অদৃশ্য সুতোর টান

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0


আরিফের মাথার ওপর পুরোনো সিলিং ফ্যানটা কেবল ঘুরছে না, যেন এক ক্লান্ত মহাকাল দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। ফ্যানের প্রতিটি ‘ক্যাঁচ ক্যাঁচ’ শব্দে এক অস্থির সুর—ঠিক যেন কোনো বন্দি পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ, যা ঘড়ির কাঁটার চেয়েও দ্রুতবেগে আরিফের হৃদপিণ্ডে প্রতিধ্বনি তোলে। টেবিলের ওপর ছড়ানো ফাইলগুলো আজ জড় পদার্থ নয়, ওগুলো যেন একেকটা পাথরের দেয়াল, যা তাকে আটকে রেখেছে ৮০০ কিলোমিটারের এক নিঃসঙ্গ কারগারে।

দেওয়ালের ক্যালেন্ডারে লাল কালিতে গোল করা সেই বৃহস্পতিবারটা আরিফের চোখের সামনে কেবল একটি তারিখ নয়; ওটা একটা পবিত্র তীর্থভূমি। আজ থেকে ঠিক সাত দিন পর মা আসবেন। এই সাতটা দিন যেন সাতটি জনম, প্রতিটি ঘণ্টা যেন একেকটি ধূ ধূ মরুভূমি যা তাকে পার হতে হবে।

আরিফ যেখানে থাকে, সেখানে বাতাস মাঝে মাঝে ভারি হয়ে ওঠে বিরহের গন্ধে। তার এবং মায়ের মাঝখানের এই বিশাল ব্যবধান কি কেবল কিলোমিটারের ফিতে দিয়ে মাপা যায়? না। তাদের নাড়ীর বাঁধন তো এক জাদুকরী সুতোয় বোনা—এক অদৃশ্য অথচ ইস্পাত-দৃঢ় তন্তু। সেই সুতোয় যখনই টান পড়ে, আরিফের বুকের বাঁ দিকে নীল পদ্মের মতো এক চিনচিনে বেদনা ফুটে ওঠে। মায়ের অসুস্থতার রক্তপরীক্ষার রিপোর্টগুলো তার ওয়ালেটে সযত্নে রাখা—টাকার চেয়েও মূল্যবান সেই কাগজগুলো ছুঁলে সে যেন মায়ের গায়ের রোদে পোড়া গন্ধ পায়। ওগুলো শুধু রিপোর্ট নয়, ওগুলো মায়ের শরীরের একেকটি অব্যক্ত আর্তি, যা আরিফ তার পকেটে হৃৎস্পন্দনের খুব কাছে আগলে রাখে।

দুপুরের কড়া রোদে যখন অফিসের কাঁচের জানলায় আকাশটা ঝাপসা দেখায়, আরিফের কফিটা বড্ড তেতো মনে হয়। প্রতিটি মিনিট যেন একেকটা অতিকায় পাহাড়। সে মনে মনে জপ করে—"আর মাত্র সাত দিন... ছয় দিন... পাঁচ দিন।" সময়ের এই শম্বুকগতি তাকে দহন করে, অথচ এই যন্ত্রণার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত পবিত্রতা।

প্রতিদিন দুপুরে যখন ক্ষুধার্ত শহরটা নাওয়া-খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত, আরিফ তখন টিফিন বক্স খোলে না। তার আত্মার ক্ষুধা মেটানোর জন্য সে তুলে নেয় ফোন। ওপাশ থেকে যখন ভাইয়ের কণ্ঠ ভেসে আসে, আরিফের মনে হয় সে যেন তপ্ত বালুচরে এক আজলা শীতল জল খুঁজে পেল।

“মা কি ভাত খেয়েছে? ঠিকমত ঔষধ খেয়েছে তা? মা’র শরির আজকে কেমন?”

