বাজারের মোড় থেকে বাড়ির দিকে যাওয়ার পথটা বড়জোর দুই মাইলের। কিন্তু জাফরের কাছে মনে হচ্ছে, সে যেন কোনো এক অন্তহীন গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে। হাতের ওষুধের প্যাকেটটা পকেটের ভেতরে খুব ভারী লাগছে—যেন এক দলা সীসা। প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে পকেটে প্লাস্টিকের খসখস শব্দ হচ্ছে, আর সেই শব্দটা জাফরের কানে বিঁধছে বিদ্রূপের মতো।
কুয়াশা এখন আর কেবল বাতাসে নেই,
তা যেন জাফরের মগজের ভেতর সেঁধিয়ে গেছে।
দুপাশে ধানখেত, মাঝখান চিরে সরু মেঠো পথ। ল্যাম্পপোস্টের আলো অনেক পেছনে
ফেলে এসেছে সে; এখন সম্বল বলতে কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ।
জাফর থামল। একটা বড় অশ্বত্থ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল।
মেঘ আর কুয়াশার আড়ালে ধ্রুবতারাটা হারিয়ে গেছে। এক সময় এই তারা দেখে সে দিক নির্ণয়
করতে পারত। স্কুলে থাকতে যখন স্কাউটিং করত,
তখন কত স্বপ্ন ছিল পাহাড় ছোঁয়ার, আকাশ জয় করার।
"স্বপ্ন..."
জাফর বিড়বিড় করল, হাসল নাকি শুধু একটি অস্ফুট শব্দ হল তা নির্ণয় করা কঠিন। যেন একটা একটা শব্দহীন, বিবর্ণ হাসি।
পনেরো বছর আগেকার সেই জাফর আর আজকের এই জাফরের মধ্যে কেবল নামটারই মিল
আছে। তখন তার চোখে ছিল আগুনের তেজ। ঢাকা শহরের নামী কর্পোরেট অফিসে যখন সে
প্রেজেন্টেশন দিত, তখন বোর্ডরুমের বড় বড় কর্তারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতেন। তার
টাইয়ের নট ছিল নিখুঁত, পারফিউমের ঘ্রাণে চারপাশ মৌ-মৌ করত। সে ছিল আগামীর উজ্জ্বল
নক্ষত্র। অথচ আজ? আজ সে কুঁজো হয়ে অন্ধকার পথে হাঁটছে, যার শরীরের
ঘ্রাণ বলতে কেবল ঘাম আর সস্তা তামাকের গন্ধ।
এক সময় সে ভাবত, মা-বাবাকে রাজপ্রাসাদে রাখবে। বাবার সেই পুরনো চশমার
ফ্রেমটা বদলে দেবে, মায়ের পায়ের ব্যথার জন্য সেরা ডাক্তার দেখাবে। আজ মা-বাবা
তার চোখের সামনেই আছেন, একই ছাদের নিচে। কিন্তু জাফর তাদের চোখের দিকে তাকাতে পারে
না। কেন পারে না?
কারণ সে মেরুদণ্ডহীন।
মাঝরাতে যখন বাবার শুকনো কাশির শব্দ দেয়াল ভেদ করে তার কানে আসে, জাফর তখন
বালিশ চেপে ধরে শুয়ে থাকে। সে জানে, এই মুহূর্তে এক কাপ আদা-চা কিংবা এক চামচ তুলসীর রস বাবার
খুব দরকার। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ে নীলার কথা। নীলা হালকা ঘুমে আছে। চুলার
শব্দ হলে কিংবা জাফরের পায়ের আওয়াজ পেলে সে জেগে যাবে। আর জেগে গেলেই শুরু হবে সেই
চেনা অভিযোগের পাহাড়— "সারাদিন তো খাটছিই, রাতেও কি শান্তিতে ঘুমাতে দেবে না? তোমার বাবা কি
একটু চেপে কাশতে পারেন না?"
এই 'অশান্তি' এড়ানোর জন্য জাফর নিজের পিতৃত্বকে বিসর্জন দিয়েছে, নিজের
মনুষ্যত্বকে বিক্রি করে দিয়েছে।
হঠাৎ সামনের ঝোপের ভেতর কী একটা নড়ে উঠল। কোনো বুনো জানোয়ার হবে হয়তো।
জাফর চমকাল না। বরং তার মনে হলো, কোনো জানোয়ার যদি আজ তাকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলত, তবে হয়তো এই
গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়া যেত।
সে আবার হাঁটতে শুরু করল। সামনেই তাদের পুরনো আমলের টিনের বাড়িটা দেখা
যাচ্ছে। জানালার ফাঁক দিয়ে একটা টিমটিমে আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে। ওটা নীলার ঘর। সে
হয়তো এখনো জেগে আছে, ওষুধের অপেক্ষায়।
বাবার ঘরের জানালার দিকে তাকাল জাফর। অন্ধকার। নিরেট অন্ধকার। সেখানে
কোনো অভিযোগ নেই, কোনো দাবি নেই। কেবল আছে এক নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।
পকেটে হাত দিয়ে ওষুধের স্ট্রিপটা আঙুল দিয়ে অনুভব করল সে। নাকে স্প্রে
করার সেই দামী ওষুধ। এই ওষুধটা নীলার বন্ধ নাক খুলে দেবে, সে শান্তিতে
ঘুমাবে। কিন্তু পাশের ঘরে যে মানুষটা সারারাত ফুসফুস ছিঁড়ে আসা কাশি চাপার চেষ্টা
করবে, তার জন্য জাফর আজ কিছুই আনতে পারেনি। তার পকেটের অবশিষ্ট টাকাটা দিয়ে
নীলার পছন্দের চকলেট কেনা হয়ে গেছে।
বাড়ির সদর দরজায় হাত দেওয়ার আগে জাফর একবার থমকে দাঁড়াল। বুক ভরে একটা
শীতল বাতাস নিল। সে জানে, এই দরজার ওপারে সে আর 'জাফর' নয়। সেখানে সে
কেবল একজন পরাজিত সৈনিক, যে নিজের ছায়ার কাছেও আজ পরবাসী।
দরজার কড়া নাড়ার আগেই ভেতর থেকে নীলার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "এতক্ষণ
লাগে আসতে? আমি কি মরে গেলে ওষুধ নিয়ে আসবে?"
জাফর কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল মাথা নিচু করে অন্ধকারের ভেতর নিজের
অস্তিত্বটুকু আরও একবার ছোট করে নিল।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।