হঠাৎ
করেই দেখা গেল, উঠোনের এক কোণে রাখা মাটির কলসি থেকে পানির বদলে গড়িয়ে
পড়ছে রুপোলি জ্যোৎস্না। সেই আলোর ধারা এঁকেবেঁকে ঘরের দাওয়ায় এসে থামল। ঘরের ভেতর
তখন এক অদ্ভুত নীরবতার গান বাজছে। বাতাসের ঝিরিঝিরি শব্দে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি
যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে কারোর নাম জপছে।
আমি
জানালার পাশে দাঁড়ালাম। দেখলাম, শুভ্র মেঘের আড়ালে চাঁদিমা লুকোচুরি খেলছে। ঠিক তখনই এক
অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। মেঘের আড়াল থেকে যখনই চাঁদ মুখ বাড়াচ্ছে, আমার ঘরের
দেয়ালে জমা হওয়া পুরনো দুঃখগুলো নীল রঙের ছোট ছোট ফুল হয়ে ফুটে উঠছে। সেই বিষাদের
ফুলগুলো থেকে ঝরছে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
আমার
ভেতরে তখন এক তোলপাড় করা তৃষ্ণা। এ তৃষ্ণা পানির নয়, এ তৃষ্ণা সমর্পণের। চারদিকের
এই মায়াবী মৌনতা আমাকে টেনে নিল জায়নামাজের কিনারে। যখন কপালটা মাটিতে ঠেকালাম, মনে হলো
আমি মাটির স্পর্শ পাচ্ছি না, বরং অনন্ত এক আকাশ আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। সিজদাবনত সেই শির
আর উঠতে চাইল না। মনে হলো, হৃদয়ের মরুভূমিতে হঠাৎ করেই প্রভুর রহমের এক ঝরনাধারা
বইতে শুরু করেছে।
কামিনী
ফুলের তীব্র সুবাস তখন ঘরের বাতাসকে মদির করে তুলেছে। প্রতিটি নিশ্বাসে অনুভব
করছিলাম—অন্ধকারের পেটেও কত সুখ লুকিয়ে থাকতে পারে! হৃদয়ের গহিনে যে প্রেমের ধারা
বইছে, তা যেন সাত সমুদ্রের চেয়েও বিশাল।
বাইরে
তখনো জোনাকিরা কথা বলে যাচ্ছে। কিন্তু আমার কানে এখন আর কোনো শব্দ নেই। সেখানে
কেবল এক পরম সুরের প্রতিধ্বনি—যিনি অন্ধকারকে আলো দিয়ে ধুয়ে দেন, যাঁর রহমতে
জীবনটা হয়ে ওঠে মধুর চেয়েও মিষ্টি।
রাত
বাড়ে। চাঁদ আরও একটু মেঘের আড়ালে সরে যায়। কিন্তু আমার ঘরের কোণে ফুটে থাকা সেই
নীল ফুলগুলো এখন সোনালি হতে শুরু করেছে। পরম শান্তির এক আবেশে চোখ বুজে আসে, আর বুকের
ভেতর বয়ে চলে এক অন্তহীন অলৌকিক নদী।
নূরের নদী ও কামিনীর সুবাস
সেদিন
আকাশের নীল চাদরটা বুক চিড়ে ঝরঝর করে হাসছিল। ঠিক যেন হাজারটা রুপোলি মোহর ছড়িয়ে
পড়েছে মহাকাশের উঠোনে। গ্রামের মানুষ বলে,
যেদিন চাঁদ আর তারা এমন করে কথা বলে, সেদিন নাকি
শব্দ শোনা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। আকাশের সেই অগণিত নক্ষত্রের মেলা
