সম্পাদকের পছন্দ
এই সপ্তাহের সেরা
মহাকালের দর্পণ
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
যান্ত্রিক সম্মতির হাসি
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
অনুশোচনা
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২৬
ফেরা
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
ছায়া মন্ত্রিসভাঃ সংসদীয় গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬
কবর
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬
ছেঁড়া মলাট
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬
সর্বশেষ লেখা
8

উত্তরণ
দিগন্তবিস্তৃত অথৈ পানি। চারদিকে কেবলই বিস্তীর্ণ হাওর। কিছুক্ষণ আগের প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী ঝড় এখন শান্ত। আকাশের পশ্চিম কোণে রোদের কান্না কেবলই শেষ হয়েছে। সেখানে এখন ছোপ ছোপ রক্তের মতো লাল আভা। যেন আকাশটা তার সমস্ত দীর্ঘশ্বাস ঢেলে দিচ্ছে এই শান্ত অথচ নিষ্ঠুর জলরাশির বুকে। এখানে এখন আর কোনো জীবনের স্পন্দন নেই। শুধু উত্তাল ঢেউয়ের বুকে হিজল আর করচ গাছগুলোর আছড়ে পড়ার এক অদ্ভুত হাহাকার।
রহমত পড়ে আছে কাদামাখা এক চিলতে কান্দার ওপর। তার হাত-পা অবশ। আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যাচ্ছে নরম কাদা। ঠিক যেমন করে আজ বিকেলে গলে গেছে তার জীবনের সমস্ত সঞ্চয়। রহমত একজন গ্রামের মুয়াল্লিম, একজন ক্যালিগ্রাফার। কাঠের পাটাতনে বসে পরম যত্নে পবিত্র কুরআনের আয়াত চামড়া ও কাগজের ওপর নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলাই ছিল তার কাজ। আজ এই আকস্মিক ঝড় তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। চোখের পলকে গিলে খেয়েছে তার পালতোলা নৌকা, তার সারা জীবনের লেখা পাণ্ডুলিপি। আর... তার নাড়িছেঁড়া ধন, আট বছরের শিশুপুত্র ইয়ামিনকে।
রহমতের ঠোঁট দুটো কাঠ হয়ে আছে। চারপাশে থইথই পানি, অথচ তার বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে এক অদ্ভুত তৃষ্ণায়। নীরবতার শব্দ এখন আর নীরব নেই। তা রূপ নিয়েছে এক অট্টহাসিতে। তার ভেতরে বসে থাকা 'নফস' বা প্রবৃত্তি এখন ফিসফিস করে কথা বলছে।
"সব শেষ রহমত," নফস তার কানে বিষ ঢেলে দেয়। "তুমি একা। নিঃস্ব। তুমি তো সারাজীবন তোমার রবের নাম লিখেছ। কই, তোমার রব তো তোমাকে ভুলে গেছেন! কোথায় তোমার সেই ইমান? কোথায় তোমার ভরসা? এই অথৈ হাওরের বুকে কেউ আসবে না তোমাকে বাঁচাতে। তোমার ছেলেও আর বেঁচে নেই।"
রহমত চোখ বন্ধ করে। নফসের এই আক্রমণ বড় ভয়ংকর। এটি কেবল শরীরকে মারে না, আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা। যেন পুরো পৃথিবীর আকাশটা ভেঙে তার বুকের ওপর চেপে বসেছে। সে শ্বাস নিতে পারছে না। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ঠিকই বলেছিলেন, মানুষ যখন দুনিয়ার মোহ আর মায়াকে নিজের অস্তিত্বের অংশ বানিয়ে নেয়, তখন তা হারালে মনে হয় যেন নিজের আত্মাই হারিয়ে গেছে। রহমতের এখন ঠিক সেটাই মনে হচ্ছে।
কিন্তু রহমতের 'কালব' বা হৃদয় এখনো পুরোপুরি মৃত নয়। সেখানে এখনো টিমটিম করে জ্বলছে মারেফাতের এক ছোট্ট প্রদীপ। তার 'রুহ' বা আত্মা তাকে তাগিদ দিচ্ছে ভেতরের দিকে তাকাতে। বাইরের এই ঝড় তো কেবল এক বিভ্রম। আসল ঝড় তো বইছে তার ভেতরে। নফস আর রুহের এই চিরন্তন সংঘাত।
