ইসলামিক

ইসলামিক

সাহিত্য

সাহিত্য

আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক

কর্পোরেট

কর্পোরেট

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ

বইপত্র

বইপত্র

সম্পাদকের পছন্দ

এই সপ্তাহের সেরা

সর্বশেষ লেখা

8
ফেরা

ফেরা

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬1 মন্তব্য
নফসের দহন শেষে রবের নূরের দিকে এক মুসাফিরের ফিরে আসার গল্প 'ফেরা'। ইশকে ইলাহী ও অনুতপ্ত অশ্রুতে ফানা হওয়ার এক জাদুকরী আধ্যাত্মিক আখ্যান।

বাতাস আজ বড় ভারী। চারপাশের জগতের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন কোনো এক আদিম শোকের মাতম চলছে পুরো কায়েনাত জুড়ে। গাছের পাতার মর্মর ধ্বনিতে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মন খারাপ করা বিষণ্ণতা। বিস্তীর্ণ, রুক্ষ মরুভূমির বুকে হঠাৎ এক চিলতে মেঘের দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে। রোদের কান্না গলে গলে পড়ছে তপ্ত বালুকণায়, আর সেই উত্তাপে পুড়ছে একজন মুসাফির। মুসাফির হাঁটছে। তার পা চলছে না, তবু সে হাঁটছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে শুকনো বালুর উপর যেন অদেখা রক্তের দাগ ফুটে উঠছে। এ শুধু কোনো সাধারণ পথ হারানো নয়, এ যেন এক অনন্ত বিচ্ছেদ। নফসের তাড়নায়, এক মুহূর্তের গাফলাত বা অমনোযোগিতা তাকে তার রবের সান্নিধ্য থেকে যোজন যোজন দূরে ছিটকে ফেলেছে।

আকাশের রং আজ নীল নয়, এক অদ্ভুত ছাইরঙা চাদরে ঢাকা। যেন আসমান তার দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মুসাফিরের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। এ এক এমন শূন্যতা, যা পৃথিবীর কোনো সম্পদ, কোনো কোলাহল, কোনো মায়া দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। ঠিক যেন আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.)-এর সেই পরম বিচ্ছেদের মুহূর্তটি। জান্নাতের সেই পবিত্র বৃক্ষের ফল ভক্ষণের পর যখন তাদের শরীর থেকে নূরের পোশাক খসে পড়েছিল, তখন তারা এক অবর্ণনীয় লজ্জায় নিজেদের আবৃত করার চেষ্টা করেছিলেন। আজ এই মুসাফিরও নিজের নগ্ন আত্মাকে দুনিয়ার ঠুনকো আচ্ছাদন দিয়ে ঢাকার বৃথা চেষ্টা করছে। কিন্তু রুহানিয়াতের এই নগ্নতা কি দুনিয়াবি কোনো বস্তুতে ঢাকা পড়ে?

অপরাধবোধের ভারে তার ছায়াটি পর্যন্ত যেন শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চাইছে। মাটি যেন তার ভার সইতে পারছে অমর্যাদায়। নীরবতারও যে একটা ভয়ংকর শব্দ আছে, তা মুসাফির আজ প্রতিটি ইন্দ্রীয় দিয়ে অনুভব করছে। এই নীরবতার শব্দ তাকে অবিরাম তিরস্কার করছে। তার মনে পড়ছে, কীভাবে একটিমাত্র ভুল পদক্ষেপ মানুষকে তার রবের করুণা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। শয়তান যেমন নিজের অহংকারের কারণে চিরতরে অভিশপ্ত হয়েছিল, তেমনি মানুষও যখন নফসের দাসত্ব করে, তখন সে এক অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়। কিন্তু মুসাফির শয়তান নয়। তার ভেতরে আছে অনুশোচনার আগুন, যে আগুন তাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। সে তৃষ্ণার্ত, কিন্তু তার এই তৃষ্ণা কোনো সাধারণ পানির নয়। এ তৃষ্ণা হলো এক ফোঁটা রহমতের, এক বিন্দু ক্ষমার।

