অস্তিত্বের নশ্বরতা ও মোহমুক্তির দর্শনঃ একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

অস্তিত্বের নশ্বরতা ও মোহমুক্তির দর্শনঃ একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ


পৃথিবীর এই সুবিশাল রঙ্গমঞ্চে মানুষের আগমন ও প্রস্থান এক চিরন্তন রহস্য। আধ্যাত্মিক দর্শনে এই নশ্বর পৃথিবীকে কেবল একটি পান্থশালা নয়, বরং একটি সূক্ষ্ম 'পরীক্ষাগার' হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। যেখানে বস্তুবাদের চাকচিক্য মানুষের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে, সেখানে হযরত আলী (আঃ)-এর দর্শন আমাদের শেখায় এক রূঢ় অথচ ধ্রুব সত্য—পার্থিব জৌলুসের অন্তঃসারশূন্যতা। এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলোঃ জাগতিক বস্তুর তুচ্ছতা উপলব্ধি এবং ইন্দ্রিয়জাত মোহের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মিক শুদ্ধি অর্জনই স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের একমাত্র পথ

অস্তিত্বের দ্বান্দ্বিকতাঃ নফস ও বিবেকের যুদ্ধক্ষেত্র

মানুষের জীবন এক নিরন্তর যুদ্ধের নাম, যাকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয়েছে 'জিহাদ-ই আকবার' বা শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ। এই যুদ্ধ বাইরের কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজের রিপু বা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে। হযরত আলী (আঃ)-এর দর্শন অনুযায়ী, দুনিয়ার প্রতি আসক্তিই মানুষের আধ্যাত্মিক পতনের প্রধান অনুঘটক

যখন একজন ব্যক্তি তার ধন-সম্পদ বা পদমর্যাদাকেই জীবনের পরম লক্ষ্য মনে করে, তখন তার হৃদয়ে স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টি বড় হয়ে দাঁড়ায়। এই 'মোহ' আসলে একটি মনস্তাত্ত্বিক যবনিকা, যা সত্য দর্শনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আধ্যাত্মিক উত্তরণের প্রথম ধাপই হলো এটি অনুধাবন করা যে—যা কিছু দৃশ্যমান এবং বিনাশী, তা কখনো চিরন্তন আনন্দের উৎস হতে পারে না

তুচ্ছতার নান্দনিক উপস্থাপনঃ বিদ্রূপাত্মক রূপকের শক্তি

হযরত আলী (আঃ) মানুষের অহংকারকে চূর্ণ করতে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও বিদ্রূপাত্মক রূপক ব্যবহার করেছেন। তিনি এই পার্থিব জগতকে তুলনা করেছেন 'দুম্বার নাকের সর্দি'র সাথে—যা চরমভাবে ঘৃণিত এবং পরিত্যাজ্য। তাঁর বিশ্লেষণেঃ

  • মধুঃ যা পৃথিবীর অন্যতম সুস্বাদু খাদ্য, তা মূলত একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গের মুখনিসৃত লালা বা থুথু
  • রেশমঃ যা আভিজাত্যের প্রতীক, তা আদতে একটি পোকার দেহনিসৃত বর্জ্য বা পায়খানা

এই রূপকগুলো কেবল উপমা নয়, বরং এগুলো মানুষের ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দেওয়ার এক একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র। তিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে, আমরা যা নিয়ে দম্ভ করি, তার উৎস আসলে অত্যন্ত নগণ্য

পৃথিবী' একটি মরীচিকা

এই দর্শনের প্রকাশভঙ্গি অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং প্রতীকী। এখানে 'পৃথিবী' একটি মরীচিকা, আর 'সম্পদ' হলো সেই মরীচিকার হাতছানি। লেখকের লেখনীতে এখানে 'শুদ্ধি' শব্দটিকে একটি অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে মানুষের অহং পুড়ে ছাই হয়ে খাঁটি সোনা বা আত্মিক প্রশান্তি বেরিয়ে আসে। এই রীতি পাঠককে কেবল শিক্ষা দেয় না, বরং তাকে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে বাধ্য করে

আধুনিকতার প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিকতাঃ প্রদর্শনবাদ ও শূন্যগর্ভ আভিজাত্য

বর্তমান এই হাইপার-কনজ্যুমারিস্ট বা অতি-ভোগবাদী সমাজে হযরত আলী (আঃ)-এর এই দর্শন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। আজকের সোশ্যাল মিডিয়া চালিত সমাজে আমরা যা ভোগ করি, তা উপভোগ করার চেয়ে অন্যকে দেখানোর (Validation) নেশায় বেশি মত্ত

