পবিত্র রমজান মাস আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং ত্যাগের বারতা নিয়ে এলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা এক বিপরীতধর্মী রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। সম্প্রতি গণমাধ্যমে উঠে আসা ‘ভাসমান গোডাউন’ বা সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনাটি কেবল একটি অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক চরম নিদর্শন। মুষ্টিমেয় কয়েকজন আমদানিকারকের কাছে কোটি কোটি ভোক্তার জিম্মি হয়ে পড়া প্রমাণ করে যে, বাজার ব্যবস্থা আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এক নিষ্ঠুর ‘মজুতদারি’ চক্রের নিয়ন্ত্রণে। এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলো—বাজারের এই অস্থিরতা কেবল চাহিদাও জোগানের সংকট নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক লোভ এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক সম্মিলিত ফসল।
সংযম বনাম সংহারী লালসা
রমজানের
মূল দর্শন যেখানে ইন্দ্রিয়দমন এবং সহমর্মিতা, সেখানে বাজারের এই চিত্রটি এক
ভয়াবহ বৈপরীত্য তৈরি করে। ৬০০টি পণ্যবাহী জাহাজ সাগরে ভাসিয়ে রেখে দাম বাড়ার
অপেক্ষা করা আসলে এক ধরণের ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’। এখানে মানুষের ক্ষুধা এবং
প্রয়োজনকে পুঁজি করে মুনাফা শিকারের যে প্রবণতা দেখা যায়, তা চরম
অমানবিক। এই প্রক্রিয়ায় বাজারের অদৃশ্য হাতটি মূলত সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক
হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এটি এমন এক সামাজিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয় যেখানে সামষ্টিক
কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত লালসা বেশি শক্তিশালী, এবং যেখানে বাজার ব্যবস্থা
নৈতিকতার পরিবর্তে নিষ্ঠুর গাণিতিক মুনাফার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
অদৃশ্য শেকল
‘সাগরে ভাসমান ৬০০ গোডাউন’ শব্দবন্ধটি এখানে কেবল বাস্তব
চিত্র নয়, বরং এটি আধুনিক পুঁজিবাদের এক কুৎসিত রূপক। জাহাজগুলো এখানে
প্রতীক্ষমাণ শিকারির মতো, যারা ওত পেতে আছে কখন সাধারণ মানুষের হাহাকার চরমে
পৌঁছাবে। এই ‘ভাসমান গুদাম’ মূলত আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতীক। লেখক
হিসেবে এখানে ‘রোজার বাজার’ শব্দটিকে একটি ব্যঙ্গাত্মক রূপক হিসেবে দেখা যেতে
পারে—যেখানে ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতা পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে পিষ্ট হচ্ছে। এই
পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি ‘অদৃশ্য শেকল’ হিসেবে অভিহিত করা যায়, যা দিয়ে
আমদানিকারক সিন্ডিকেট গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে বেঁধে রেখেছে।
সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিঃ বর্তমান প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান
বাংলাদেশে বাজার সিন্ডিকেট কোনো নতুন আপদ নয়,
বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্যান্সার। ৬
জন আমদানিকারকের হাতে বাজারের চাবিকাঠি থাকা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য
লজ্জাজনক। এটি কেবল ব্যবসায়িক কৌশল নয়,
বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর
দুর্বলতা এবং তদারকি সংস্থার ব্যর্থতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আজকের এই
মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে যখন ভোক্তা অধিকার নিয়ে বিশ্ব সোচ্চার, তখন
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ‘মজুতদারি’ নামক এক মধ্যযুগীয় শোষণের শিকার হচ্ছে। এই
অস্থিরতা যদি নিরসন করা না যায়, তবে তা কেবল অর্থনীতির ক্ষতি করবে না, বরং জনমনে চরম
ক্ষোভ ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেবে।
সাগরে ভাসমান জাহাজগুলো কেবল পণ্য বয়ে আনছে না, তা বয়ে আনছে
সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস। রোজার সংযম যখন বাজারের নিষ্ঠুর হিসাবের কাছে পরাজিত
হয়, তখন বুঝতে হবে জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড আজ নড়বড়ে। এই জিম্মিদশা থেকে
মুক্তি পেতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং একটি জবাবদিহিতামূলক বাজার
কাঠামো এবং শক্তিশালী গণ-আন্দোলন প্রয়োজন। ভাসমান গোডাউনের ভার আর কতদিন সাধারণ
মানুষ বইবে, সেই প্রশ্নটি আজ রাষ্ট্রের বিবেকের কাছে এক বিশাল জিজ্ঞাসাচিহ্ন হয়ে
দাঁড়িয়ে আছে।
পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা এক ‘মানবিক বিপর্যয়’