রহমত তার শুষ্ক জিভ দিয়ে শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট ভেজানোর বৃথা চেষ্টা করে। সে আকাশের দিকে তাকায়। মেঘের দীর্ঘশ্বাসগুলো এখন জমাট বাঁধছে রাতের আঁধারে। জোসনার হাসি আজ বড় ম্লান। চাঁদের আলো যেন ভয় পাচ্ছে এই হাওরের নিষ্ঠুরতাকে স্পর্শ করতে। তার কাদা-মাখা হাত দুটো কাঁপছে। যে হাত দিয়ে সে দিনের পর দিন পরম মমতায় লিখেছে প্রভুর নাম, আজ সেই হাত নিজের চোখের পানি মুছতেও অক্ষম।
শোক যখন তার প্রাণ ওষ্ঠাগত করে তুলছে, অস্তিত্ব যখন ধুঁকছে মৃত্যুর প্রহর গুনে, ঠিক তখন তার মানসপটে ভেসে ওঠে এক রক্তাক্ত প্রান্তর। কারবালা! চৌদ্দশ বছর আগের সেই উত্তপ্ত বালুচর। রহমত যেন নিজের চোখের সামনে দেখতে পায়, ফোরাত নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন এক তৃষ্ণার্ত কাফেলা। আহলুল বাইত। রাসূলের (সা.) কলিজার টুকরো, তাঁর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.)।
কী অপরিসীম ধৈর্য! কী অবিশ্বাস্য সমর্পণ!
রহমত তার নিজের শোকের দিকে তাকায়। কী হারিয়েছে সে? একটি নৌকা? কিছু পাণ্ডুলিপি? আর তার সন্তান? কিন্তু ইমাম হুসাইনের (রা.) কোলে তো ছটফট করছিল ছয় মাসের নিষ্পাপ শিশু আলী আসগর। এক ফোঁটা পানির জন্য। সামনে ফোরাতের অথৈ স্রোত, অথচ তাঁদের জন্য এক ফোঁটা পানিও ছিল না। আর পানির বদলে জুটেছিল ঘাতকের নিষ্ঠুর বিষাক্ত তির। সেই তিরের আঘাতে যখন শিশুর গলা ফুঁড়ে তাজা রক্ত ঝরছিল, তখনো কি হুসাইন (রা.) অভিযোগ করেছিলেন? না। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে অসীম প্রশান্তিতে বলেছিলেন, "হে আল্লাহ, তুমি যদি এতে সন্তুষ্ট থাকো, তবে হুসাইনও সন্তুষ্ট।"
রহমতের বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। রাসূলপ্রেমের এক তীব্র প্লাবন তার হৃদয়ের সব ক্ষোভ, সব আক্ষেপ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তার মনে হয়, আহলুল বাইতের সেই পাহাড়সম ত্যাগের কাছে তার এই কষ্ট তো এক বিন্দুর সমানও নয়। তারা তো হাসিমুখে নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছিলেন কেবল এক রবের সন্তুষ্টির আশায়। আর সে সামান্য দুনিয়াবি মায়া হারিয়ে রবের ওপর থেকে ভরসা তুলে নিচ্ছে?
এই উপলব্ধির সাথে সাথেই ইশকে ইলাহির এক প্রবল ঝটকা লাগে রহমতের কালবে। তার রুহ এবার প্রবল বিক্রমে জেগে ওঠে। নফসের সব অন্ধকার জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। দুটি ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার গাল বেয়ে। হ্যাঁ, কেবল দুটি ফোঁটা। এটি কোনো সাধারণ অশ্রু নয়। এটি অনুতাপের অশ্রু। এটি সমর্পণের অশ্রু। সুফিদের ভাষায় একেই বলে 'ফানা'—নিজের আমিত্বকে রবের ইচ্ছার মাঝে সম্পূর্ণ বিলীন করে দেওয়া।
অশ্রুর ফোঁটা কাদামাখা পানিতে পড়তেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। পরাবাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়ালিজম যেন খুব নিভৃতে, সন্তর্পণে বাস্তবতার হাত ধরে হেঁটে এল এই নির্জন হাওরে। যে পানি ছিল একটু আগেও ঘোলাটে আর কর্দমাক্ত, অশ্রু পড়ার সাথে সাথে তা স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ হয়ে গেল। জাদুকরীভাবে সেই স্বচ্ছ পানির বুক চিরে মুহূর্তের মধ্যে ফুটে উঠল একটি বিশাল শ্বেতপদ্ম। চোখের সামনে সেই পদ্মটি আলো ছড়াতে লাগল। তার প্রতিটি পাপড়িতে এক অপার্থিব 'নূর' বা আলো। সেই আলোতে দূর হয়ে গেল হাওরের জমাট অন্ধকার।