  • ভারসাম্যপূর্ণ বৈরাগ্যঃ এই দর্শনের অর্থ এই নয় যে পৃথিবী ত্যাগ করে অরণ্যে চলে যেতে হবে। বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো—পৃথিবীতে বসবাস করেও হৃদয়ে পৃথিবীকে স্থান না দেওয়া
  • মানসিক স্বাধীনতাঃ যখন আপনার পরিচয় দামী ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভর করবে না, তখনই আপনি মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পারবেন। বর্তমানের ডিপ্রেশন বা মানসিক অস্থিরতার মূলে রয়েছে এই বস্তুবাদী মোহভঙ্গ হওয়ার ভয়

 সম্পদ যেন বিবেকের মালিক না হয়ে বসে

সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখলে, এই কঠোর অনাসক্তি অনেক সময় মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এটি কর্মবিমুখতা নয়, বরং কর্মের উদ্দেশ্য পরিবর্তন। এটি মানুষকে শিখিয়ে দেয় যে, হাতের সম্পদ যেন বিবেকের মালিক না হয়ে বসে। আধুনিক মানুষের জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সফলতার মাপকাঠি রাজকীয় পোশাক বা সুস্বাদু খাবারে নেই, বরং আছে নিজের 'নফস' বা অহংকে দমনের মধ্যে

নশ্বরতার এই মায়াজাল কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটি মানুষের আধ্যাত্মিক উত্তরণের একটি সোপান। জীবনের চাকচিক্য আসলে একটি পর্দা মাত্র। যখন আমরা বাহ্যিক জৌলুসের চেয়ে নিজের ভেতরের মনুষ্যত্ব আর আধ্যাত্মিকতাকে বড় করে দেখব, তখনই কেবল আমরা প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি অর্জন করতে পারব। অহংকার করার মতো কোনো উপাদানই এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে নেই—এই রূঢ় সত্যটি গ্রহণ করাই প্রকৃত জ্ঞান বা প্রজ্ঞা

মানুষের মুক্তি বস্তুর মালিকানায় নয়, বরং বস্তুর মোহ থেকে আত্মার মুক্তিতে

হযরত আলী (আঃ)-এর দর্শনের মূল নির্যাস—"পৃথিবীতে থাকো কিন্তু পৃথিবীকে হৃদয়ে স্থান দিও না"এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে একটি সাপ্তাহিক 'আত্ম-শুদ্ধি ও মোহমুক্তি' গাইডলাইন তৈরি করেছি। এটি দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝেও আধ্যাত্মিক সচেতনতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে

📋 মোহমুক্ত জীবনধারাঃ ৭ দিনের আত্ম-শুদ্ধি চ্যালেঞ্জ

এই পরিকল্পনাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের 'নফস' বা অহংকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা যায়

✍️ ডেইলি রিফ্লেকশন জার্নাল (প্রতিদিনের জন্য ৩টি প্রশ্ন)

প্রতিদিন ঘুমানোর আগে একটি ডায়েরিতে বা ফোনের নোটে নিচের তিনটি প্রশ্নের উত্তর লিখুন। এটি আপনার 'মুহাসাবা' বা আত্ম-বিশ্লেষণে সাহায্য করবেঃ

  1. আজকের আসক্তিঃ আজ কোন জাগতিক বস্তুর প্রতি আমি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ বা লোভ অনুভব করেছি? (যেমনঃ নতুন ফোন, প্রশংসা, বা সুস্বাদু খাবার)
  2. অহংকারের মুহূর্তঃ আজ কি এমন কোনো মুহূর্ত ছিল যখন আমি নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভেবেছি? আমি কি তা দমন করতে পেরেছি?
  3. মুক্তির আনন্দঃ আজ কোনো একটি প্রিয় বস্তু বা অভ্যাস ত্যাগ করে আমার মনে কি কোনো প্রশান্তি অনুভূত হয়েছে?

💡 কিছু বিশেষ আবেদন

  • ২৪ ঘণ্টার নিয়মঃ কোনো শৌখিন জিনিস কেনার তীব্র ইচ্ছা হলে নিজেকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিন। ভাবুন, এটি ছাড়া আপনার জীবন কি স্থবির হয়ে যাবে? হযরত আলী (আঃ)-এর সেই 'পোকার মল' বা 'পতঙ্গের থুথু'র উপমাটি মনে করুন
  • ব্যবহার বনাম আসক্তিঃ দামী জিনিস ব্যবহার করা অপরাধ নয়, কিন্তু সেটিকে নিজের 'পরিচয়' বা 'অহংকারে'র উৎস বানানোই হলো মোহ
  • সেবার মাধ্যমে মুক্তিঃ যখনই কোনো জিনিসের প্রতি খুব বেশি মায়া অনুভব করবেন, সেটি অন্যকে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। এটি মন থেকে মালিকানাবোধ কমিয়ে দেয়

এই পরিকল্পনাটি অনুসরণ করলে আপনি অনুভব করবেন যে, বাইরের চাকচিক্য আপনাকে আগের মতো আর প্রলুব্ধ করছে না। আপনার মনে এক গভীর প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা জন্ম নেবে

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”
Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default