মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
সম্পাদকের পছন্দ
এই সপ্তাহের সেরা
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
শুক্রবার, অক্টোবর ০৯, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
বুধবার, অক্টোবর ০৭, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
রবিবার, অক্টোবর ০৪, ২০২৬
মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
সর্বশেষ লেখা
8

যান্ত্রিক সম্মতির হাসি
ঘড়ির কাঁটা ঠিক তিনটায় স্থির। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের একটানা, একঘেয়ে ঘর্ঘর শব্দ পুরো ঘরটাকে এক ধরনের কৃত্রিম নিস্তব্ধতায় মুড়ে রেখেছে। জানালার ভারী কাঁচ গলে ভেতরে এসে পড়েছে ঢাকা শহরের রূঢ়, তপ্ত রোদ। ছাইদানিতে উপচে পড়া সিগারেটের টুকরো, আর টেবিলের একপাশে রাখা আধখাওয়া চায়ের কাপ—যার গায়ে কালচে দাগ স্পষ্ট—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত স্থবিরতার জন্ম দিয়েছে ঘরটিতে। ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়ান। তার মেরুদণ্ড সামান্য বাঁকা, যেন এক অদৃশ্য বোঝা তার কাঁধটাকে নিচু করে রেখেছে। দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ, দামি কার্পেটের নকশার দিকে।
সামনের বিশাল চামড়ায় মোড়ানো চেয়ারে বসা ব্যক্তিটি, কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফারহান সাহেব, চরম বিরক্তি নিয়ে একটি নীল রঙের ফাইল ছুঁড়ে মারলেন। ফাইলটি সশব্দে মেঝেতে পড়ল। ভেতরের পাতাগুলো ছড়িয়ে গেল কিছুটা, ধুলো উড়ল আবছা আলোয়। আয়ানের কোনো বিকার নেই। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির ঠোঁটের কোণে বরং ধীরলয়ে একটি হাসি ফুটে উঠল। এই হাসি স্বতঃস্ফূর্ত নয়, এতে কোনো আনন্দ নেই। এটি নিখুঁত অনুশীলনে অভ্যস্ত একটি সুপরিকল্পিত যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া। কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার এক মোক্ষম ঢাল।
আয়ান জানে, চামচাগিরি কোনো জন্মগত স্বভাব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এডওয়ার্ড ই. জোনসের 'ইনগ্র্যাসিয়েশন থিওরি' বা তোষামোদ তত্ত্ব নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেছিল সে। তখন এসব পড়ে তার হাসি পেত। আজ সে নিজেই সেই তত্ত্বের সবচেয়ে সফল এবং করুণ উদাহরণ। সে জানে, তার এই হাসি, এই বশ্যতা—এগুলো লক্ষ্যবস্তুর চোখে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর এক মরিয়া চেষ্টা মাত্র। এটি সম্মান নয়, এটি ফারহান সাহেবের প্রতি কোনো প্রকৃত আনুগত্যও নয়। এটি নিছক একটি বিভ্রম। আত্মরক্ষামূলক এই আচরণ জন্ম নেয় প্রবল কর্পোরেট চাপ থেকে। আত্মসম্মান যখন মাসের শেষের ক্রেডিট কার্ডের বিল, বাড়িভাড়া আর চাকরি হারানোর ভয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকে, মানুষ তখন এই তোষামোদের আবরণ গায়ে জড়ায়।