রহমতের মনে হলো, এই ফুল পৃথিবীর কোনো ফুল নয়। এটি তার হৃদয়ের বিশ্বাসের ফুল, যা দীর্ঘশ্বাসের এই অথৈ জলে আজ প্রস্ফুটিত হয়েছে। পদ্মের প্রতিটি পাপড়ি থেকে ঝরে পড়ছে এক অদ্ভুত সুবাস। জান্নাতি সুবাস। সেই সুবাস রহমতের নাকের ভেতর দিয়ে সোজা তার কালবে গিয়ে আঘাত করল। তার মনে পড়ে গেল সেই পবিত্র আয়াতের কথা, যা সে তার জীবনে অসংখ্যবার ক্যালিগ্রাফির তুলিতে এঁকেছে।
তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো নড়ে ওঠে। খুব অস্পষ্ট স্বরে, কিন্তু পাহাড়ের মতো অটল বিশ্বাস নিয়ে সে উচ্চারণ করে সেই মহাবাক্য— "حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ نِعْمَ الْمَوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ" (হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল, নি'মাল মাওলা ওয়া নি'মান নাসির।) "আল্লাহ তাআলাই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই হলেন উত্তম কর্মবিধায়ক; আল্লাহ তাআলাই হচ্ছেন উত্তম অভিভাবক এবং উত্তম সাহায্যকারী।"
এই বাক্যটি উচ্চারণ করার সাথে সাথে হাওরের বাতাসে এক জাদুকরী পরিবর্তন এল। বাক্যটি যেন কেবল শব্দ নয়, এক জীবন্ত সত্তায় পরিণত হলো। প্রতিটি অক্ষর যেন এক একটি নূরের তাজাল্লি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ বদলে গিয়ে মনে হতে লাগল যেন হাওরের প্রতিটি হিজল আর করচ গাছ, প্রতিটি কচুরিপানা অদৃশ্য ফেরেশতাদের সাথে জিকির করছে। পাতার মর্মর ধ্বনিতে অনুরণিত হতে লাগল— 'আল্লাহু... আল্লাহু...'।
রহমত আর নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছে না। সে এখন 'মারেফাত'-এর এক অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। মাওলানা রুমির সেই আধ্যাত্মিক ইশক যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। তার মনে হচ্ছে, সে যেন আর কাদার ওপর শুয়ে নেই। সে ভাসছে। এক অসীম প্রশান্তির নূরের সাগরে ভাসছে সে। দুনিয়ার কোনো কিছুর প্রতি তার আর কোনো আকর্ষণ নেই। নৌকা, সম্পদ, এমনকি নিজের জীবনের প্রতিও তার আর কোনো মোহ নেই। সে শুধু তার রবকে চায়।
হঠাৎ এক সুমিষ্ট আজানের ধ্বনি তার কানে ভেসে এল। "আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার..." আশেপাশে কোনো লোকালয় নেই, কোনো মসজিদ নেই, কোনো মিনার নেই। তবু আজান হচ্ছে। এই আজান আসছে প্রতিটি জলকণা থেকে, এই আজান আসছে নূরের সেই শ্বেতপদ্ম থেকে। এটি নীরবতার আজান। হৃদয়ের আজান। এটি সেই আজান, যা কেবল তারাই শুনতে পায় যাদের কালব রবের নূরে আলোকিত হয়ে যায়।
রহমত ধীরে ধীরে চোখ খোলে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক শুভ্র বসন পরিহিত বৃদ্ধ। তার চেহারা থেকে নূরের আভা ঠিকরে পড়ছে। বৃদ্ধের চোখে এক অদ্ভুত মায়া, যে মায়া কেবল আল্লাহর অলিদের চোখেই থাকে। তিনি কোনো কথা বললেন না। শুধু পরম মমতায় হাত বাড়িয়ে দিলেন রহমতের দিকে।
রহমত তার হাত ধরল। বৃদ্ধের স্পর্শে এক আশ্চর্য শীতলতা। সেই শীতলতা রহমতের সমস্ত শরীরের ব্যথা, সমস্ত ক্লান্তি নিমিষেই মুছে দিল। বৃদ্ধ তাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বৃদ্ধের পা যেখানেই পড়ছে, অথৈ পানি সেখানে শক্ত মাটির মতো হয়ে যাচ্ছে। পানির বুক চিরে যেন এক নূরের রাস্তা তৈরি হয়ে গেছে। সেই রাস্তার দুই পাশে ফুটে আছে অসংখ্য শ্বেতপদ্ম। রহমতের মনে হচ্ছে, সে যেন বেহেশতের কোনো বাগানে হাঁটছে।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর রহমত থমকে দাঁড়ায়। তার চোখের সামনে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। আধডোবা একটি বিশাল হিজল গাছের ডালে পরম নিশ্চিন্তে বসে আছে... ইয়ামিন! তার হারিয়ে যাওয়া আট বছরের ছেলে!
