স্মৃতি বড় অদ্ভুত এক মায়া। বর্তমান যখন গলার কাছে ফাঁস হয়ে চেপে বসে, মানুষ তখন অবলীলায় অতীতের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। জাফরও দাঁড়াল। বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিংবেলে আঙুল ছোঁয়ানোর ঠিক আগের মুহূর্তটি যেন থমকে গেল। কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে সে ফিরে গেল বারো বছর আগে।
রাজধানীর এক মেঘলা বিকেল। কারওয়ান বাজারের সেই বহুতল ভবনের কাঁচের
দেয়াল চিরে বাইরের আকাশটা দেখা যাচ্ছিল। জাফর তখন এক নামী মাল্টিন্যাশনাল
কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। পরনে কড়কড়ে ইস্ত্রি করা স্কাই-ব্লু শার্ট, কবজিতে দামী
ঘড়ি। ফাইলপত্রের পাহাড়ের মাঝেও তার চোখে তখন বিশ্বজয়ের জেদ।
ঠিক তখনই দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকেছিল নীলা। ইন্টার্নশিপের ইন্টারভিউ
দিতে আসা এক চপল মেয়ে। নীল রঙের কামিজের সাথে মিলিয়ে চুলে একটা সরু ফিতো বাঁধা।
সেই বিকেলে নীলা যখন কথা বলছিল, জাফরের মনে হয়েছিল ওর কণ্ঠস্বর যেন কোনো চেনা সুরের ঝংকার।
"স্যার, আমি কি ভেতরে
আসতে পারি?"
জাফর সেদিন চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়েছিল। সেই তাকাতেই বোধহয় তার জীবনের
কক্ষপথ পাল্টে গিয়েছিল।
পরের কয়েক মাস ছিল যেন একটা ঘোরের মতো। অফিস শেষে হাতিরঝিলের পাড়ে বসে
থাকা, বাদাম চিবানো আর হাজারো স্বপ্নের বুনন। নীলা হাসলে ওর গালে টোল পড়ত, আর জাফর ভাবত
এই হাসিটার জন্যই সে সারা পৃথিবী লড়তে পারে। নীলা বলত, "জাফর, তোমার এই
জেদটা আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয় তুমি আমায় আগলে রাখবে সবসময়।"
তখনকার জাফর জানত আগলে রাখা মানে কী। সে ভাবত ক্ষমতা আর টাকা থাকলেই
প্রিয় মানুষকে আগলে রাখা যায়। সে জানত না,
আগলে রাখার আসল পরীক্ষাটা শুরু হয় অভাব
আর বার্ধক্যের সন্ধিক্ষণে।
একবার খুব বৃষ্টি নেমেছিল বিকেলে। জাফর নিজের ছাতাটা নীলার মাথার ওপর
ধরে নিজে ভিজে একাকার হয়েছিল। নীলা কপালে ভাঁজ করে বলেছিল, "তুমি
এমন কেন জাফর? নিজের কথা তো ভাবলে না!"
সেদিন জাফর বুক ফুলিয়ে বলেছিল,
"তোমার জন্য আমি পাহাড়ের চূড়া থেকে ঝাঁপ
দিতে পারি নীলা, আর এ তো সামান্য বৃষ্টি!"
আজ সেই অন্ধকারের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে জাফরের খুব হাসতে ইচ্ছে করল। সে ঝাঁপ
দিয়েছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে নয়, মধ্যবিত্তের এক অতল গহ্বরে। যেখানে প্রতিদিন তাকে ভিজতে হয়, কিন্তু ছাতা
ধরার মতো কেউ নেই।
নীলা তখন ছিল এক পশলা বৃষ্টির মতো স্নিগ্ধ। অথচ বিয়ের কয়েক বছরের মাথায়
সেই বৃষ্টির ধারা কখন যে বিধ্বংসী বন্যায় রূপ নিল, জাফর টেরই পায়নি। অভাব যখন দরজায়
কড়া নাড়ল, তখন সেই নীল ফিতার মেঘগুলো কালো ধোঁয়ায় পরিণত হলো। নীলা এখন আর স্নিগ্ধ
নয়; সে এখন এক দাবিদার। যে কেবল পেতে জানে, দিতে শেখেনি।
অফিসের সেই দাপুটে জাফরের মৃত্যু হয়েছিল যেদিন সে প্রথমবার নীলার
অযৌক্তিক রাগের সামনে মাথা নিচু করেছিল। তার সেই তেজ, সেই
আত্মসম্মানবোধ—সবই যেন কর্পোরেট অফিসের কাঁচের দেয়ালের ওপাশে ফেলে এসেছে সে।
দরজার ভেতর থেকে আবার নীলার কর্কশ ডাক ভেসে এল, "জাফর!
দাঁড়িয়ে আছ কেন? দরজা কি আমি খুলব?"
স্মৃতির নীল মেঘগুলো এক নিমেষে কালো কুয়াশায় মিশে গেল। জাফরের বর্তমান
আবার ডানা ঝাপটে উঠল। সে দরজার নব ঘোরাল। ফিরে এল তার সেই 'ছাপোষা' রাজত্বে, যেখানে কোনো
মেঘ নেই, আছে কেবল গুমোট অন্ধকার।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।