির হাসি
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
ফেরা
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
দিশা
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
ছায়া মন্ত্রিসভাঃ সংসদীয় গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬
সোনার খাঁচার অদ্ভুত শর্ত
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬
সর্বশেষ লেখা
8

ঋণ
বিকেলের মরে আসা আলোটা যেন আজ বড্ড ফ্যাকাশে। জালাল সাহেব তার দামি চামড়ার চেয়ারটায় বসে আছেন। ঘরের ভেতর পিনপতন নীরবতা। কিন্তু জালাল সাহেবের কানে এই নীরবতার শব্দ যেন হাতুড়ির মতো আঘাত করছে। তিনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন, শূন্যতার ভেতর থেকে কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। তিনি নিজের হাতের দিকে তাকালেন। কোনো রক্ত নেই। কোনো ময়লা নেই। তবু তার মনে হলো, তার দশ আঙুল বেয়ে টপ টপ করে ঝরছে গাঢ়, অদৃশ্য এক কালি। নোংরা পলিটিক্স আর দুর্ব্যবহারের কালি। তিনি বেসিনের কাছে ছুটে গেলেন। কল ছেড়ে আপ্রাণ চেষ্টায় পানি দিয়ে হাত ধুলেন। একবার, দুবার, তিনবার। কিন্তু পানির স্পর্শে চামড়া পরিষ্কার হলেও, কালবের গভীরে লেগে থাকা সেই কালো দাগটা যেন আরও গাঢ় হলো।
জালাল সাহেব আয়নার দিকে তাকালেন। সেখানে নিজের প্রতিবিম্বের বদলে তিনি দেখলেন এক কুৎসিত, ক্ষুধার্ত নেকড়েকে। ইমাম গাজ্জালি ঠিকই বলেছিলেন, 'নফস-এ-আম্মারা' বা মানুষের কুপ্রবৃত্তি যখন তার আত্মাকে গ্রাস করে, তখন মানুষের ভেতরের পশুটা আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। জালাল সাহেব শিউরে উঠলেন। তার বুকের ভেতর একটা তীব্র হাহাকার জন্ম নিল।
দীর্ঘদিন ধরে একটা ভুল ধারণার ওপর তিনি তার জীবনের ইমারত গড়েছিলেন। তিনি ভাবতেন, ঋণ কেবল টাকা-পয়সার হয়। ব্যাংক থেকে লোন নিলে কিস্তি দিতে হয়, পরিচিত কারও কাছ থেকে ধার নিলে তা সুদে-আসলে মেটাতে হয়। কিন্তু দুনিয়ার সবচেয়ে ভারী ঋণ যে টাকার নয়, তা তিনি আজ বুঝতে পারছেন। ঋণ আচার-আচরণেরও হয়। ঋণ হয় ব্যবহারের। ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট দিলে, কারও আত্মসম্মানে আঘাত করলে, সেই আঘাতের ঋণও জমা হতে থাকে মহাকালের এক অদৃশ্য খাতায়।
টাকার ঋণ কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়। কিন্তু অহংকার, দুর্ব্যবহার আর নোংরা পলিটিক্স দিয়ে কারও জীবন থেকে যে হাসিটা কেড়ে নেওয়া হয়, তার কিস্তি কীভাবে শোধ করবে মানুষ? জালাল সাহেব আজ সেই কিস্তির চাপে পিষ্ট হচ্ছেন।
বছর তিনেক আগের কথা। জালাল সাহেব তখন অফিসের প্রতাপশালী কর্মকর্তা। তার নফসের দম্ভ তখন আকাশ ছুঁয়েছে। সেই অফিসে সদ্য যোগ দিয়েছিল যায়েদ। শান্ত, নম্র এবং মারেফাতের আলোয় আলোকিত এক তরুণ। যায়েদের চোখেমুখে সবসময় একটা অদ্ভুত প্রশান্তি লেগে থাকত। সে কারও সাথে প্রতিযোগিতায় যেত না। দুনিয়ার মোহ তাকে ছুঁতে পারেনি। কিন্তু জালাল সাহেবের কাছে যায়েদের এই প্রশান্তিটাই যেন চোখের বালি হয়ে উঠল। নফস সবসময় রুহানিয়াতকে ভয় পায়, তাকে ধ্বংস করতে চায়। জালাল সাহেব অত্যন্ত সুকৌশলে, নোংরা পলিটিক্সের জাল বিছিয়ে যায়েদকে সবার সামনে অপমান করলেন। এমন এক মিথ্যা অপবাদ দিলেন, যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