দেখে মনে হচ্ছিল, ওরা যেন একেকটি জ্বলজ্বলে চোখের পাতা, অপলক
তাকিয়ে আছে মাটির পৃথিবীর দিকে।
অন্ধকারের
গায়ে জোনাকিরা তখন রূপকথার গল্প লিখছে। একেকটি জোনাকি যেন একেকটি জীবন্ত
প্রার্থনা। তাদের টিমটিমে আলোয় বাতাসের শরীর ভিজে উঠছে। আমি বারান্দায় বসে যখন হাত
বাড়ালাম, একটা জোনাকি এসে আমার আঙুলের ডগায় বসল। অদ্ভুত ব্যাপার! সে কোনো
পতঙ্গ নয়, যেন এক ফোঁটা আলোর অশ্রু। কানে কানে বলে গেল—"শোন, আজ রাতে
মউত নেই, আজ শুধু বিলীন হওয়ার লগ্ন।"
সিজদাহ ও মৌনতার গান
চারিদিকে
এক গভীর নিস্তব্ধতা। কিন্তু এই নিস্তব্ধতা কি আসলে খালি? না, এ যেন এক শব্দহীন চিৎকার। বাতাস যখন ঝিরঝির করে বয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে
প্রকৃতির প্রতিটি পাতা পরম এক সত্তার কদম মোবারক স্পর্শ করে ফিরে আসছে। আমার
ভেতরটা তখন এক তৃষ্ণার্ত মরুভূমি। হঠাৎ মনে হলো, আমার কপালটা মাটির দিকে ঝুঁকে
পড়ছে না, বরং মাটিই যেন চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছে আমার অহংকারকে।
আমি
যখন সিজদায় মাথা নত করলাম, কপালটা মেঝেতে ঠেকতেই ঘরটা আর ঘর থাকল না। দেয়ালগুলো সব
কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে গেল। আমি দেখতে পেলাম,
আমার শিরা-উপশিরায় রক্ত নয়, বরং এক নূরের নদী
বইছে। সেই নদীর নাম ‘প্রেম’। প্রভু, তোমার দয়ার
মধু তখন আমার রুক্ষ জীবনের প্রতিটি কোষে চুইয়ে পড়ছে। এক ফোটা রহমত যেন হাজার বছরের
তৃষ্ণা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
মেঘের লুকোচুরি ও স্মৃতির সুরভি
জানলার
বাইরে তাকালাম। চাঁদিমা তখন শুভ্র মেঘের ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকেছে। লুকুচুরি খেলছে যেন
কোনো এক শাশ্বত প্রেমিকের সাথে। আঁধারের পেট চিরে এমন স্নিগ্ধ সুখ বেরিয়ে আসতে
পারে, তা আগে কখনো বুঝিনি। অন্ধকারের কি নিজস্ব কোনো আলো আছে? নাকি তোমার
প্রেমের ছোঁয়া পেলে নিকষ কালো পাথরও হীরে হয়ে জ্বলে ওঠে?
ঠিক
তখনই কামিনী ফুলের গন্ধে সারা ঘর মৌ-মৌ করে উঠল। অথচ আমার উঠোনে কোনো কামিনী গাছ
নেই! তবুও সাদা সাদা ছোট ফুলগুলো যেন অলৌকিক হাতে আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে আমার
চারিপাশে। সেই সুরভিতে এক মায়াবী নেশা। মনে হলো, এই মুহূর্তটা যদি থমকে যেত!
পৃথিবীর সব ঘড়ি যদি একসাথে অচল হয়ে যেত!
