অস্তিত্বের হিমঘর । উপন্যাস। পর্বঃ ৬ যন্ত্র হয়ে ওঠার যন্ত্রণা

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

 

অস্তিত্বের হিমঘর

বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে জাফর যখন নিজের বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তখন দূর থেকে ট্রেনের হুইসেলের একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। সেই শব্দটা যেন তাকে এক ঝটকায় কয়েক বছর পেছনে নিয়ে আছড়ে ফেলল

সেই সময়টা ছিল জাফরের কর্পোরেট ক্যারিয়ারের মধ্যগগন। সে তখন এক বিশাল যন্ত্রের অপরিহার্য পার্টস। প্রতিদিন সকাল আটটায় টাইয়ের গিঁট শক্ত করে সে যখন বের হতো, তখন নিজেকে মনে হতো এক অপরাজেয় গ্ল্যাডিয়েটর। কিন্তু সেই চাকচিক্যের আড়ালে যে কখন তার ভেতরটা কুরে কুরে খেতে শুরু করেছিল 'টার্গেট' আর 'ডেডলাইন' নামক বিষাক্ত পোকাগুলো, তা সে টেরই পায়নি

সেদিন অফিসের এসি রুমের ভেতরেও জাফরের কপালে ঘাম জমছিল। বড় প্রজেক্টের প্রেজেন্টেশন। সিইও সামনে বসা। জাফরের ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্লাইডগুলো নাচছিল, কিন্তু তার মাথার ভেতরে তখন অন্য এক যন্ত্রণা—'যন্ত্র হয়ে ওঠার যন্ত্রণা'

"জাফর, ইউ আর লসিং ইওর গ্রিপ," সিইওর ঠান্ডা গলাটা সেদিন বরফের মতো বিঁধেছিল। "আমাদের রেজাল্ট চাই, তোমার ফ্যামিলি ক্রাইসিস শোনার সময় আমাদের নেই।"

সেই সকালেই জাফর খবর পেয়েছিল মায়ের মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে। সে ছুটি চেয়েছিল। কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছিল একরাশ কাজের বোঝা। সেই দিনই জাফর প্রথম বুঝতে পেরেছিল, এই কর্পোরেট দুনিয়ায় সে কোনো মানুষ নয়; সে কেবল একটা কোড, একটা আউটপুট মেশিন। যদি সে কাজ করতে না পারে, তবে তাকে 'রিপ্লেস' করে দেওয়া হবে—পুরনো ব্যাটারির মতো

সেদিন রাতে যখন সে বাড়ি ফিরল, নীলা ডাইনিং টেবিলে বসে ক্যাটালগ দেখছিল। নতুন ফ্ল্যাটের ইন্টেরিয়র ডিজাইন

জাফর বিধ্বস্ত গলায় বলেছিল, "নীলা, মা অসুস্থ। আমি ভাবছি কয়েকদিন গ্রামে গিয়ে থাকব। চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে কনসালটেন্সি শুরু করলে কেমন হয়?"

নীলা এক মুহূর্ত দেরি করেনি। তার চোখমুখ শক্ত হয়ে গিয়েছিল। "পাগল হলে নাকি? এই পজিশন, এই স্ট্যাটাস ছেড়ে তুমি গ্রামে গিয়ে কি চাষাবাদ করবে? আমার কি কোনো স্ট্যান্ডার্ড নেই? মা অসুস্থ হয়েছে, নার্স রাখো। কিন্তু ক্যারিয়ার নষ্ট করার কথা চিন্তা করো না।"

সেই রাতেই জাফরের ভেতরে এক ধরণের 'প্রসববেদনা' শুরু হয়েছিল। সে অনুভব করেছিল, তার ভেতরের স্বাধীন সত্তাটা মারা যাচ্ছে আর জন্ম নিচ্ছে এক মেরুদণ্ডহীন যান্ত্রিক সত্তা। যে কেবল নির্দেশ পালন করবে, টাকা জোগাবে এবং সবকিছুর বিনিময়ে ঘরে 'শান্তি' কিনে আনবে

সেই থেকে জাফর আর প্রতিবাদ করেনি। সে হয়ে উঠল এক 'ইয়েস ম্যান'অফিসে বসের কাছে, আর বাড়িতে নীলার কাছে। তার মেধা, তার সৃজনশীলতা সব যেন ফুরিয়ে যেতে লাগল। সে কেবল একটা রুটিন মেনে চলতে লাগল—সকালে বের হওয়া, গাধার খাটুনি খাটা, মাসের শেষে স্যালারি শিটটা নীলার হাতে তুলে দেওয়া

জাফরের মনে পড়ল সেই সন্ধ্যার কথা, যেদিন সে প্রথম বুঝতে পেরেছিল সে আসলে 'ছাপোষা' হয়ে গেছে। একটা দামী রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে তার কার্ডটা যখন ডিক্লাইন করল আর নীলা যখন তাকে জনসমক্ষে অপমান করল, সেদিন জাফরের কান্না পায়নি; বরং এক ধরণের অদ্ভুত অসাড়তা গ্রাস করেছিল

আজ সেই অন্ধকারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে জাফরের মনে হচ্ছে, সেই যন্ত্রের প্রসববেদনাটা আজও শেষ হয়নি। সে আজও জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন গ্লানির। আজ সে তার বাবার অসুস্থতাকে অবজ্ঞা করে স্ত্রীর সর্দি সারানোর যন্ত্র হিসেবে কাজ করছে

নিজের হাতের তালু দুটোর দিকে তাকাল জাফর। হারিকেনের অস্পষ্ট আলোয় মনে হচ্ছে এগুলো কোনো মানুষের হাত নয়, বরং মরিচা ধরা লোহার দুটি দাঁত। যা কেবল কামড়ে ধরতে জানে, কিন্তু স্পর্শ করতে ভুলে গেছে

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”
Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default