শহরের ব্যস্ত রাজপথে যখন ধূসর সন্ধ্যা নামে, তখন আকাশটা ঠিক যেন একখণ্ড পুরোনো বিষাদ। আরিফের হাতের ল্যান্ডফোনের রিসিভারটা তখনো তপ্ত—ঠিক যেমন মানুষের শেষ নিঃশ্বাসের উষ্ণতা লেগে থাকে জীবনের অবশিষ্টাংশে। ওপাশ থেকে ভেসে আসা একঘেয়ে ডায়াল টোনটা যেন কোনো এক নিঃসঙ্গ মাঝির বৈঠার শব্দ, যা শূন্যতার নদীতে অবিরাম শব্দ করে চলেছে। কিন্তু আরিফের কানে সে শব্দ পৌঁছায় না। তার দৃষ্টি জানালার ওপারে, যেখানে অন্ধকার ডানা মেলছে এক বিশাল কালপেঁচার মতো।
ঠিক এক সপ্তাহ হলো। গত বৃহস্পতিবারের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে তার
বড় দুলাভাই পাড়ি জমিয়েছেন না-ফেরার দেশে।
নতুন এইচআর এবং অ্যাডমিন বিভাগের পদের গুরুভার, নতুন
সেটআপের ব্যস্ততা—এসবই ছিল না যাওয়ার ঠুনকো অজুহাত। কিন্তু তার বুকের গহীনে লুকানো
ছিল এক বরফশীতল মরুভূমি। যে মরুভূমিতে তার বোন হাসনাহেনা বছরের পর বছর এক ফোঁটা
ভালোবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতো বেঁচে ছিলেন। সেই সংসারে দুলাভাই ছিলেন
এক জলহীন মেঘ, যিনি কেবল ছায়া দিয়েছেন কিন্তু তৃষ্ণা মেটাননি।
হাসনাহেনা আপা টিউশনি করে, সেলাই মেশিনের ঘরঘর শব্দে নিজের কান্না লুকিয়ে, তিন
সন্তানকে মানুষ করেছেন। আজ তারা প্রতিষ্ঠিত। বাবার মৃত্যুতে তাদের চোখে জল আছে
সত্য, কিন্তু সে জল কি শোকের,
নাকি বছরের পর বছর জমে থাকা অভিযোগের
বাষ্প? সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো একমাত্র আরশের মালিক আল্লাহ্ তায়ালাই
জানেন।
আরিফ টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটার দিকে তাকাল। হঠাৎ তার মনে হলো, কাগজের
অক্ষরগুলো সব জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। সেগুলো যেন ছোট ছোট কালো পিঁপড়ে হয়ে তার চোখের
কোণে কামড়ে ধরছে। অফিসের উজ্জ্বল এলইডি আলোগুলোকে মনে হলো মৃত নক্ষত্রের চোখ। সে
এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হলো, যদি আজ দুটো ডানা থাকত! যদি সময়ের পিঠে চড়ে ফিরে
যাওয়া যেত পঁচিশ বছর আগের সেই ধূলামাখা গ্রামে।
স্মৃতির আয়নায় ধুলো সরতেই ভেসে উঠল সপ্তম শ্রেণির সেই আরিফকে। শীতের
রাত। গ্রামে মাহফিল বসেছে। চারদিকে ধুনুরিদের তুলো ধোনার মতো কুয়াশা। দুলাভাই
হাসিমুখে এসে তার হাত ধরলেন।
“আরিফ, তোর কী
পছন্দ বল তো?”—দুলাভাইয়ের সেই কণ্ঠস্বর যেন শরবতের মতো মিষ্টি শোনাল।
পকেট থেকে বের করে দিলেন পাঁচশ টাকার একটি নোট। সেই টাকা আজ তার কাছে কোটি টাকার
চেয়েও দামি। সেই টাকা দিয়ে সে এয়ারগান দিয়ে রঙিন বেলুন ফাটিয়েছিল—ঠিক যেমন মানুষের
স্বপ্নগুলো মাঝেমধ্যে সশব্দে ফেটে যায়। মেলা থেকে কিনেছিল একটি লাল নলখাগড়ার বাঁশি, যার সুর
ছিল বাতাসের কান্নার মতো। আরও কিনেছিল গরম জিলাপি আর চিনির তৈরি এক সাদা ঘোড়া—যে