সেদিন অফিসের ভরা মিটিংয়ে যায়েদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। তার চোখের কোণে কোনো জল ছিল না, মুখে কোনো প্রতিবাদ ছিল না। সে শুধু একবার চোখ তুলে জালাল সাহেবের দিকে তাকিয়েছিল। সেই দৃষ্টিতে কোনো ক্রোধ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত সমর্পণ। আহলুল বাইতের অনুসারীদের মতো এক হিমালয়সম ধৈর্য। কারবালার প্রান্তরে নবীপরিবার যে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে ধৈর্যের যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন, যায়েদের সেই নীরবতায় যেন তার এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছিল।
যায়েদ সেদিন কোনো কথা বলেনি। সে শুধু বলেছিল, "আল্লাহ অন্তর্যামী। তিনি সবার হিসাব রাখেন।"
যায়েদ চলে যাওয়ার পর জালাল সাহেব ভেবেছিলেন তিনি জিতে গেছেন। তার পদোন্নতি হলো, ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ল, সমাজে প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ল। আল্লাহ তাকে ছাড় দিচ্ছিলেন। হ্যাঁ, আল্লাহ ছাড় দেন। তিনি দড়িটা আলগা করে দেন। বান্দাকে সময় দেন ফিরে আসার জন্য। কিন্তু তিনি কখনো ছেড়ে দেন না। 'ওয়াল্লাহু সারিউল হিসাব'—আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত।
মাস ঘুরতেই জালাল সাহেবের জীবনের চাকা উল্টো ঘুরতে শুরু করল। বাইরে থেকে তাকে সুখী মনে হলেও, ভেতর থেকে তিনি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে লাগলেন। তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল। দামি বিছানায় শুলেই তার মনে হতো, ম্যাট্রেসের ভেতর থেকে হাজার হাজার কাঁটা তার শরীরে বিঁধছে। মেঘের দীর্ঘশ্বাস যেমন আকাশকে ভারী করে তোলে, তেমনি যায়েদের সেই না-বলা দীর্ঘশ্বাস জালাল সাহেবের পুরো অস্তিত্বকে এক দমবন্ধ করা অন্ধকারে ঢেকে দিল।
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেত তার। তিনি দেখতেন, তার ঘরের সিলিং থেকে টপ টপ করে কী যেন পড়ছে। পানি নয়, রক্ত নয়, সেগুলো ছিল জমাট বাঁধা অন্ধকার। ম্যাজিক রিয়ালিজমের এক অদ্ভুত জগতে তিনি যেন আটকা পড়েছিলেন। তার মনে হতো, তার প্রতিটি কটু কথা, প্রতিটি ব্যঙ্গাত্মক হাসি এখন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তারা যেন ছোট ছোট কীটপতঙ্গ হয়ে তার কালবকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
একদিন বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন জালাল সাহেব। আকাশে মেঘ করেছে। হঠাৎ তার মনে হলো, জোসনার হাসি যেমন পৃথিবীকে স্নিগ্ধ করে, তেমনি কারও চোখের জল পৃথিবীকে অভিশপ্ত করতে পারে। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি যায়েদের কাছে ঋণী। এই ঋণ টাকার নয়। এই ঋণ সম্মানের, এই ঋণ অধিকারের। হুকুকুল ইবাদ বা বান্দার হক এমন এক জিনিস, যা আল্লাহ নিজেও ক্ষমা করবেন না, যতক্ষণ না সেই বান্দা নিজে ক্ষমা করছে।
