শহরের কংক্রিটের পাঁজরগুলো যখন আরিফের আত্মার ওপর চেপে বসে, তখন তার
মনে হয় সে কোনো এক মৃত সভ্যতার নকশা আঁকছে। জ্যামিতিক রেখার প্রতিটি টানে নিহিত
থাকে এক পঞ্জীভূত হাহাকার। ইট-পাথরের এই জঙ্গল তার ভেতরের রুহানিয়াতের বাগানটিকে
মরুভূমি করে দিচ্ছিল। আরিফ একজন স্থপতি,
কিন্তু তার নিজের ভেতরের ঘরটি তখন
ভাঙাচোরা। এক অদ্ভুত শূন্যতা—যেন কোনো এক অতল গহ্বর তাকে দিনরাত ডাকছে। এই শূন্যতা
কোনো জাগতিক অপ্রাপ্তি নয়; এ যেন মাটির পুতুলের ভেতরে আটকে পড়া এক বিরহী আত্মার
ছটফটানি।
ধুলোবালির এই দোজখ থেকে মুক্তি পেতে সে ফিরে গেল শেকড়ে। গ্রামে।
যেখানে মাটি কথা বলে, যেখানে বাতাস দরুদ পাঠ করে।
সেদিন রাতটি ছিল কোনো এক সুফি কবির রচিত আধ্যাত্মিক কাব্যের মতো।
ছাদের ওপর আরিফ যখন একা বসে ছিল, আকাশ থেকে ঝরে পড়ছিল গলিত রুপালি নূর। জোছনা কেবল আলো
নয়, যেন এক স্বর্গীয় প্রলেপ। আকাশের তারাগুলো মনে হচ্ছিল আরশ-আজিমের
চারপাশ ঘিরে থাকা ফেরেশতাদের চোখের পলক। ঝিরঝিরে বাতাস যখন তার ললাট ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আরিফের মনে
হলো প্রকৃতি যেন তার কানের কাছে ফিসফিস করে ‘মা’রিফাতের’ কোনো এক গুঢ় রহস্য পাঠ
করছে।
গোধূলির ম্লান আভা তখন চাঁদের শুভ্রতায় বিলীন হয়ে গেছে। আলো আর
অন্ধকারের এই সন্ধিক্ষণে আরিফের হৃদয়ে এক সূক্ষ্ম কম্পন শুরু হলো। সে অনুভব করল, এই বিশাল
মহাবিশ্বের তুলনায় তার অস্তিত্ব একটি বালুকণার চেয়েও নগণ্য। অথচ, এই নগণ্য
বালুকণাকেই স্রষ্টা ভালোবেসেছেন, দিয়েছেন রুহ-এর তাজাল্লি।
হঠাৎ করেই এক বিষণ্নতা তার বুকে পাথরের মতো জেঁকে বসল। পুরনো কোনো
ক্ষত, কোনো এক অপ্রাপ্তির দহন তাকে অস্থির করে তুলল। তার মনে হলো, সে যেন এক
গভীর অন্ধকার কূপে পতিত। কিন্তু পরক্ষণেই,
এক অলৌকিক সুবাসে চারপাশ আমোদিত হয়ে
উঠল। বাড়ির পাশের কামিনী গাছটি থেকে ঝরে পড়া ফুলের সেই ঘ্রাণ যেন জান্নাতের
সুসংবাদ নিয়ে এল। বাতাসে ভাসমান সেই ঘ্রাণ তাকে মনে করিয়ে দিল—সূর্যের বিদায় মানেই
ধ্বংস নয়, বরং তা চাঁদের আগমনের পথ প্রশস্ত করা। আঁধারের এই আবরণের অন্তরালেই
তো স্রষ্টার অসীম সুখানুভূতি আর রহমত লুকিয়ে আছে।
“হে
ক্বলব, তুমি কেন অস্থির হও? যে মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে, সে-ই তো মরুভূমিতে প্রাণের ফুল
ফোটায়।”
আরিফের চেতনার দরজায় তখন করাঘাত করছিল ইমাম গাজ্জালির সেই গূঢ়
সত্য—মানুষের নফস ততক্ষণ পর্যন্ত তৃপ্ত হয় না, যতক্ষণ না সে তার আসলের সাথে
মিলিত হয়। তার ভেতরের ‘আরিফ’ (মারেফাত সন্ধানী) তখন ছটফট করছে। সে বুঝতে পারল, তার জীবনের
প্রতিটি অপূর্ণতা, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আসলে স্রষ্টার রহমতের দরিয়ায়
একবিন্দু পানি মাত্র। সেই দরিয়ায় আজ সে ডুবে যেতে চায়।
সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার অহংকারের মিনারগুলো ভেঙে
গুঁড়িয়ে গেল। ছাদের সেই শীতল মেঝেতেই সে তার শির নত করল সেজদায়।
এই সেজদা কোনো সাধারণ শারীরিক কসরত ছিল না। এটি ছিল ‘ফানা’-র প্রথম
সোপান। কপাল যখন মাটির স্পর্শ পেল,
তখন আরিফের মনে হলো সে সরাসরি আরশের
নিচে সিজদাবনত। তার চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু যখন মেঝেতে স্পর্শ করল, মনে হলো
সেই নোনা পানিরধারা এক একটি নূরের নদী হয়ে মহাবিশ্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সে অনুভব করল
আহলে বায়তের সেই ত্যাগের মহিমা, যেখানে কারবালার তপ্ত বালুতেও প্রেমের সেজদা পরিত্যক্ত
হয়নি।
সেই নির্জন রাতে, মহাকালের স্তব্ধতায় কেবল আরিফ আর তার মালিক। মাঝখানে
কোনো পর্দা নেই, কোনো মধ্যস্থতা নেই। তার নফস তখন শান্ত, রুহ তখন
নৃত্যরত। জীবনের সব জটিলতা, সব না-পাওয়া যেন মধুর শরাবে পরিণত হলো। মৌনতা যেন
হাজারো তসবিহ পাঠের চেয়েও মুখর হয়ে উঠল।
আরিফ যখন সেজদা থেকে মাথা তুলল, সে তখন আর সেই অবসাদগ্রস্ত
স্থপতি নয়। সে এখন এক আধ্যাত্মিক কারিগর। সে বুঝতে পারল, দুনিয়ার
কংক্রিটের চেয়েও জরুরি হলো হৃদয়ের ক্বাবাকে আবাদ করা। সেই রাতে কামিনী ফুলের সুবাস
আর চাঁদের আলোর লুকোচুরি তাকে এক পরম সত্য শিখিয়ে দিয়ে গেল—প্রকৃত ভালোবাসা কোনো
রক্ত-মাংসের মানুষের জন্য নয়, বরং তা হলো সেই অনাদি-অনন্ত নূরের প্রতি এক অন্তহীন টান।
আকাশের চাঁদের হাসিতে তখন যেন ‘ইশকে ইলাহির’ প্রতিধ্বনি। আরিফ এক পরম প্রশান্তি নিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার শূন্যতা পূর্ণ হয়ে গেছে। সে এখন আর একা নয়। সে এখন নিখিল বিশ্বের সাথে একাত্ম।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।