রাত গভীর হয়। মরুভূমির হিমশীতল বাতাস মুসাফিরের শুধুই হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে না, কাঁপাচ্ছে তার আত্মাকে। তার মনের ভেতর এক ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। নফস (প্রবৃত্তি), কালব (হৃদয়) এবং রুহ (আত্মা)—এই তিনের সংঘাত তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। ইমাম গাজ্জালির (রহ.) মনস্তাত্ত্বিক দর্শনে বলা হয়েছে, মানুষের কালব হলো এক ইলাহী আয়না, যেখানে আল্লাহর মারেফাতের নূর প্রতিফলিত হয়। কিন্তু যখন মানুষ পাপ করে, তখন সেই আয়নায় মরিচা পড়ে। মুসাফির তার নিজের ভেতরের সেই আয়নার দিকে তাকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সেখানে শুধুই নিকষ কালো অন্ধকার।

রুহ, যা সরাসরি আল্লাহর আদেশে সৃষ্টি এবং পরম পবিত্র, তা আজ নফসে আম্মারার (পশু প্রবৃত্তি) কারাগারে বন্দি। রুহ চায় তার রবের কাছে ফিরে যেতে, ঊর্ধ্বজগতের সেই পবিত্রতায় বিলীন হতে। কিন্তু নফস তাকে টেনে নামাচ্ছে পৃথিবীর কাদার দিকে। মুসাফির বুঝতে পারছে, যতক্ষণ না সে তার নফসকে পরাস্ত করতে পারবে, ততক্ষণ তার কালবের আয়নায় কোনো তাজাল্লি পড়বে না।

কালবের এই সূক্ষ্ম অবস্থাসমূহ মানুষের ভেতরের মহাজাগতিক রূপান্তরকে স্পষ্ট করে তোলে। যখন নফসে আম্মারা বা পশু প্রবৃত্তি মানুষকে গ্রাস করে, তখন কালবের আয়না হয়ে পড়ে পঙ্কিল; অহংকার আর দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন থাকে আত্মা। এরপর আসে অনুশোচনার স্তর, নফসে লাউয়ামা, যেখানে কালব হয়ে ওঠে ঝড়ে কাঁপা এক প্রদীপের মতো। সেখানে থাকে দহন আর রবের দিকে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুল হাহাকার। আর এই দহন শেষে যখন নফসে মুতমাইন্না বা প্রশান্ত আত্মার উদয় হয়, তখন কালবের আয়নায় ঠিকরে পড়ে নূরের ঝিলিক; ফানা আর ইশকে ইলাহীর এক পরম প্রশান্তিতে ভরে যায় অস্তিত্ব।

মুসাফির এখন নফসে লাউয়ামার স্তরে দাঁড়িয়ে জ্বলছে। তার চারপাশের প্রকৃতিও যেন তার এই দহনে অংশ নিচ্ছে। পাহাড়ের পাথুরে গায়ে জমে থাকা শিশিরগুলো যেন তার হয়ে কাঁদছে। সে আকাশের দিকে তাকায়। তার মনে হয়, আসমানের প্রতিটি তারা যেন এক একটি চোখ, যা তার অপরাধের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে জানে, সত্যিকারের তাওবা মানে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়। ইমাম গাজ্জালির (রহ.) 'কিমিয়ায়ে সা'আদাত' (সৌভাগ্যের পরশপাথর)-এর শিক্ষা অনুযায়ী, তাওবার তিনটি শর্ত রয়েছে: অতীত পাপের জন্য গভীর অনুশোচনা, বর্তমানে পাপটি সম্পূর্ণ বর্জন করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প। এই তিনটি স্তর পার না হলে কালবের মরিচা দূর হয় না। মুসাফিরের হৃদয় আজ অনুশোচনায় খণ্ড-বিখণ্ড। সে আকাশের দিকে হাত তুলতে গিয়েও লজ্জায় নামিয়ে নেয়। "হে আমার রব, আমাকে আমার নিজের হাতে ছেড়ে দিও না, চোখের পলক ফেলার চেয়েও কম সময়ের জন্য নয়"—এই আকুতি তার হৃদয় নিংড়ে বেরিয়ে আসতে চায়, কিন্তু গলা ধরে আসে।

