রূপালী চোখের জলছাপ

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

 

রূপালী চোখের জলছাপ

রেললাইনের সমান্তরালে দিনগুলো বয়ে যায়, কিন্তু কিছু মুহূর্ত জং ধরা লাইনের ধারে ফুটে থাকা বুনো ফুলের মতো জেদি হয়ে টিকে থাকে। যমুনা সেতু পশ্চিম স্টেশন। দুপুরের রোদ এখানে লেলিহান আগুনের মতো ঝরে পড়ে। চারদিকে তপ্ত বাতাসের হাহাকার। ট্রেনের জানলার গ্রিল ধরে আমি যখন অলস চোখে বাইরের পৃথিবীটা দেখছিলাম, ঠিক তখন দৃশ্যপটের নীরবতা ভাঙল এক পশলা চিৎকারে।

ট্রেনের ছাদ থেকে নামতে গিয়ে এক ভদ্রলোক ধপাস করে পড়ে গেলেন। ঠিক যেন ধোপার পাটে আছাড় খাওয়া ভেজা কাপড়। যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তিনি, চারপাশের বাতাস তখন তৃষ্ণায় কাঠ হয়ে ‘পানি পানি’ বলে আর্তনাদ করছে। তখনই আমার চোখের কোণে ধরা পড়ল এক চিলতে ছায়া। একটা ছোট্ট মেয়ে, দুহাতে রূপালি কলস নিয়ে তিরের মতো ছুটে যাচ্ছে সেদিকে। সেবারই প্রথম তাকে দেখলাম

মেয়েটির নাম আমি মনে মনে রাখলাম ‘আখিনুর’। ওর গায়ের রং যেন বর্ষার মেঘে ভেজা মাটি, কিন্তু চোখ দুটো? সেখানে জমা হয়ে আছে এক আজব মায়াবী জ্যোৎস্না। মনে হচ্ছিল, ওর চোখের মণিতে কেউ এক মুঠো হিরের গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়েছে। পরনে তার নাভি থেকে হাঁটু অবধি এক টুকরো ছোট প্যান্ট, গায়ে আর কিছুর বালাই নেই। কানে দুটো দুল রোদে ঝিকমিক করছে। ওগুলো সোনা কি না জানি না, তবে ওই রোদে তারা যেন নক্ষত্রের মতো হাসছিল

আমি একটু বাঁকা হেসেই বললাম, "তোমার ব্যবসার তো আজ লাল বাতি! লোকটাকে এমনি এমনি পানি খাইয়ে দিলে?"

আখিনুর থামল। ওর রুপোলি কলস থেকে চুইয়ে পড়া এক ফোঁটা পানি মাটিতে পড়তেই সেখানে যেন একটা নীল পদ্ম ফুটে উঠল। ও শান্ত গলায় বলল, "সমস্যা নেই। একজন মানুষ কষ্ট পাচ্ছিলেন, তার উপকার তো হলো।"

কথাটা আমার কানে বিষাদের সুরের মতো বাজেনি। যে মেয়েটি এক গ্লাস পানি দুই টাকায় বিক্রি করে সংসার চালায়, তার হৃদয়ে এতখানি নীল সমুদ্রের গভীরতা এল কোত্থেকে? কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি পানি বিক্রি করো কেন?"

প্রশ্নটা ছোঁড়ামাত্র ওর ডাগর চোখের উজ্জ্বলতা যেন হঠাৎ মেঘে ঢাকা পড়ল। এক ঝটকায় পিঠ ফিরিয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। বিড়বিড় করে বলল, "সংসারে অভাব, তাই বেচি। চুরি তো করি না!"

ওর ছোট ছোট পা ফেলার শব্দে যেন আত্মসম্মানের এক একটা স্পন্দন ধ্বনিত হচ্ছিল। আমি তড়িঘড়ি করে ওকে থামালাম, "না, না, ওভাবে বলিনি। তুমি কি স্কুলে যাও?"

"যাই। ক্লাস ফোর," ও আবার ফিরে দাঁড়াল

"কত দূর থেকে পানি আনো তোমরা?"