জালাল সাহেবের রুহ চিৎকার করে উঠল। ফানাফিল্লাহ বা আল্লাহর প্রেমে বিলীন হওয়ার আগে মানুষকে ফানাফিল-ইনসান হতে হয়। অর্থাৎ মানুষের অহংকারকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে বিনয়ের চাদর পরতে হয়। জালাল সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন, তাকে যায়েদের কাছে যেতেই হবে। এই অদৃশ্য ঋণের বোঝা নিয়ে তিনি কবরে যেতে পারবেন না।
তিনি খোঁজ নিয়ে জানলেন, যায়েদ শহর ছেড়ে অনেক দূরে এক অজপাড়াগাঁয়ে চলে গেছে। সেখানে সে একটি ছোট মাদ্রাসায় বাচ্চাদের পড়ায় আর বাকি সময়টা ইবাদতে মশগুল থাকে। জালাল সাহেব গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে গাড়ি যখন গ্রামের মেঠো পথ ধরল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। চারপাশের প্রকৃতি যেন জালাল সাহেবের মনের আয়না হয়ে ধরা দিল। শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি তার কানে মনে হলো নিজের পাপের খতিয়ান পড়ার শব্দ। দূর থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি যেন তার নফসের ওপর এক ঐশী চাবুক হয়ে আছড়ে পড়ল। তিনি অনুভব করলেন, তার ভেতরের পাথর হওয়া হৃদয়টা ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে।
গ্রামের প্রান্তে একটা ছোট টিনের চালার মসজিদ। মসজিদের পাশেই একটা ছোট্ট হুজরা খানা। জালাল সাহেব যখন সেখানে পৌঁছালেন, তখন মাগরিবের নামাজ শেষ। চারদিকে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ। ঝরনার কলকল শব্দের মতো মসজিদের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট খালটির পানির শব্দ কানে আসছিল।
জালাল সাহেব ধীর পায়ে হুজরা খানার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজা সামান্য খোলা। তিনি উঁকি দিয়ে দেখলেন, ভেতরে একটা মাদুর পাতা। আর তার ওপর সেজদায় অবনত হয়ে আছে যায়েদ।
জালাল সাহেব সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মনে হলো, এই দৃশ্যটা দুনিয়ার নয়। যায়েদ যেন ইশকে ইলাহির এক গভীর সমুদ্রে ডুবে আছে। তার অস্তিত্ব দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। সুফিবাদের সেই 'ফানা' স্তরে সে পৌঁছে গেছে, যেখানে নিজের বলতে আর কিছু থাকে না, সবই কেবল প্রভুর।
কিছুক্ষণ পর যায়েদ সেজদা থেকে মাথা তুলল। জালাল সাহেব বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলেন, ম্যাজিক রিয়ালিজমের এক অদ্ভুত দৃশ্য! যায়েদ যে জায়গাটায় সেজদা করেছিল, সেখানকার মাটি ভিজে গেছে। কিন্তু সেটা সাধারণ পানি নয়। সেজদার পানি বা অনুতপ্ত চোখের অশ্রু যেন এক নূরানী ঝরনা হয়ে মৃদু আলো ছড়াচ্ছে। হুজরা খানার আধো অন্ধকারে সেই আলো এসে পড়ল যায়েদের প্রশান্ত মুখে। তার চেহারায় কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো অভিযোগ নেই। সেখানে কেবলই তাজাল্লি বা ঐশী আলোর স্নিগ্ধতা।