আরিফের এই প্রশ্নগুলো কেবল শব্দ নয়, এগুলো একেকটি প্রার্থনার তসবিহ। সে বিশ্বাস করে, অফিসের শত কাজের ভিড়ে মায়ের এই সামান্য কুশল সংবাদ নেওয়াটাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ‘ইবাদত’। যেদিন মিটিংয়ের জাঁতাকলে পড়ে বা নেটওয়ার্কের মরীচিকায় মায়ের খোঁজ নেওয়া হয় না, সেদিন তার মনে হয় পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে। মনে হয়, আজকের দিনের প্রধান উপাসনাটাই অপূর্ণ রয়ে গেল, দিনটাই যেন এক বিশাল শূন্যতা।

রাতে যখন সে আবার ফোন করে, ওপাশ থেকে মায়ের সেই জীর্ণ অথচ চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। মা বলেন, “বাবা, এত চিন্তা করিস না। আমি ভালো আছি। তোর কাছে গেলেই বউমার হাতের আদা-চা আর সেদ্ধ ভাতে আমার সব অসুখ ধুয়ে যাবে।”

মায়ের এই মৃদু কথাগুলো যেন অন্ধকার ঘরে একমুঠো জোছনার হাসির মতো ঝরে পড়ে। আরিফ চোখ বন্ধ করে অনুভব করে, ৮০০ কিলোমিটারের সেই দীর্ঘ ধূলিময় পথটা মুহূর্তেই কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল। সময় এখন আর শত্রু নয়, বরং এক মধুর প্রতীক্ষার বাঁশি।

পরদিন অফিসে কাজের চাপে যখনই মনটা কুঁকড়ে যায়, আরিফ নিজেকে সান্ত্বনা দেয়—"আর মাত্র ১২ বার ফোন করা বাকি। ১২ বার মায়ের কণ্ঠের সেই অমৃত পান করলেই তো মা চলে আসবে।"

দূরত্ব তো কেবল শরীরের জ্যামিতি, আত্মার কোনো মানচিত্র থাকে না। ভালোবাসার টানে সেই বিশাল ব্যবধান প্রতিদিন দুবার করে শূন্যে নেমে আসে। আরিফের এই সাধনা কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়, তা হৃদয়ের গভীরতম অরণ্যে প্রস্ফুটিত এক পরম ভক্তি। সময় এখন তার কাছে কেবলই মায়ের আগমনি বার্তা নিয়ে আসা এক কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতা ঝরার শব্দ।

আরিফের অপেক্ষার প্রহরগুলো যেন একেকটি ঝরা বকুল, যা শুকিয়ে গেলেও সুবাস হারায় না। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল। সাত দিনের দীর্ঘ উপবাস শেষে আজ সেই বৃহস্পতিবার—আরিফের জীবনের সবথেকে পবিত্র ঈদ।

স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আরিফ অনুভব করছিল, তার চারপাশের বাতাস আজ অন্যরকম। ট্রেনের সিটিটা যখন দূরের কুয়াশা চিরে শোনা গেল, তার মনে হলো ওটা কোনো যান্ত্রিক শব্দ নয়, ওটা যেন বনবাস শেষ করে আসা কোনো এক দেবীর আগমনি শঙ্খধ্বনি। ট্রেনটা যখন ধীরগতিতে প্ল্যাটফর্মে এসে থামল, আরিফের হৃৎপিণ্ড যেন কামারের হাঁপরের মতো ওঠানামা করছিল। প্রতিটি বগির দরজা দিয়ে নামা অপরিচিত মুখগুলো তার কাছে ছায়ার মতো মনে হচ্ছিল, সে শুধু খুঁজছিল সেই মুখ, যা তার পৃথিবীর আদি এবং অন্ত।

হঠাৎ ভিড়ের মাঝে চেনা সেই জীর্ণ আঁচল আর সাদা চুলের ঝিলিক। মা।

ছোট ভাইয়ের কাঁধে ভর দিয়ে মা যখন নিচে নামলেন, আরিফের মনে হলো ৮০০ কিলোমিটারের সেই অভিশপ্ত মানচিত্রটা পায়ের নিচে ধুলো হয়ে মিশে গেছে। সে দৌড়ে গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াল। কোনো কথা বেরোলো না মুখ দিয়ে, শুধু চোখের কোণ থেকে দুফোঁটা নোনা পানি অবাধ্য হয়ে গড়িয়ে পড়ল। ওগুলো পানি ছিল না, ওগুলো ছিল সাত দিনের জমাট বাঁধা প্রতীক্ষার মুক্তি।