"হ্যাঁ, বাড়ির চাপকল থেকে। এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে"

আখিনুর অস্থির হয়ে উঠল। সময়ের ঘড়ি যেন ওর পায়ে শিকল পরাচ্ছে। "আপনার সাথে গল্প করলে হবে না, আমার পানি বিক্রি করতে হবে।" ও আবার সুর করে ডাকতে শুরু করল— ‘পানি, পানি! মাত্র দুই টাকা গ্লাস!’

আমি পকেট থেকে একটা একশ টাকার নোট বের করে বললাম, "আখিনুর, আমি যদি তোমাকে এই একশ টাকা দিই, তুমি নেবে?"

ওর চোখ দুটো এবার ধক করে জ্বলে উঠল। "আপনি আমাকে টাকা কেন দেবেন? আমি কি ভিক্ষা চাইছি? আব্বু বলেছে, ভিক্ষা মানুষের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। যারা ভিক্ষা করে, তারা সমাজের কোনো কাজে লাগে না।"

ওর কথাগুলো যেন অদৃশ্য চাবুকের মতো আমার শহুরে আভিজাত্যে আঘাত করল। এক টুকরো মেঘ এসে তখন রোদের তেজ কমিয়ে দিয়েছে। আমি কাকুতি-মিনতি করে বললাম, "আরে না, এটা ভিক্ষা না। মনে করো, তোমার এক গ্লাস পানি আমি একশ টাকা দিয়ে কিনে নিলাম।"

"দুই টাকার জিনিস একশ টাকায় কেন নেব?"

ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলো। লোহার চাকাগুলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে নড়তে শুরু করেছে। আমি আর ভাবার সময় পেলাম না, জানালা দিয়ে নোটটা ওর পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিলাম। ট্রেন গতি বাড়াচ্ছে। আখিনুর পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ও নোটটা কুড়িয়ে নিল ঠিকই, কিন্তু ওর দৃষ্টিতে কোনো জয়ী হওয়ার উল্লাস ছিল না, বরং ছিল এক গভীর বিড়ম্বনা আর বিষণ্নতা

ট্রেন যত দূরে যাচ্ছিল, আখিনুর তত ছোট হয়ে আসছিল। ঝাপসা চোখে দেখলাম, সেই কালো মেয়েটি রূপালি চোখের আলো নিয়ে আজও আমার স্মৃতির লাইনের ধারে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনের চাকার গতির সাথে তাল মিলিয়ে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত হাহাকার বাজতে লাগল— ঠিক যেন কোনো অপূর্ণ কবিতার শেষ পঙক্তি, যা হৃদয়ে এসে আটকে গেছে, কিন্তু কাগজে আর নামেনি

ট্রেনটা সেদিন সেখান থেকে ছেড়ে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু আখিনুরের সেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দৃষ্টিটা আমার পিছু ছাড়েনি। সেই ঘটনার ঠিক দশ বছর পর, আবারও আমাকে সেই একই পথে ফিরতে হলো। তবে এবার ট্রেনের জানালা দিয়ে নয়, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, যেখানে এখন ধুলোবালি আর হকারদের চিৎকারের মাঝে এক চিলতে অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করে।

সেদিনের সেই তেপান্তরের রোদে পোড়া প্ল্যাটফর্ম এখন আর আগের মতো নেই। স্টেশনের এক কোণে একটি ছোট টিনের ছাউনি, যেখান থেকে ভেসে আসছে ছোট ছোট শিশুদের সমবেত কণ্ঠস্বর। কৌতূহলবশত সেদিকে এগিয়ে যেতেই থমকে দাঁড়ালাম