জোসনার হাসি আজ বড় ম্লান। চাঁদের আলোয় মরুভূমির বালুকাস্তূপগুলোকে মনে হচ্ছে যেন এক একটি নীরব সমাধি। মুসাফির হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে একটি শুষ্ক বালিয়াড়ির ওপর পড়ে যায়। তার মানসপটে ভেসে ওঠে মাওলানা রুমির (রহ.) সেই আধ্যাত্মিক ইশকের কথা। রুমি তাঁর 'মসনবি'তে বলেছেন, দুনিয়ার এই জীবন এক গভীর ঘুম ছাড়া আর কিছু নয়। মানুষ অন্যের মৃতদেহের জন্য কাঁদে, কিন্তু নিজের মৃত আত্মার জন্য এক ফোঁটা অশ্রুও ফেলে না। আলেপ্পোর এক কবির গল্পে রুমি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে মানুষ আশুরার দিনে অন্যের জন্য মাতম করে, কিন্তু নিজের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা, রবের পরিচয় ভুলে থাকা আত্মার জন্য কোনো শোক করে না। মুসাফিরের আজ নিজের সেই মৃতপ্রায় আত্মার জন্য বুক ফেটে কান্না আসছে।

হঠাৎ তার চোখের সামনে যেন ভেসে ওঠে কারবালার সেই প্রখর রোদে পোড়া প্রান্তর। আহলুল বাইতের (রাসূলের পরিবার) সেই সীমাহীন ত্যাগ, ধৈর্য আর ইশকে ইলাহীর এক অলৌকিক দৃষ্টান্ত। সাইয়্যিদুনা ইমাম হুসাইন (রা.) নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন রবের সন্তুষ্টির জন্য। সেখানে প্রচণ্ড তৃষ্ণা ছিল, ঝরে পড়া রক্ত ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল ফানার (অস্তিত্ব বিলীন) এক চূড়ান্ত তাজাল্লি। নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করার নামই তো আসল ইসলাম।

মুসাফির বুঝতে পারে, তার নিজের ভেতরেও এক অদৃশ্য কারবালা চলছে। তার নফস হলো সেই ভেতরের ইয়াজিদ, যে তার রুহকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে, তাকে মারেফাতের পানি থেকে বঞ্চিত করে তৃষ্ণার্ত মেরে ফেলতে চাইছে। এই ভেতরের ইয়াজিদকে পরাজিত না করা পর্যন্ত সত্যিকারের প্রেম বা ইশক অধরাই থেকে যাবে। প্রেমের পথ তো মসৃণ নয়। এ পথে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়। নিজের আমিত্বকে, নিজের 'আমি' নামক অহংকারকে জবাই করতে হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার দাবি তো শুধু মুখে বলা নয়, বরং নিজের প্রবৃত্তিকে তাঁর সুন্নাহ এবং আল্লাহর হুকুমের কাছে হাসিমুখে সমর্পণ করা।

তার শুকনো ঠোঁট কেঁপে ওঠে। তার মনে হয়, সে যদি আজ এক ফোঁটা সত্যিকারের অনুতপ্ত অশ্রু ফেলতে পারে, তবে হয়তো সেই অশ্রু কারবালার তপ্ত বালুতে পড়া শহীদদের রক্তের মতো দামি হয়ে উঠবে পরম করুণাময়ের কাছে। আহলুল বাইত শিখিয়েছেন কীভাবে চরম বিপদেও রবের শুকরিয়া আদায় করতে হয়, কীভাবে মাথা নত না করে নিজের সত্তাকে আল্লাহর প্রেমে সঁপে দিতে হয়। মুসাফিরের দীর্ঘশ্বাসে যেন মরুভূমির শুকনো হাওয়াতেও এক অদ্ভুত সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে, তার এই দহন বৃথা নয়। এই দহন হলো সেই আগুন, যা তার ভেতরের সমস্ত খাদ পুড়িয়ে তাকে খাঁটি সোনায় পরিণত করবে।