আয়ান ধীরে ধীরে নিচু হয়ে ফাইলটা কুড়িয়ে নেয়। "সরি স্যার, আমারই বোঝার ভুল ছিল। আপনি মিটিংয়ে ঠিক যেমনটা বলেছিলেন, আমি এখনই সেভাবে ড্রাফট করে আনছি। আপনার ওই স্ট্র্যাটেজিটা না থাকলে আসলে এই প্রজেক্টটা আমরা ধরতেই পারতাম না।"
ফারহান সাহেবের চেহারার কাঠিন্য কিছুটা তরল হয়। বসের অতিরঞ্জিত প্রশংসা করা, তার গুণাবলি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলে ধরা—এটাই 'আদার-এনহ্যান্সমেন্ট' বা অন্যের প্রশংসার নিখুঁত প্রয়োগ। বসের অবদমিত অহংকারকে সন্তুষ্ট করে লক্ষ্যবস্তুর আত্মতৃপ্তিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে আয়ান এখন সিদ্ধহস্ত। আরভিং জেনিসের 'বায়াসড স্ক্যানিং থিওরি' ঠিক এভাবেই কাজ করে। প্রথম প্রথম নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়ে বসের ভুল সিদ্ধান্তে সায় দিতে আয়ানের কষ্ট হতো। কিন্তু এখন তার মস্তিষ্ক বদলে গেছে। মস্তিষ্ক অবচেতনভাবেই ফারহান সাহেবের সব অদ্ভুত যুক্তির পক্ষে সায় খোঁজে। আয়ানের নিজস্ব বিশ্বাস বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সে পরিণত হয়েছে এক আজ্ঞাবহ, সুসজ্জিত পুতুলে।
ফাইলটা বুকে চেপে আয়ান যখন ফারহান সাহেবের বিলাসবহুল কামরা থেকে বেরিয়ে আসে, তখন বাইরের পরিবেশটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকা শহরের কর্মপরিবেশের নিজস্ব গন্ধটা এখানে এসে নাকে লাগে। কনস্ট্রাকশনের মিহি ধুলো, স্যাঁতসেঁতে স্টোররুমের ভ্যাপসা ভাব, মাকড়সার জালের প্রাচীনত্ব, প্যান্ট্রিতে জমে থাকা এঁটো বাসনের গন্ধ আর বাথরুমের ফিনাইলের তীব্র ঝাঁজ—সব মিলেমিশে একাকার। এই বদ্ধ, নিস্তেজ এবং ধুলোমলিন পরিবেশ আয়ানের মনের ভেতরের দমবন্ধ অবস্থাকেই নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত করে।
বাইরের ঘিঞ্জি কিউবিকলগুলোতে কাজ করছে জুনিয়র এক্সিকিউটিভরা। বাংলাদেশের কর্পোরেট সংস্কৃতিতে ক্ষমতার দূরত্ব বা 'পাওয়ার ডিস্ট্যান্স' অত্যন্ত প্রবল। সমাজবিজ্ঞানী গিয়ার্ট হফস্টেডের মডেলে বাংলাদেশের স্কোর যে ৮০, তা এই ফ্লোরে হাঁটলেই বোঝা যায়। ফারহান সাহেবের বিশাল কাঠের টেবিল আর এই কিউবিকলগুলোর মাঝখানে একটি অদৃশ্য, দুর্ভেদ্য দেয়াল। অধস্তনরা ওপরওয়ালার মুখের ওপর কথা বলবে না, এটাই এখানকার অলিখিত নিয়ম।
আয়ান নিজের চেয়ারে এসে বসে। সামনে উপবিষ্ট জুনিয়র অ্যানালিস্ট নিহাল। নিহাল ছেলেটার স্বভাব 'কনসায়েনশাসনেস' বা বিবেকবোধ দ্বারা তাড়িত। সে কাজের প্রতি দায়বদ্ধ, নিয়মের ভেতর দিয়ে চলতে চায়। তোষামোদ তার ধাতে নেই। নিহাল একটি রিপোর্ট নিয়ে এসেছে, যেখানে সে প্রমাণ করেছে যে ফারহান সাহেবের নেওয়া নতুন মার্কেটিং পলিসিটা কোম্পানির জন্য ক্ষতিকর।
রিপোর্টটা হাতে নিয়েই আয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। আধঘণ্টা আগে ফারহান সাহেবের সামনে যে আয়ান ছিল মাটির চেয়েও নরম, নিহালের সামনে সেই আয়ান হয়ে ওঠে স্বৈরাচারী শাসক। "এইসব আবর্জনা তুমি আমাকে কেন দেখাচ্ছ নিহাল? এমডি স্যার নিজে পলিসি ঠিক করেছেন, আর তুমি আসছ জ্ঞান দিতে? নিজের চরকায় তেল দাও, বুঝলে? কোম্পানি তোমাকে পলিসি মেকিংয়ের জন্য রাখেনি!"