রহমতের বুকের ভেতরটা ছলাৎ করে ওঠে। সে দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। ইয়ামিন অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলে, "আব্বা, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? দেখো, এই দাদু আমাকে ঝড় থেকে বাঁচিয়ে এখানে বসিয়ে দিয়েছেন। আর আমাকে সুন্দর একটা সাদা ফুল দিয়েছেন। তুমি তো আমাকে বলেছিলে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন। দেখো, আল্লাহ ঠিকই এই দাদুকে পাঠিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছেন।"
রহমত চমকে পেছনে তাকায়। কিন্তু কোথায় কে? সেই শুভ্র বসন পরিহিত বৃদ্ধ সেখানে নেই। চারপাশ একেবারে ফাঁকা। সেখানে শুধু পানিতে ভাসছে একরাশ সাদা পদ্মফুল। যার সুবাসে ম-ম করছে পুরো হাওর প্রান্তর।
রহমত বুঝতে পারে, এটি কোনো মানুষের সাহায্য নয়। এটি তাঁরই সাহায্য, যিনি 'নি'মাল ওয়াকিল'—উত্তম কর্মবিধায়ক। যখন পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, চারপাশের সব আলো নিভে যায়, তখন তিনি এমন জায়গা থেকে রহমতের দরজা খুলে দেন, যা মানুষের সাধারণ কল্পনারও অতীত। বান্দা যখন নিজের সব অহংকার, সব আমিত্ব ভুলে গিয়ে একমাত্র তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তখন তিনি নিজেই তার অভিভাবক হয়ে যান।
রাতের আকাশ এখন তারায় তারায় পূর্ণ। জোসনার ম্লান হাসি এখন রূপ নিয়েছে এক উজ্জ্বল জ্যোতির বন্যায়। প্রতিটি তারা যেন একেকটি মারেফাতের প্রদীপ হয়ে জ্বলছে। রহমত তার ছেলেকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়। তার চোখ দিয়ে আবারও পানি পড়ছে। তবে এ পানি হারানোর বেদনার নয়, এ পানি প্রাপ্তির প্রশান্তির।
বাতাসে তখনো ভাসছে সেই অমোঘ বাক্যের রেশ— "হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল..."।
রহমত জানে, কাল সকালে আবার সূর্য উঠবে। রোদের হাসি আবারও ছড়িয়ে পড়বে এই হাওরের বুকে। হয়তো তাদের আবার হাঁটতে হবে নতুন কোনো গন্তব্যে, শুরু করতে হবে শূন্য থেকে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা হয়তো আবারও তাদের সামনে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু তার হৃদয়ে আর কোনো ভয় নেই, কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ সে শিখে গেছে সমর্পণের আসল অর্থ। সে জেনে গেছে, যার সাথে আল্লাহ আছেন, তার আর কিছুর প্রয়োজন নেই।
হাওরের বাতাস আবারও বইতে শুরু করে। তবে এবার তা কোনো হাহাকার নয়। তা এক দীর্ঘস্থায়ী প্রশান্তির রেশ, যা রহমতের হৃদয়কে ছুঁয়ে এক অলৌকিক সুরের জন্ম দিচ্ছে। সেই সুর কেবল তারাই শুনতে পায়, যারা নূরের ছায়ায় নিজেদের সম্পূর্ণ সমর্পণ করতে জানে। যারা জানে, জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ শেষে কেবল তাঁর সন্তুষ্টিই হলো একমাত্র গন্তব্য। একটি গভীর, নিস্তব্ধ এবং পরম শান্তির রাত নেমে আসে বাংলাদেশের এই বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে।









মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।