দরজায় মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে যায়েদ ফিরে তাকাল। জালাল সাহেবকে দেখে সে এতটুকুও চমকাল না। যেন সে জানত, একদিন এই লোকটিকে আসতেই হবে।
জালাল সাহেব আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে যায়েদের পায়ের কাছে বসে পড়লেন। তার দুচোখ বেয়ে তখন অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরছে। যে চোখ দিয়ে অহংকারের আগুন ঝরত, আজ সেখান থেকে ঝরছে অনুতাপের বৃষ্টি।
"আমাকে মাফ করে দাও যায়েদ," জালাল সাহেবের গলা ধরে এল। শব্দগুলো যেন তার গলা চিরে বেরিয়ে আসছিল। "আমি তোমার কাছে ঋণী। আমি টাকার ঋণ শোধ করতে পারি, কিন্তু তোমার যে সম্মান আমি কেড়ে নিয়েছি, তোমার যে রাতগুলোর ঘুম আমি হারাম করেছি, তার কিস্তি আমি কীভাবে দেব? আল্লাহ আমাকে সময় দিয়েছেন, কিন্তু ছেড়ে দেননি। আমার ভেতরটা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। আমাকে এই ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি দাও।"
যায়েদ শান্ত দৃষ্টিতে জালাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কোনো বিজয়ের হাসি নেই। সে খুব ধীর গলায় বলল, "জালাল ভাই, ঋণ শুধু টাকা পয়সার হয় না, আচার-আচরণ ও ব্যবহারেরও হয়। আপনি সেদিন আমাকে যে আঘাত করেছিলেন, তা আমার চামড়ায় লাগেনি, লেগেছিল আমার কালবে। আর মজলুমের কালব যখন কাঁদে, তখন আরশের পায়া কেঁপে ওঠে। আপনি আমার হক নষ্ট করেছিলেন। আর বান্দার হক বড় কঠিন জিনিস।"
জালাল সাহেব ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন, "আমি জানি। আমি সব জানি। আমার নফস আমাকে ধোঁকা দিয়েছিল। আমি দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি রাসূলের (সা.) আদর্শের প্রেমিক, তুমি আহলুল বাইতের ত্যাগের অনুসারী। তাদের খাতিরে তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। নইলে হাশরের ময়দানে আমি মুখ দেখাতে পারব না।"
যায়েদ আলতো করে জালাল সাহেবের কাঁধে হাত রাখল। সেই হাতের স্পর্শে জালাল সাহেবের মনে হলো, তার বুকের ভেতর জমে থাকা বছরের পর বছরের অন্ধকার নিমেষেই দূর হয়ে গেল।
"আমি আপনাকে সেই দিনই ক্ষমা করে দিয়েছিলাম জালাল ভাই," যায়েদ বলল। তার কণ্ঠস্বর যেন নীরবতার চেয়েও স্নিগ্ধ। "আমি যদি প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতাম, তবে আমার আর আপনার মধ্যে পার্থক্য কী থাকত? আমি আমার বিচার আমার রবের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলাম। তিনি সর্বোত্তম বিচারক। আপনি যে আজ নিজের ভুল বুঝতে পেরে এখানে ছুটে এসেছেন, এটাই তো আল্লাহর সবচেয়ে বড় রহমত। তিনি আপনার কালবকে জিন্দা করেছেন। যে চোখের পানি আজ আপনি ফেলছেন, তা জাহান্নামের আগুন নেভানোর জন্য যথেষ্ট।"
জালাল সাহেব মাথা নিচু করে কাঁদতেই থাকলেন। তার মনে হলো, তার পিঠের ওপর থেকে যেন একটা আস্ত পাহাড় সরে গেছে। এক অদ্ভুত হালকা অনুভূতি তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।