ঘোড়ায় চড়ে সে কল্পনায় সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে যেত।
মাহফিলের ভিড়ে দুলাভাই তার হাতটা এমনভাবে ধরে রেখেছিলেন, যেন সে
কোনো অমূল্য রত্ন। ভিড়ের চাপে হারানো যাওয়ার ভয় ছিল না, ছিল এক
নিরাপদ আশ্রয়ের সুবাস। দুলাভাই কানে ফিসফিস করে বলেছিলেন, “আরিফ, তুই অনেক
বড় হবি। আমার মতো অকর্মা হোস না কোনোদিন।”
সেদিন সেই মানুষটার চোখের মণিকোঠায় যে অকৃত্রিম মায়া ছিল, তা কি তবে
মিথ্যা ছিল? নাকি মানুষ একই সাথে পুষ্প আর কণ্টক দুই-ই হতে পারে? বোনের ওপর
করা অবিচারের পাহাড় ডিঙিয়ে আরিফ সেদিন যে দেয়াল তুলেছিল, সেই দেয়াল
আজ তার সামনে এক হিমালয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুলাভাইও সেই দূরত্ব মেনে নিয়েছিলেন, সম্ভবত
অনুশোচনার বিষ তার আত্মাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল বলেই।
আরিফের চোখ থেকে এক ফোঁটা নোনা জল ঝরে পড়ল টেবিলের কাঠের ওপর। কাঠটা
যেন তৃষ্ণার্তের মতো সেই জল শুষে নিল,
রেখে গেল এক গাঢ় ক্ষতচিহ্ন। সে আজ
কোনো শোক করছে না, বরং এক অদৃশ্য অপরাধবোধের আগুনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই
মানুষটির শেষ মুখখানা একবার দেখার সুযোগ সে নিজেই নিজের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে।
হঠাৎ তার মনে হলো, এই কক্ষের দেয়ালগুলো যেন কথা বলছে। আলমারি থেকে ভেসে
আসছে পুরনো স্মৃতির ঘ্রাণ। হাসনাহেনা আপা হয়তো আজ মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন, কিংবা পাথর
হয়ে বসে আছেন জায়নামাজে। ভাগ্নে-ভাগ্নিরা হয়তো নতুন করে জীবন সাজানোর নকশা আঁকছে।
কিন্তু আরিফ? সে যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, যার
চারপাশে অনুতাপের উত্তাল সমুদ্র।
আরিফ উঠে দাঁড়াল। তার কাঁধের ওপর যেন আস্ত এক পাহাড়ের ওজন চেপে
বসেছে। সে আজ এক ডানাভাঙা পাখির মতো,
যার আকাশ আছে কিন্তু ওড়ার অধিকার নেই।
জানালার বাইরে অন্ধকার এখন আরও নিবিড়,
আরও রহস্যময়। সেই অন্ধকারে সে দেখতে
পেল, তার শৈশবের সেই চিনির ঘোড়াটি যেন একা একা আকাশের দিকে ছুটে চলেছে, আর তার
পিঠে চড়ে বসে আছে একাকীত্বের প্রেতাত্মা।
জীবনের রুটিন তাকে ডাকছে। কাল সকালে আবার সেই ফাইলের স্তূপ, সেই এইচআর
বিভাগের কঠিন সিদ্ধান্ত। কিন্তু তার হৃদয়ের এই যে নীল পদ্মটি আজ ফুটেছে—যার
প্রতিটি পাপড়ি অনুশোচনার রঙে রাঙানো—তা কোনোদিনও ঝরবে না।
আরিফ বুঝল, ক্ষমা চাওয়ার চেয়েও বড় শাস্তি হলো, ক্ষমা
চাওয়ার মানুষটিকে আর খুঁজে না পাওয়া। রাতের নিস্তব্ধতায় সে শুধু বিড়বিড় করে বলল, “আল্লাহ্, তাকে ক্ষমা
করে দিও, আর আমাকেও।”
বাইরে তখন বাতাসের দীর্ঘশ্বাস বইছে, আর শহরের নিয়ন আলোগুলো যেন দূর
থেকে হাসছে—এক বিদ্রূপের হাসি।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।