নীল ফুলের দীর্ঘশ্বাস

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

 

নীল ফুলের দীর্ঘশ্বাস

মানুষের নিঃসঙ্গতা আসলে কোনো জনশূন্য মরুভূমি নয়, বরং এক জনাকীর্ণ উৎসবের মাঝেও নিজেকে আয়নার ওপাশে খুঁজে পাওয়ার হাহাকার। তোমার দেওয়া এই গভীর জীবনবোধের প্লটটিকে আমি শব্দের তুলিতে একটি ম্যাজিক রিয়েলিস্টিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি।

এসো, সেই অদ্ভুত নিঃসঙ্গতার নগরে ঘুরে আসি।

শব্দের ছায়া ও নীল ফুলের দীর্ঘশ্বাস

শহরের আকাশে যখন বিকেল নামে, তখন নীল রঙের বিষণ্ণতা বৃষ্টির মতো ঝরতে থাকে। কিন্তু সেই বৃষ্টিতে কেউ ভেজে না, কেবল নীল রঙের সেই জলকণাগুলো মানুষের পিঠের ওপর ছোট ছোট নীল অপরাজিতা হয়ে ফুটে ওঠে। অয়ন আর নীলার ড্রয়িংরুমে আজ তেমনই হাজার হাজার নীল ফুল ফুটে আছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, তারা কেউই সেই ফুলের ভার অনুভব করতে পারছে না।

অয়ন সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে, আর নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে সূর্যাস্তের শেষ রক্তিম আভা কীভাবে মেঘের সাথে সন্ধি করছে। অয়ন একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, "চা হবে?"

শব্দটা ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। কিন্তু সেই শব্দের পেছনে থাকা অয়নের বুকের ভেতরের ধুলোবালিগুলো নীলার কানে পৌঁছাল না। নীলা চায়ের কাপ হাতে যখন অয়নের সামনে দাঁড়াল, তখন তার হাতের আঙুল থেকে ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে স্মৃতির শিউলি ফুল। অয়ন দেখল না, সে শুধু কাপের ধোঁয়া দেখল।

মানুষের মাঝে যখন বোঝাপড়ার সেতু ভেঙে যায়, তখন তাদের কথাগুলো প্রজাপতি হয়ে উড়ে যেতে গিয়ে কাঁচের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মরে পড়ে থাকে। অয়ন আর নীলার মাঝে এখন তেমনই এক কাঁচের পাহাড় জমেছে। তারা কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু সেই শব্দগুলো হৃদয়ের গভীরে শিকড় গজাতে পারছে না।

নীলার খুব ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে বলতে, "দেখো, আমার বাম পাঁজরের নিচে এক সমুদ্র নোনা জল জমেছে, তুমি কি একটু তার স্বাদ নেবে?" কিন্তু তার বদলে সে কেবল বলল, "চিনি ঠিক আছে তো?"

আসলে মানুষের রাগগুলো যখন অভিমান হয়ে জমে, তখন তা ঘরের কোণে কুয়াশার মতো সাদা মেঘ হয়ে ভাসতে থাকে। অয়ন সেই মেঘের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেল, অথচ তার গায়ে এক ফোঁটা জল লাগল না। সে বুঝল না যে, নীলার চোখের কোণে যে মেঘ জমেছে, তা আসলে এক ভাঙা মনের মানচিত্র।

গল্পের এই পর্যায়ে এসে দেখা যায়, অয়ন যখন নীলার হাত ধরল, তখন নীলার হাতটা ধীরে ধীরে কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে যেতে শুরু করল। অয়ন ধরল ঠিকই, কিন্তু কোনো উষ্ণতা পেল না। কারণ অনুভব ছাড়া স্পর্শ কেবলই জড় পদার্থের ঘর্ষণ। অয়ন প্রশ্ন করল, "কী হয়েছে?"

নীলা হাসল। সেই হাসিটা ছিল শীতের সকালের রোদের মতো—উজ্জ্বল কিন্তু উত্তাপহীন। সে জানে, অয়ন প্রশ্ন করেছে শব্দ দিয়ে, হৃদয় দিয়ে নয়।

রাত বাড়লে এই ঘরে বিচ্ছেদগুলো জোনাকির মতো জ্বলতে থাকে। অয়ন আর নীলা একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে আছে, অথচ তাদের মাঝখানের দূরত্বটা যেন কয়েক আলোকবর্ষের। নীলা দেখল, অয়নের নিঃশ্বাসগুলো বাতাসের সাথে মিশে এক একটা পাথরের নুড়ি হয়ে মেঝের ওপর খসে পড়ছে। সে কুড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু আঙুল ছোঁয়াতেই সেগুলো ধুলো হয়ে গেল।

অবুঝ মানুষের সাথে থাকা আর একাকীত্বের মাঝে কোনো তফাত নেই। মানুষ আসলে তর্কে হারে না, মানুষ হেরে যায় যখন তার চোখের জল অন্য কারও কাছে কেবল নোনা জল মনে হয়, কোনো অনুভূতি নয়।

চাঁদটা যখন জানালার গ্রাস দিয়ে ভেতরে তাকাল, তখন দেখা গেল ঘরে কেউ নেই। শুধু দুটো ছায়া পড়ে আছে। তারা একে অপরের হাত ধরে আছে ঠিকই, কিন্তু সেই ছায়ার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই। কারণ, মানুষ তো কেবল কথায় বাঁচে না, মানুষ বাঁচে একে অপরের নৈশব্দ্য পড়ার দক্ষতায়।

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”
Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default