পুরো ব্যবস্থায় আয়ানের মতো মধ্যম সারির ব্যবস্থাপকদের অবস্থাই সবচেয়ে করুণ। তারা ওপরের চাপ নিচে স্থানান্তর করেন। সকালে বসের সামনে তারা আজ্ঞাবহ অনুচর, বিকেলে অধস্তনের সামনে স্বৈরাচারী। এই দ্বৈত সত্তা আয়ানকে একজন 'কারমা ক্যামেলিয়ন'-এ পরিণত করেছে। বহুরূপীর মতো প্রতিনিয়ত রং বদলাতে বদলাতে সে নিজের আসল সত্তাকেই হারিয়ে ফেলেছে। চরম মানসিক ক্লান্তি এবং 'ডিসিশন ফ্যাটিগ'-এর শিকার আয়ান জানে, নিহালের রিপোর্টটা শতভাগ নিখুঁত। কিন্তু সেই সত্য বলার সাহস তার নেই। এই যে নেতৃত্বের পালাবদল, এটা আয়ানের ভেতর গভীর শূন্যতা আর 'এলিয়েনেশন' জন্ম দেয়। সে এক অন্তহীন চক্রে আটকে আছে।
গত দু'মাস ধরে অফিসে ছাঁটাই বা ডাউনসাইজিংয়ের আতঙ্ক চলছে। এই অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে কর্মীরা অনুভব করছে যে তাদের প্রকৃত কাজ বা সততার কোনো মূল্য নেই। মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় এই অবস্থাকেই 'লার্নড হেল্পলেসনেস' বা অর্জিত অসহায়ত্ব বলা হয়। উদ্ভাবন ক্ষমতা ফ্লোর থেকে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নিহালের মতো দু-একজন বাদে কেউ আর নতুন আইডিয়া দিতে চায় না। চামচাগিরি-নির্ভর এই কর্মক্ষেত্রে প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতিযোগী।
আয়ান জানে, দক্ষতা দিয়ে যা অর্জন করা সম্ভব নয়, কেবল বসের স্তুতিবাক্য রচনা করে তার চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা আদায় করা সম্ভব। গত সপ্তাহে সে নিজে সেধে ফারহান সাহেবের ব্যক্তিগত গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নবায়নের কাজটা করে দিয়েছে। এই 'রেন্ডারিং ফেভারস' বা অনুগ্রহ করার কৌশল দিয়ে সে নিজেকে অপরিহার্য প্রমাণের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার অসমতা তাকে বাধ্য করেছে এই পথ বেছে নিতে। সিইওদের ক্যারিশমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বিষাক্ত সংস্কৃতিতে বসের ভুল সিদ্ধান্তগুলো বিনা বাধায় বাস্তবায়িত হতে থাকে, আর চূড়ান্ত মাশুল গোনে পুরো প্রতিষ্ঠান।
অফিসের দেয়ালঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকে তার নির্দিষ্ট, নিরাসক্ত ছন্দে। পুরোনো ফাইলের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকে নিহালদের মতো তরুণ কর্মীদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ঠান্ডা বাতাসে আয়ানের চামড়া টানটান হয়ে আসে। সিলিং ফ্যানের একঘেয়ে ঘর্ঘর শব্দের সাথে মিশে যায় আয়ানের নিজেরই না-বলা দীর্ঘশ্বাস।
হঠাৎ ইন্টারকম বেজে ওঠে। তীক্ষ্ণ শব্দ।
কীবোর্ডে চলতে থাকা আয়ানের আঙুলগুলো জাদুর মতো থেমে যায়। ড্রয়ার ঠেলে বন্ধ করার একটা যান্ত্রিক শব্দ হয়। চেয়ার ছেড়ে দ্রুত পায়ে উঠে দাঁড়ায় সে। তার চোখেমুখে কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো দ্বিধা নেই, কোনো আত্মগ্লানিও নেই। ঠোঁটের কোণে আবার ঝুলে পড়েছে সেই যান্ত্রিক, নিখুঁত সম্মতির হাসি। বসের ডাক এসেছে।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে সে ভেতরে ঢুকে যায়। দরজাটি নিঃশব্দে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় তার পেছনে। শূন্য করিডোরে শুধু পড়ে থাকে নিহালের আনা সেই বাতিল রিপোর্টের কয়েক টুকরো ছেঁড়া কাগজ, যা এদেশের কর্পোরেট কাঠামোর অদৃশ্য জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া সত্যের নীরব প্রতিধ্বনির মতো উড়তে থাকে।









মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।