আমার
মনের আয়নায় তখন শুধু একটিই ছবি—তোমার প্রেমের অবিরাম ধারা। সেই ধারায় ধুয়ে যাচ্ছে
যাবতীয় শোক, যাবতীয় ক্লান্তি। রাতের শেষ প্রহরে যখন জোছনা ফিকে হয়ে আসছে, তখনো আমার
হৃদয়ে সেই জোনাকির গল্পটি জ্বলজ্বল করছে। শান্তি, এক গভীর প্রশান্তি।
গল্পের
সেই মায়াবী রাত যেন শেষ হতেও হতে চায় না। সময়ের কাঁটাগুলো তখন গলিত সোনার মতো
ধীরস্থির। কামিনী ফুলের সেই অলৌকিক ঘ্রাণ যখন আমার সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, তখনই অনুভব
করলাম এক অদ্ভুত রূপান্তর।
অসীমের অভিসার
আমার
ঘরের মেঝেটা যেন ধীরে ধীরে স্বচ্ছ এক হাউজে কাউসার এ পরিণত হলো। সেখানে টলটল করছে
মেঘমুক্ত আকাশের প্রতিচ্ছবি। আমি সেই নূরের নদীর ওপর দিয়ে হেঁটে চললাম, অথচ আমার
পায়ে এক ফোঁটা পানিও লাগল না। প্রতিটি কদমে কদমে ফুটে উঠতে লাগল কাঁচের মতো স্বচ্ছ
একেকটি পদ্ম। জোনাকিরা তখন আর শুধু পতঙ্গ নয়,
তারা আমার চারধারে এক ঘূর্ণায়মান
সুরমণ্ডল তৈরি করেছে। তাদের পাখার ঝাপটায় ভেসে আসছে সেই অবিনাশী সুর— যা কেবল
হৃদয়ের কান দিয়ে শোনা যায়।
আমি
আকাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম, শুভ্র মেঘের আড়ালে চাঁদটা যেন এক বিশাল সাদা চন্দনের
তিলক হয়ে মহাকাশের কপালে শোভা পাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো, সেই মেঘগুলো আসলে মেঘ নয়; ওগুলো যেন
তোমার রহমতের কোমল তুলো, যা দিয়ে তুমি এই পৃথিবীর সব ক্ষত মুছে দিতে চাও।
আঁধারের অন্তরালে যে এমন হিরণ্ময় সুখ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আগে
কোনোদিন এই মাটির মানুষটি বুঝতে পারেনি।
হৃদয়ের সেই নিভৃত কোণ
সিজদাহ
থেকে যখন মাথা তুললাম, দেখলাম আমার দুশ্চিন্তাগুলো সব নীল রঙের ছোট ছোট
প্রজাপতি হয়ে জানলা দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। আমার বুকের ভেতর যে দীর্ঘদিনের হাহাকার ছিল, তা এখন এক
প্রশান্ত ঝরনার শব্দে পরিণত হয়েছে। প্রভু,
তোমার প্রেমের এই ধারা যখন বইতে শুরু
করে, তখন মানুষের তৈরি সব বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
বাতাস
তখন আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলে গেল,
"তুই একা নোস, তোর প্রতিটি নিঃশ্বাসে অসীমের স্পন্দন আছে।" আমি দুহাত তুললাম আকাশের পানে। আমার আঙুলের ডগা দিয়ে তখন ঝরছে
রূপোলি জ্যোৎস্না। মনে হলো, আমি চাইলেই এখন নক্ষত্রদের ছুঁতে পারি, চাইলেই
মেঘের পালক ছিঁড়ে আনতে পারি। কিন্তু সেই চাওয়ার আর কোনো অবশেষ রইল না; কারণ যার
মনে তোমার প্রেমের নহর বয়ে যায়, তার কাছে এই নক্ষত্ররাজি তো অতি তুচ্ছ এক উপহার।
শেষহীন এক শেষ
রাতের
শেষ প্রহর যখন ভোরের কপালে চুমু খেতে এগিয়ে আসছে, তখন চারিদিকের নিস্তব্ধতা আরও
গাঢ় হলো। কামিনীর সুবাস তখন মিলিয়ে গিয়ে এক চন্দন-মাখা পবিত্র গন্ধে রূপ নিল। আমার
চোখের কোণে এক ফোঁটা পানি চিকচিক করছিল—সেটা কষ্টের নয়, সেটা
মিলনের পূর্ণতা।
পাখিরা
যখন হালকা ডানা ঝাপটাতে শুরু করল, আমি বুঝলাম এই জাদুকরী লগ্নটি পৃথিবীর নিয়মে শেষ হতে
চলেছে। কিন্তু আমার ভেতরে যে সূর্যটা উদিত হলো, তার আর কোনো অস্ত নেই। জোছনা
মুছে যাবে, তারার মেলা ভাঙবে, কিন্তু তোমার প্রেমের সেই ঝিরঝিরে বাতাস আমার রুহের
গলিঘুঁজিতে চিরকাল বয়ে বেড়াবে। এক অনাবিল শান্তি আমার সমস্ত অস্তিত্বকে জড়িয়ে
ধরল, যেমন করে কুয়াশা জড়িয়ে ধরে ঘুমন্ত ঘাসফুলের বনকে।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।