বাংলাদেশ
নামক এই বদ্বীপের মানচিত্র আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সাক্ষী। একদিকে উন্নয়নশীল
রাষ্ট্রের তকমা, অন্যদিকে মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে সাধারণ
মানুষের নাভিশ্বাস—এই হলো সমকালীন বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
বিশেষ করে রমজান মাস এলেই সংযমের বারতার চেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় ‘সিন্ডিকেট’
শব্দটি। সাগরে ভাসমান শত শত পণ্যবাহী জাহাজ যখন বন্দরে নোঙর না করে সাগরেই প্রহর
গোনে দাম বাড়ার আশায়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের অর্থনীতি মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের
কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই সংকট কেবল জোগানের অভাব নয়, বরং এটি
পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা এক ‘মানবিক বিপর্যয়’।
বাংলাদেশের বাজার ও সিন্ডিকেটের রসায়ন
বাংলাদেশের
বাজার ব্যবস্থা বর্তমানে এক জটিল ‘অলিগোপলি’ যা মুষ্টিমেয় বিক্রেতার নিয়ন্ত্রণে।
চাল, ডাল, তেল বা চিনির মতো নিত্যপণ্যের নিয়ন্ত্রণ ঘুরেফিরে ৫ থেকে ৬
জন বড় আমদানিকারক বা ‘পুঁজিপতি’-এর হাতে। যখন এই চক্রটি বুঝতে পারে যে নির্দিষ্ট
কোনো মৌসুমে (যেমন রমজান) চাহিদা বাড়বে,
তখনই তারা ‘মজুতদারি’ নামক মারণাস্ত্র
ব্যবহার করে।
সাগরে
জাহাজ ভাসিয়ে রাখা বা গুদামে পণ্য পচানো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক ধরণের ‘পাওয়ার
গেম’। এখানে অর্থনীতির স্বাভাবিক সূত্র ‘চাহিদা ও যোগান’ কাজ করে না; বরং কাজ করে
‘পাওয়ার ও কারসাজি’। ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশে তার সুফল সাধারণ মানুষ
পায় না, কিন্তু বিশ্ববাজারে এক টাকা বাড়লে এখানে বাড়ে ১০ টাকা।
আর্থ-সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়
বাংলাদেশের
এই বাজার অস্থিরতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো নৈতিকতার চরম ধস। ধর্মীয় আবহে গড়ে
ওঠা এই সমাজে রমজানকে পুঁজি করে মুনাফা শিকার এক চরম ভণ্ডামি। ব্যবসায়ী থেকে শুরু
করে খুচরা বিক্রেতা—প্রত্যেকেই যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই প্রক্রিয়ায়
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজ পিষ্ট হচ্ছে। মানুষ যখন তার মৌলিক চাহিদার জন্য
প্রতিদিন সংগ্রাম করে, তখন তার মধ্যে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি এক ধরণের চরম অনীহা
এবং ক্ষোভ জন্ম নেয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
বাংলাদেশের
বাস্তবতায় বাজার নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হলো তদারকি সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতা। মাঝেমধ্যে
কিছু খুচরা দোকানে জরিমানা করা হলেও মূল হোতা বা বড় আমদানিকারকদের স্পর্শ করা হয়
না। এই ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সিন্ডিকেটকে আরও সাহসী করে তুলেছে। প্রশাসনের ভেতরে
থাকা অসাধু যোগসাজশ এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যবসায়ীরাই মূলত বাজারের অদৃশ্য
নিয়ন্ত্রক। সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব এবং তদারকির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এই চক্রটি
সাধারণ মানুষের রক্ত চোষা মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।
উত্তরণের পথঃ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করণীয়
বাংলাদেশের
এই ক্রান্তিকাল থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইন দিয়ে হবে না, বরং ব্যবস্থার
আমূল পরিবর্তন প্রয়োজনঃ
- আমদানির বিকেন্দ্রীকরণঃ বড় কয়েকটা গ্রুপের বদলে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি
ব্যবসায়ীকে আমদানির সুযোগ দিতে হবে।
- বিকল্প চেইন তৈরিঃ টিসিবি-কে একটি আধুনিক ও শক্তিশালী ব্যবসায়িক কাঠামোয়
রূপান্তর করতে হবে, যা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনবে এবং
ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে।
- কঠোর দৃষ্টান্তঃ সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত বড় আমদানিকারকদের কেবল জরিমানা
নয়, বরং জেল এবং ব্যবসা পরিচালনার লাইসেন্স চিরতরে
বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
- ভোক্তা আন্দোলনঃ বাংলাদেশে ‘ভোক্তা অধিকার’ বিষয়টি এখনো কেবল সরকারি
দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। একে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।
উপসংহার


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।