সেদিন আকাশের নীল রঙটা একটু বেশিই ফ্যাকাশে ছিল, যেন মেঘেরা রোদের কানে কানে কোনো এক বিচ্ছেদের মন্ত্র পড়ে দিয়েছে। বাবার উঠোনে পা রাখলেই দেখা যেত, সেখানে ডালিম গাছের পাতায় পাতায় ঝুলে আছে হাসির মুক্তোবিন্দু। তিনি যখন আমার জন্য অপেক্ষা করতেন, বাড়ির সামনের পুকুরটা তখন আয়না হয়ে যেত; সেখানে দেখা যেত এক তৃষ্ণার্ত কম্পাসের কাঁটা, যা সবসময় আমাকেই খুঁজে ফিরত। আমার বাবা ছিলেন সেই কম্পাস, যার দিকনির্দেশনা ছাড়া আমার পৃথিবীর মানচিত্র ছিল ধুলোয় মাখা এক মরুভূমি।
ছুটি
শেষে যখন আমি ফিরে আসতাম কর্মস্থলে, তখন আমাদের বিদায়ের মুহূর্তে আকাশ থেকে অঝোরে ঝরত নোনা
জলের বৃষ্টি। বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরতেন,
আর অমনি ঘরের কোণগুলো স্মৃতির চন্দনে
সুবাসিত হয়ে উঠত। তার প্রতিটি চোখের জল মাটিতে পড়ে নীল অপরাজিতা হয়ে ফুটে থাকত
সারাবছর। তিনি কাঁদতেন, আর সেই কান্নার শব্দে বাতাসের হাহাকার যেন এক করুণ বাঁশির
সুর হয়ে বাজত।
মহামারীর
সেই অভিশপ্ত দিনগুলোতে দূরত্বগুলো পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফোনের ওপাশ থেকে মা যখন
বলতেন, ‘তোর বাবা কানে শুনতে পান না’,
তখন মনে হতো মাঝখানে এক বিশাল কাঁচের
দেয়াল আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি জানি,
বাবা শুনতে পেতেন না ঠিকই, কিন্তু আমার
হৃদস্পন্দনের কম্পন ঠিকই তার রক্তে আছড়ে পড়ত। একদিন বাবার কণ্ঠস্বর বেজে উঠল—সেটা
কণ্ঠ ছিল না, ছিল এক জাদুকরী বাঁশির করুণ সুর। তিনি বললেন, "আব্বা, আর বোধহয় তোদের সাথে দেখা হবে না..."।
মুহূর্তেই
আমার চারপাশের দেয়ালগুলো ঘামতে শুরু করল। মাগরিবের জায়নামাজে যখন দাঁড়ালাম, সিজদাহর
জায়গাটা চোখের জলে এক ছোটখাটো সমুদ্রে পরিণত হলো। আমি জানতাম, প্রার্থনায়
পার্থিব শোক বারণ, কিন্তু আমার চোখের জলগুলো তখন বিদ্রোহী হয়ে জোনাকির মতো
উড়ছিল। তারা খুশু-খুজুর নিয়ম মানছিল না,
তারা শুধু এক বৃদ্ধ পিতার অভিমানী
প্রস্থানের গল্প লিখছিল।
২২শে
আগস্ট। ক্যালেন্ডারের সেই সাদা পৃষ্ঠা থেকে সেদিন টপটপ করে রক্তঝরা গোলাপের পাপড়ি
খসে পড়ল। আমার পৃথিবীর উত্তরসূরি নির্ধারণকারী সেই ধ্রুবতারাটি নিভে গেল। বাবা
জান্নাতের অসীমতায় পাড়ি দিলেন, আর আমার বুকের ভেতর রেখে গেলেন এক দীর্ঘস্থায়ী অমাবস্যা।
আমি বলেছিলাম, "কেঁদো না বাবা, আগামী ঈদে আবার আসব।" কিন্তু
সেই কথাটি এখন এক মৃত পাখির মতো আমার গলার কাছে ছটফট করে। বিধাতা সেই প্রতিশ্রুতির
গায়ে এক মহাজাগতিক কুয়াশা মেখে দিয়েছেন,
যা কোনো রোদেই আর কাটবে না।
এখন
এশার আযান যখন নিঝুম শহরে আছড়ে পড়ে, মনে হয় মোয়াজ্জিনের প্রতিটি সুর আজ বাবার শূন্য ভিটের
হাহাকার বহন করে আনছে। মিনারের সেই কাঁপাকাঁপা ধ্বনি যেন এক অলৌকিক কান্নার ঝরনা, যা আমার ঘরের
দেয়ালগুলোকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। আমার ঘরের কোণে রাখা বাবার পুরনো চশমাটার লেন্সে এখন
ধুলো নয়, জমে থাকে জমাটবদ্ধ নিঃসঙ্গতা। মাঝে মাঝে গভীর রাতে মনে হয়, বাবা বুঝি
শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছেন—তার গায়ের সেই পরিচিত আতর আর তসবীহ পড়ার মৃদু শব্দে ঘরটা ভরে
যায়। আমি হাত বাড়াই, কিন্তু ছুঁতে পারি না; শুধু এক মুঠো শীতল বাতাস আমার
আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যায়।
বাবা
এখন আর কাঁদেন না। তিনি এখন দূর আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আমার ফেরার পথ
চেয়ে বসে থাকেন। আর আমি? আমি এই ইট-পাথরের শহরে বসে একলা একলা সেই কান্নার পাহাড়
খুঁড়ি, যে পাহাড়ের ওপাশে আমার শৈশব আর আমার বাবা চিরতরে হারিয়ে গেছেন। গোধূলির
আলো যখন ফিকে হয়ে আসে, আমি স্পষ্ট শুনি এক বৃদ্ধ কণ্ঠের প্রতিধ্বনি বাতাসে ভাসছে— "আব্বা,
আর দেখা হলো না রে..."।
এক আকাশ জোছনা এখন আমার উঠোনে নামে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোয় কোনো উষ্ণতা নেই। সেই আলো এখন কেবল বাবার কবরের ওপর বিছিয়ে দেওয়া এক সাদা কাফন মাত্র।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।