অস্তিত্বের হিমঘর । উপন্যাস। প্রথম পর্বঃ কুয়াশার কফিন

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0
অস্তিত্বের হিমঘর । উপন্যাস। প্রথম পর্বঃ কুয়াশার কফিন

আজ  আকাশের রঙটা ঠিক কালচে নয়, বরং ঘোলাটে ছাইয়ের মতো করে সন্ধ্যা নেমেছে। মোড়ের চায়ের দোকানে টিমটিমে একটা বাল্ব জ্বলছে। ভ্যাপসা গরম ধোঁয়ার আড়ালে চেনা মুখটা যখন সামনে এল, মনে হলো কোনো এক স্মৃতির কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে

চশমার কাঁচটা ঘোলা। চোখের নিচে কালচে এক গভীর খাদ। জাফরের গায়ের চাদরটা এক সময় হয়তো দামি ছিল, এখন সেটা কেবল ধুলো আর অবহেলার স্মারক। সে এক চুমুক চা খেল। চায়ের কাপে ওর আঙুলের কাঁপুনি স্পষ্ট

"আর পারতেছি না রে বন্ধু..." জাফরের গলাটা যেন মাটির গভীর থেকে আসছে। "জীবনের ওপর ঘৃণা ধরে গেছে।"

আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, ও হাতের ইশারায় থামিয়ে দিল। চরাচরে কুয়াশা তখন জেঁকে বসছে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় কুয়াশাগুলোকে দেখাচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পতঙ্গের মতো, যারা জাফরের চারপাশটা ঘিরে ধরছে

"জানিস, এই কনকনে শীতে এত রাতে কেন বাজারে আসলাম?" জাফর ওর পকেটের এক পাতা ট্যাবলেটের দিকে তাকাল। "শুধু এক পাতা ওষুধের জন্য। অথচ ঘরে আমার বৃদ্ধ বাবা-মা ধুঁকছেন।"

জাফর থামল। দূরের কোনো জঙ্গল থেকে হিমেল হাওয়া এসে চায়ের দোকানের টিনের চালটায় একটা অদ্ভুত শব্দ করে গেল। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যা বাতাসের হিমে মিশে গিয়ে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল

"বাবা-মা জিনিসটা অন্যরকম রে। বাবা কাল থেকে কাশছে, একবারও মুখ ফুটে কিছু বলেনি। অথচ আমার স্ত্রী নীলা? সামান্য সর্দি লেগে নাক বন্ধ হয়েছে, তাতেই সারা বাড়ি মাথায় তুলেছে। আমি বললাম, এক কাপ কড়া চা করে দিই? না, মুখ ভার! তুই তো জানিস, ওর মুখ ভার মানে ঘরে নরক নেমে আসা। তাই এই দুই মাইল পথ হেঁটে আসলাম ওর জন্য ওষুধের স্প্রে কিনতে। বাবার কাশির সিরাপটা আজ আর কেনা হলো না।"

জাফরের কণ্ঠস্বরে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল এক ধরণের ভয়ংকর নির্লিপ্ততা। ও যখন ওষুধের প্যাকেটটা পকেটে পুরল, আমি দেখলাম ওর হাত দুটো কাঁপছে। ওটা কেবল শীতের কাঁপুনি নয়; ওটা হয়তো ভেতরে চেপে রাখা কোনো আগ্নেয়গিরির কম্পন

"মাঝে মাঝে মনে হয় এই পথ যদি কোনোদিন শেষ না হতো! বাড়িতে ঢুকলেই মনে হয় আমি আর আমি নেই। সেখানে আমি কেবল একজন 'যোগানদাতা'"

জাফর অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। কুয়াশার চাদরে ঢাকা মেঠো পথ ধরে ওর ছায়াটা দীর্ঘ হতে হতে একসময় বিলীন হয়ে গেল। ওর জীর্ণ চাদরের ঘষা লাগার 'খসখস' শব্দটা কিছুক্ষণ ভেসে এল, তারপর সব নিস্তব্ধ

গ্রামের সেই নির্জন পথে আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মনে হলো, জাফর শুধু ওষুধের জন্য ছুটছে না। ও ছুটছে এক অলিখিত নিয়তির পেছনে, যেখানে বাবার নিরবতা আর স্ত্রীর অভিমানের মাঝখানে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে একটি জীবন্ত মানুষের আত্মা

শীতের রাতটা আজ বড় বেশি দীর্ঘ, আর জাফরের একাকিত্বের হিমটা যেন এই পৃথিবীর সমস্ত শীতের চেয়েও তীব্র
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”
Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default