আরিফ যখন মায়ের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল, তখন এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। স্টেশনের সেই কানফাটানো কোলাহল, কুলিদের চিৎকার, ইঞ্জিনের ধোঁয়া—সব যেন নিমিষেই মিলিয়ে গেল। চারপাশটা যেন এক মায়াবী বনানীর মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল, যেখানে কেবল বাতাসের ফিসফিসানি। মায়ের সেই শীর্ণ, কাঁপা কাঁপা হাতটা যখন আরিফের মাথায় ঠেকল, তার মনে হলো সহস্র বছরের ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। মায়ের হাতের তালু থেকে ঝরে পড়ছিল এক অপার্থিব শুদ্ধতা—যেন স্বর্গ থেকে সরাসরি কোনো আশীর্বাদের বৃষ্টি নামছে তার রুক্ষ জীবনে।

মা মৃদুস্বরে বললেন, “বাবা, এসে গেছি। আর তো ভয় নেই?”

আরিফ মায়ের মুখটার দিকে তাকাল। অসুস্থতায় মায়ের গাল দুটো ভেঙে গেছে, চোখের নিচে কালচে ছায়া। কিন্তু সেই চোখে যে মমতা, তা যেন হাজারটা সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল। আরিফের মনে হলো, এতকাল সে যে ‘ইবাদত’ করেছে ফোনের ওপার থেকে, আজ সেই উপাসনা সশরীরে মূর্ত হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে।

বাসায় ফেরার পথে রিকশায় বসে আরিফ মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল। সে অনুভব করল, মায়ের ধমনীতে যে রক্ত বইছে, সেই স্পন্দনই যেন তার নিজের প্রাণের স্পন্দন। শহরের ধূসর দালানকোঠাগুলো আজ যেন সোনারুপার মতো ঝলমল করছে। রাস্তার ধারের ধুলোমাখা গাছগুলোও যেন মাথা নুইয়ে মাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।

ঘরে ঢোকার পর আরিফের ওয়াইফ যখন এক কাপ গরম আদা-চা আর থালায় ধোঁয়া ওঠা সেদ্ধ ভাত নিয়ে এল, মা খেয়ে তৃপ্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই ভাতের গন্ধ যেন সারা ঘরে এক পবিত্র আগর বাতির সুবাস ছড়িয়ে দিল। আরিফ পাশে বসে মাকে খাওয়াচ্ছিল। প্রতিটি লোকমা যখন মায়ের মুখে দিচ্ছিল, তার মনে হচ্ছিল সে কোনো রক্ত-মাংসের মানুষকে খাওয়াচ্ছে না, সে যেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্ম পূর্ণ করছে।

রাত বাড়লে যখন জানলা দিয়ে আসা জোছনার আলো মায়ের ঘুমন্ত মুখে এসে পড়ল, আরিফ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। মায়ের বুকের ওঠানামা তাকে এক অদ্ভুত স্থিরতা দিচ্ছিল। সে বুঝতে পারল, নাড়ীর বাঁধন কোনো ভৌগোলিক দূরত্ব বোঝে না, সে বোঝে শুধু হৃদয়ের টান।

আরিফের বুকের ভেতর থেকে এক গভীর শান্তি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। এতদিনের অনিদ্রা, অস্থিরতা আর আশঙ্কাগুলো যেন আজ মায়ের পায়ের কাছে এসে লুটোপুটি খেয়ে শান্ত হয়ে গেছে। অন্ধকার রাতে সারা শহর যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, আরিফ তখন জেগে রইল তার জীবন্ত ইবাদতের পাহারাদার হয়ে। তার পৃথিবী এখন আর ৮০০ কিলোমিটার দূরে নয়, তার পৃথিবী এখন এই চার দেয়ালের মাঝে, মায়ের পবিত্র সুবাসে আর প্রশান্তির নিশ্বাসে বন্দি।

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”
Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default