ছাউনির নিচে একটা ছোট লাইব্রেরি আর পাঠশালা। চুনকাম করা দেয়ালে নীল রঙের আল্পনা দিয়ে আঁকা হয়েছে এক জোড়া বিশাল চোখ। ঠিক সেই রূপালী আলোর চোখ দুটো, যা আমি দশ বছর আগে দেখেছিলাম। আর সেই দেয়ালের নিচেই বসে আছে এক তরুণী। গায়ের রং সেই মেঘ-মেদনী কালো, কিন্তু তার শরীরে এখন এক আশ্চর্য আভিজাত্য। তার পরনে একটা সাদা ধবধবে শাড়ি, যা দেখে মনে হচ্ছিল মেঘের বুক চিরে এক ফাঁলি রোদ নেমে এসেছে

ওর কানের সেই ঝিকমিকে দুল দুটো আজ আর ইমিটেশন মনে হচ্ছে না। ওটা এখন সূর্যের আলোয় খাঁটি সোনার মতোই জ্বলজ্বল করছে। আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। সে মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে সেই চেনা মায়াবী জ্যোৎস্না, তবে তাতে এখন আর বিড়ম্বনা নেই, আছে এক গভীর আত্মবিশ্বাসের সমুদ্র

আমি আমতা-আমতা করে বললাম, "চিনতে পারছেন? অনেক বছর আগে একশ টাকার একটা নোট..."

আখিনুর একটু হাসল। সেই হাসিতে যেন শরতের শিউলি ফুলের গন্ধ মিশে ছিল। সে হাতের কলমটা নামিয়ে রেখে শান্ত গলায় বলল, "সেই একশ টাকাটা আমি খরচ করতে পারিনি সাহেব। ওটা আমার কাছে একটা ঋণের মতো ছিল। আপনার সেই টাকাটা আমি মাটির ব্যাংকে তুলে রেখেছিলাম।"

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সে বলে চলল, "সেই টাকাটা আর আমার পানি বিক্রির জমানো খুচরো পয়সা দিয়ে আমি প্রথম একটা বই কিনেছিলাম। তারপর আর একটা। এখন আমার এই পাঠশালায় প্রায় শ'খানেক বই। আমি এখন আর পানির তৃষ্ণার্তদের জন্য পানি বেচি না, এখন তৃষ্ণার্ত মনকে তৃপ্ত করতে অক্ষর দিই।"

সেদিন সেই ছোট মেয়েটি যে এক গ্লাস পানির বদলে একশ টাকা নিতে অস্বীকার করেছিল, সে আজ কয়েক ডজন শিশুর হাতে জ্ঞানের কলস তুলে দিচ্ছে। তার চারপাশের বাতাস এখন আর তপ্ত নয়, বরং তাতে সুগন্ধি আগরবাতির মতো এক পবিত্র সৌরভ

বিকেলের মরা রোদে যখন আমি সেখান থেকে বিদায় নিচ্ছিলাম, তখন দেখলাম একঝাঁক শিশু তার চারপাশে ঘিরে ধরেছে। তাদের কলকাকলিতে স্টেশনের জং ধরা লোহাগুলোও যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলো। আমি ট্রেনে উঠে বসলাম ঠিকই, কিন্তু এবার আর বিষাদ নিয়ে নয়। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, আখিনুর তার পাঠশালার দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে

আমার মনে হলো, সেই রূপালী চোখের মেয়েটি আজ যেন আকাশ থেকে এক মুঠো ধ্রুবতারা কুড়িয়ে এনে এই পরিত্যক্ত স্টেশনের গায়ে মেখে দিয়েছে। সে আর সেই হতদরিদ্র পানি বিক্রেতা নেই, সে এখন এক আলোর ফেরিওয়ালা। বিকেলের শান্ত আকাশ যেন তার মাথায় এক অদৃশ্য মুকুট পরিয়ে দিয়েছে, আর বাতাস ফিসফিস করে বলছে— "সম্মান তো ভিক্ষায় নয়, আত্মত্যাগের গৌরবে ফোটে।"

আখিনুরের পাঠশালাটি কেবল টিন আর কাঠের কাঠামো ছিল না, ওটি ছিল এক টুকরো জীবন্ত জাদুঘর। সেখানে বইয়ের পাতাগুলো যখন ওল্টানো হতো, তখন মনে হতো যেন কোনো বুনো পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ হচ্ছে। তবে সেই পাঠশালার ইতিহাসে একটি বিকেল ছিল একদম আলাদা, যা চিরকাল ওই চুনকাম করা দেয়ালে খোদাই হয়ে থাকবে।