হঠাৎ এক অলৌকিক দৃশ্য ঘটল। হুজরা খানার বাইরে, শুকনো ধুলোমাখা উঠোনে, যেখানে জালাল সাহেবের দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল, সেখানে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হলো। অনুতাপের আগুনে পুড়ে খাঁটি হওয়া এক বান্দার দীর্ঘশ্বাসে শুকনো মরুভূমিতে যেন জাদুকরী স্পর্শ লাগল। ধুলোর ভেতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়াল ছোট্ট একটি সবুজ চারাগাছ। চোখের পলকে তাতে ফুটে উঠল একটি ধবধবে সাদা ফুল। বিশ্বাসের ফুল।
প্রকৃতি যেন এই ক্ষমার দৃশ্যটাকে উদযাপন করছিল। মরুভূমির বাতাসের মতো এক ঝাপকা হাওয়া এসে হুজরা খানার ভেতরটা জুড়িয়ে দিয়ে গেল।
জালাল সাহেব যখন মসজিদ থেকে বের হলেন, তখন আকাশে গোল চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলোয় পুরো গ্রামটা যেন ভেসে যাচ্ছে। তার মনে হলো, আজ রাতের জোসনার হাসিটা একটু বেশিই উজ্জ্বল। গাছের পাতাগুলো যেন বাতাসে দোল খেয়ে জিকির করছে।
গাড়িতে ওঠার আগে তিনি একবার ফিরে তাকালেন হুজরা খানার দিকে। সেখানে তখন কেউ নেই। শুধু একটা মৃদু আলোর আভা চারপাশটাকে আলোকিত করে রেখেছে।
জালাল সাহেব গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখলেন। আজ আর তার হাত কাঁপছে না। তার হাতের আঙুলগুলো আজ আর অদৃশ্য কালিতে মাখা নেই। সেখানে লেগে আছে অনুতাপের নূর।
তিনি বুঝতে পারলেন, জীবনটা একটা বিশাল খাতা। এখানে প্রতিদিন আমরা কিছু না কিছু লিখি। আমাদের প্রতিটি কথা, প্রতিটি আচরণ একেকটা লেনদেন। কাউকে ভালোবেসে একটা হাসি দিলে সেটাও জমা হয়, আবার অহংকার করে কাউকে কষ্ট দিলে সেটাও ঋণের খাতায় লাল কালিতে লেখা হয়ে যায়। আল্লাহ ছাড় দেন, সময় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। তাই আচরণ প্রকাশে আমাদের কতটা সাবধান হওয়া উচিত, তা জালাল সাহেব তার জীবনের বিনিময়ে শিখেছেন।
গাড়ি চলতে শুরু করল শহরের দিকে। কিন্তু জালাল সাহেবের মন পড়ে রইল সেই ছোট্ট হুজরা খানায়, যেখানে ক্ষমা আর ইশকে ইলাহির এক অদ্ভুত মিলন ঘটেছে। তার কালবের ভেতরে এখন আর কোনো অস্থিরতা নেই। সেখানে বিরাজ করছে এক দীর্ঘস্থায়ী, গভীর প্রশান্তি। একটা বিষণ্ণ অথচ স্নিগ্ধ রেশ তার আত্মাকে জড়িয়ে রেখেছে।
তিনি জানেন, কাল সকালে যখন সূর্য উঠবে, তখন রোদের আর কোনো কান্না থাকবে না। কারণ, আজ রাতে তার নিজের চোখের পানিতে তার সমস্ত ঋণ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। আল্লাহ রহমান, আল্লাহ রাহিম। তিনি যেমন ছাড় দেন, তেমনি কেউ অনুতপ্ত হয়ে ফিরে এলে তাকে বুকে টেনে নিতেও দ্বিধা করেন না। শুধু শর্ত একটাই—হৃদয়টাকে হতে হবে আয়নার মতো স্বচ্ছ, যেখানে কেবল প্রভুর নূর প্রতিফলিত হতে পারে।
গাড়ির হেডলাইটের আলো অন্ধকার চিরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর জালাল সাহেব তার নতুন জীবনের পথে, তাজাল্লির আলোর সন্ধানে, এক প্রশান্ত মুসাফির হয়ে এগিয়ে চললেন। তার কানে তখন বাজছে এক অদেখা পৃথিবীর নীরবতার শব্দ, যে শব্দে কেবলই ক্ষমার সুবাস ছড়িয়ে আছে।









মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।