মানুষের
অস্তিত্বের গহীনে ‘আমি’ এবং ‘আমার’—এই দুই সত্তার সংঘাত চিরন্তন। আধুনিক সভ্যতায়
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ যখন স্বার্থপরতার নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়, তখন
‘নিজস্বতা’ বা ‘Selfhood’ তার মৌলিক শুদ্ধতা হারায়। স্বার্থপরতা কি মানুষের
নিজস্বতাকে গ্রাস করে নেয়, নাকি নিজস্বতার দোহাই দিয়ে মানুষ আসলে নিজের স্বার্থপরতাকেই
বৈধতা দেয়? বর্তমান প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলো—আধুনিক মানুষের কৃত্রিম
ব্যস্ততা এবং আমিত্ববোধের যে ‘আঁশটে গন্ধ’,
তা মূলত এক প্রকার আত্মিক অবক্ষয়, যা
সুগন্ধির প্রলেপে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়। স্বার্থপরতা যখন জয়ী হয়, তখন তা
নিজস্বতাকে একপ্রকার অন্ধকূপে নিক্ষেপ করে,
যেখানে মানুষের প্রকৃত সত্তা কেবল এক
যান্ত্রিক প্রতিচ্ছবিতে রূপান্তরিত হয়।
স্বার্থপরতা
ও নিজস্বতার দ্বন্দ্বে জয়-পরাজয়ের হিসাবটি অত্যন্ত জটিল। স্বার্থপরতা মূলত এক
প্রকার সংকীর্ণতা, যা মানুষকে কেবল নিজের বৃত্তে সীমাবদ্ধ রাখে। অন্যদিকে, নিজস্বতা
হলো আত্মার সেই মুক্ত প্রকাশ, যা বিশ্বজনীনতার সাথে যুক্ত হতে পারে। যখন একজন ব্যক্তি
কেবল নিজের প্রাপ্তি এবং সুবিধাকেই পরম সত্য বলে ধরে নেয়, তখন তার
‘নিজস্বতা’ বা স্বকীয়তা স্বার্থপরতার শিকলে বন্দি হয়।
এখানে
একটি নৈতিক সংঘাত প্রবল হয়ে ওঠেঃ
হাজারো সত্তার ভিড়ে অবহেলার স্বার্থপরতা
কি সত্যিই জয়ী হয়? আপাতদৃষ্টিতে
মনে হতে পারে যে, যারা কেবল নিজেকে নিয়ে মগ্ন এবং অন্যকে অবহেলা করতে
জানে, তারাই সফল। কিন্তু এই বিজয় আসলে এক প্রকার পরাজয়। কারণ, স্বার্থপরতা
মানুষকে সমাজ ও মানবিক আবেগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এই বিচ্ছিন্নতাই ‘নিজস্বতা’র
মৃত্যু ঘটায়। নিজস্বতা তখন আর কোনো মৌলিক গুণ থাকে না, বরং তা হয়ে
ওঠে স্বার্থসিদ্ধির এক নিছক হাতিয়ার।
প্রবন্ধের
মূল বিষয়বস্তুকে আরও গভীর করতে কিছু শক্তিশালী রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার
অনস্বীকার্যঃ
- আঁশটে গন্ধঃ এটি আমিত্ববোধের বা অহংকারের পচনশীলতার প্রতীক।
মাছের আঁশটে গন্ধ যেমন অস্বস্তিকর,
মানুষের উৎকট অহংকারও তেমনি
অন্যের কাছে অসহনীয়।
- সুগন্ধির অন্তরালঃ এটি মানুষের কৃত্রিমতা এবং ভণ্ডামির প্রতীক। সমাজ
ও সভ্যতার মোড়কে আমরা আমাদের ক্ষুদ্রতা এবং স্বার্থপরতাকে ঢেকে রাখতে চাই।
এটি হলো অন্তরের পচনকে বাইরের চাকচিক্য দিয়ে ঢাকার এক ব্যর্থ চেষ্টা।
- মাকড়সার জালঃ কৃত্রিম ব্যস্ততা হলো সেই জালের মতো, যা
মানুষ নিজেই নিজের চারপাশে বোনে। মাকড়সা যেমন নিজের জালে নিজেই বন্দি থাকে, আধুনিক
মানুষও তার তথাকথিত ‘ব্যস্ততা’র জালে আটকা পড়ে জীবনের বৃহত্তর অর্থ হারিয়ে
ফেলে।
- কৃত্রিম তরঙ্গঃ এটি ডিজিটাল যুগের অন্তঃসারশূন্য যোগাযোগের প্রতীক, যেখানে
আবেগ নেই, আছে কেবল তরঙ্গের যান্ত্রিক আদান-প্রদান।
বর্তমান
পুঁজিবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক সমাজে মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি হিসাবনিকাশ।
আমরা ‘নিজস্বতা’র চর্চা করি না, বরং ‘ব্র্যান্ডিং’ করি। এই আমিত্ববোধে যে একটি উৎকট
‘আঁশটে গন্ধ’ আছে, তা আধুনিক মানুষ টের পায় না অথবা পেতে চায় না। কারণ, তাদের
নাসিকা এখন কৃত্রিম সুগন্ধিতে অভ্যস্ত।
সমালোচকের
দৃষ্টিতে দেখলে, এই ‘এড়িয়ে যাওয়া’ বা ডিটাচমেন্ট (Detachment) কোনো মহৎ বৈরাগ্য নয়,
বরং এটি দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। মানুষ এখন
কৃত্রিম ব্যস্ততার জালে আটকা পড়তে ভালোবাসে,
কারণ এই জাল তাকে আয়নার মুখোমুখি হতে
দেয় না। আয়নায় নিজের প্রকৃত কদর্য রূপ দেখার চেয়ে ব্যস্ততার যান্ত্রিকতায় ডুবে
থাকা অনেক সহজ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে,
এই সমান্তরাল জালের ক্ষণিকের অংশীদার
হওয়া কি আমাদের মুক্তি দিতে পারে? উত্তরটি নেতিবাচক। এই কৃত্রিমতা আমাদের সত্তাকে আরও
বেশি খণ্ডিত করে ফেলে। স্বার্থপরতা যখন নিজস্বতাকে হারিয়ে দেয়, তখন মানুষ
আর মানুষ থাকে না, হয়ে ওঠে একটি সচল অ্যালগরিদম।
পরিশেষে
বলা যায়, স্বার্থপরতা নিজস্বতাকে কেবল হারায় না, বরং তাকে
বিকৃত করে। আমিত্ববোধের যে বিষবাষ্প আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি, তা থেকে
মুক্তির পথ একমাত্র আত্মোপলব্ধিতে। সুগন্ধির আবরণে আঁশটে গন্ধ ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা
যেমন বৃথা, তেমনি কৃত্রিম ব্যস্ততার জালে স্বার্থপরতাকে লুকিয়ে রাখা অসম্ভব।
নিজস্বতা কেবল তখনই স্বার্থপরতাকে হারিয়ে দিতে পারে, যখন তা অন্যের অস্তিত্বকে
স্বীকার করে নেয়।
একটি
শেষ চিন্তা রেখে যাওয়া প্রয়োজনঃ আমরা কি আসলেই নিজস্ব সত্তার অন্বেষণ করছি, নাকি স্বার্থপরতার
এক বিশাল মরুভূমিতে মরীচিকার পেছনে দৌড়াচ্ছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই
মাকড়সার জালের বাঁধন আলগা হতে শুরু করবে।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।