একদিন এক ঝড়ের বিকেলে, যখন মেঘের গুরুগুর ডাক আর বাতাসের হাহাকারে আকাশটা যেন ছিঁড়ে পড়ছিল, তখন পাঠশালার দরজায় এসে দাঁড়াল এক বৃদ্ধ। লোকটির শরীর জরাজীর্ণ, পরনের কাপড় শতছিন্ন, আর তার চোখে ছিল এক গভীর শূন্যতা। তিনি কোনো ভিক্ষা চাইতে আসেননি, এসেছিলেন এক অদ্ভুত তৃষ্ণা নিয়ে

আখিনুর তখন বাচ্চাদের 'আলো' নিয়ে কবিতা পড়াচ্ছিল। বৃদ্ধ লোকটি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। আখিনুর খেয়াল করল, লোকটির চোখের কোণে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে পড়া থামিয়ে কাছে গিয়ে দাঁড়াল

— "দাদু, আপনি কি কিছু খুঁজছেন?" আখিনুর মোলায়েম গলায় জিজ্ঞেস করল

বৃদ্ধ কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "মা, আমি আজীবন এই স্টেশনে কুলিগিরি করেছি। হাজার হাজার মানুষের নাম আমি পিঠে করে বয়ে নিয়ে গেছি, কিন্তু নিজের নামটা কোনোদিন চোখে দেখতে পাইনি। এই যে দেয়ালে সব আঁকিবুঁকি—এদের মাঝে কি আমার নামটাও আছে?"

সেই মুহূর্তে পাঠশালার ভেতরে এক অলৌকিক স্তব্ধতা নেমে এল। আখিনুর বৃদ্ধের হাত ধরে তাকে সামনের একটি বেঞ্চে বসাল। সে এক টুকরো চক হাতে নিয়ে মেঝেতে বড় বড় অক্ষরে লিখল— 'করিম'বৃদ্ধের নাম

আখিনুর বলল, "দাদু, এই যে দেখুন, এটা আপনি। এই বর্ণগুলোর মাঝেই আপনি বেঁচে আছেন।"

বৃদ্ধ যখন সেই খসখসে আঙুল দিয়ে মেঝেতে লেখা নিজের নামের ওপর স্পর্শ করলেন, তখন এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। বাইরে বৃষ্টির তোড় কমে গিয়ে হঠাৎ এক ফালি সোনালি রোদ পাঠশালার ভেতরে এসে ঢুকল। সেই রোদে মেঝের ধুলোগুলো যেন রুপোলি প্রজাপতির মতো নাচতে শুরু করল। বৃদ্ধের চোখের পানি যখন সেই বর্ণগুলোর ওপর পড়ল, মনে হলো যেন শুকনো মরুভূমিতে প্রথম বৃষ্টির ছোঁয়া লেগেছে

তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন এবং বললেন, "মা, আজ আমার বোঝা সব হালকা হয়ে গেল। আজ আমি আর কুলি নই, আজ আমি একটা নাম!"

সেদিন কোনো বই পড়া হয়নি। সেদিন আখিনুর শিখিয়েছিল যে, অক্ষর কেবল জ্ঞান নয়, অক্ষর মানে অস্তিত্ব। সেই বিকেলে পাঠশালার প্রতিটি কোণ থেকে যেন বকুল ফুলের ঘ্রাণ আসছিল, যদিও আশেপাশে কোনো বকুল গাছ ছিল না

আখিনুরের চোখে সেদিন সেই একই রূপালী আলো চিকচিক করছিল, যা আমি দশ বছর আগে দেখেছিলাম। তবে সেদিন তা ছিল তৃষ্ণা মেটানোর আনন্দ, আর আজ তা ছিল একটি আত্মাকে মুক্তি দেওয়ার তৃপ্তি

বিকেলের শেষ রোদটুকু যখন যমুনা সেতুর ওপর এসে হেলে পড়ে, তখন যমুনার পানি থেকে এক অদ্ভুত মায়াবী বাষ্প উঠে আসে। সেই বাষ্পে মিশে থাকে হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যাকুলতা। কিন্তু আখিনুরের পাঠশালাটিতে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল।

বহু বছর পর, যখন আমার চুলে পাক ধরেছে আর স্মৃতির ঝুলিটা একটু ভারী হয়েছে, আমি শেষবারের মতো সেই স্টেশনে নামলাম। এবার আর আখিনুরকে ডাকতে হলো না; স্টেশনের দেয়ালে ঝোলানো একটি ছোট্ট সাইনবোর্ডই সব বলে দিচ্ছিল— 'আখিনুর বিদ্যাপীঠ: যেখানে তৃষ্ণা মেটে অক্ষরের সুধায়।'

আমি যখন পাঠশালার সামনে দাঁড়ালাম, দেখলাম সেই রূপালী চোখের মেয়েটি আজ এক পূর্ণিমার চাঁদের মতো স্নিগ্ধ। তার চারপাশে ভিড় করে আছে একদল কিশোর-কিশোরী, যাদের হাতে জলের কলস নয়, বরং রঙিন গল্পের বই। আখিনুর আমাকে দেখে চিনতে পারল। সে হাসল না, শুধু তার দুচোখের সেই পরিচিত রুপোলি আলো আরও একবার জ্বলে উঠল

সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে আমার হাতে মাটির পাত্রে এক গ্লাস পানি তুলে দিল। সেই পানির ভেতরে আকাশের নীল রঙ আর বিকেলের মরা রোদ মিলেমিশে একাকার। পানিটুকু পান করার পর আমার মনে হলো, জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত না-পাওয়া আর ধূসর স্মৃতিগুলো যেন নিমেষেই ধুয়ে মুছে গেল

"আপনি সেদিন আমায় একশ টাকা দিতে চেয়েছিলেন," আখিনুর খুব নিচু গলায় বলল, "আজ এই পাঠশালার প্রতিটি অক্ষর সেই একশ টাকার ঋণ শোধ করছে। দেখুন, ওরা আজ আর ভিক্ষা করে না, ওরা স্বপ্ন দেখে।"

ঠিক সেই মুহূর্তে স্টেশনে একটি ট্রেন এসে থামল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ট্রেনের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শোনা গেল না, বরং মনে হলো কোনো এক বিশাল বাদ্যযন্ত্রে এক করুণ অথচ মধুর সুর বেজে উঠল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের ফাটল দিয়ে ছোট ছোট নীল ফুল ফুটে উঠতে শুরু করেছে—যেগুলো কেবল মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঘ্রাণ পেলেই ফোটে

আমি ট্রেনের দিকে পা বাড়ালাম। আখিনুর বিদায় জানাল না, সে কেবল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ট্রেনের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম, পুরো স্টেশনটা ধীরে ধীরে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলছে। আখিনুর নামের সেই মেয়েটি আর সাধারণ কোনো মানুষ নেই; সে যেন হয়ে উঠেছে এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা, যে রেললাইনের জং ধরা সমান্তরাল পথকে এক মোহনায় মিলিয়ে দিয়েছে

ট্রেন চলতে শুরু করল। কু ঝিকঝিক শব্দের বদলে বাতাসে ভাসতে লাগল এক সুগভীর কবিতা। আমি চোখ বুজলাম। আমার স্মৃতির ক্যানভাসে তখন কেবল একটিই ছবি—একটি কালো মেয়ে, তার দুচোখে রূপালী জ্যোৎস্না, আর হাতে এক আজব কলস, যেখান থেকে পানি নয়, ঝরে পড়ছে অফুরন্ত আলো। সেই আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত মলিনতা, আর পেছনে পড়ে থাকছে এক অনন্ত শান্তি

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”
Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default