রাতের শেষ প্রহর ঘনিয়ে আসছে। তাহাজ্জুদের সময়। চারদিক এক অপার্থিব, মহাজাগতিক নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। এই সেই পবিত্র সময়, যখন পরম করুণাময় প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং ডাক দিয়ে বলেন, "কে আছো ক্ষমাপ্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব?"। মুসাফিরের আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই। তার দুই হাঁটু বালুর ওপর লুটিয়ে পড়ে। সে সিজদায় অবনত হয়। এই সিজদা কোনো সাধারণ সিজদা নয়। এ হলো নিজের অহংকার, নিজের পাপ, নিজের আমিত্ব এবং নিজের অস্তিত্বকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত সিজদা।

তার হৃদয় থেকে দুনিয়ার সমস্ত পর্দা একে একে সরে যেতে থাকে। সে অনুভব করে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, আর কোনো আশ্রয় নেই। সে নিজের প্রতি চরম অবিচার করেছে। ঠিক সেই আদি পিতা-মাতার মতো। তার বুক ফেটে এক গভীর কান্না বেরিয়ে আসে। কণ্ঠ চিরে উচ্চারিত হয় পবিত্র কুরআনের সেই চিরন্তন, হৃদয়স্পর্শী ফরিয়াদ, যা হাজার হাজার বছর আগে জান্নাতচ্যুত এক পিতার কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল:

"রাব্বানা যালামনা আনফুসানা, ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়াতারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।" (হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি করুণা না করো, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।)।

শব্দগুলো উচ্চারণ করার সাথে সাথে এক অদ্ভুত, অলৌকিক ঘটনা ঘটতে শুরু করে। এক অপূর্ব আবেশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো প্রকৃতিতে। মুসাফিরের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অনুতপ্ত অশ্রুবিন্দুগুলো যখন শুকনো বালুতে পড়তে থাকে, তখন তা আর সাধারণ নোনা পানি থাকে না। প্রতিটি অশ্রুবিন্দু এক একটি নূরের কণায় পরিণত হয়। সেই নূরের কণাগুলো বালুর বুক চিরে হঠাৎ এক স্ফটিক স্বচ্ছ, নূরানী ঝরনা হয়ে বয়ে যেতে শুরু করে। এই ঝরনার পানিতে কোনো কোলাহল নেই, কোনো পার্থিব শব্দ নেই, আছে কেবল এক ইশক ইলাহীর প্রশান্তির সুর।

তার বুক চিরে বেরিয়ে আসা প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস যখন বাতাসে মেশে, তখন সেই শুকনো, প্রাণহীন মরুভূমির বুকে অবিশ্বাস্যভাবে ফুটে ওঠে সাদা বিশ্বাসের ফুল। যে বাতাস এতক্ষণ ভারী আর গুমোট ছিল, তা এখন জান্নাতের সুবাস নিয়ে বইতে শুরু করে। রবের ক্ষমার তাজাল্লি যখন কালবের আয়নায় এসে পড়ে, তখন সমস্ত অন্ধকার নিমেষেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। ইমাম গাজ্জালির (রহ.) ভাষায়, এটিই হলো হৃদয়ের আসল রসায়ন, যা মানুষের ভেতরের পঙ্কিলতাকে পরম আলোয় রূপান্তরিত করে। মুসাফিরের আত্মায় এখন ফানার পূর্ণতা। সে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে রবের অস্তিত্বে একাকার হয়ে যাওয়ার এক স্বর্গীয় স্বাদ পাচ্ছে। তার আর কোনো চাওয়া নেই, কোনো ভয় নেই। সে এখন কেবলই এক সমর্পিত সত্তা।

ভোরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে দূর কোনো জনপদ থেকে। "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।" ধ্বনিগুলো যেন বাতাসের ডানায় ভর করে মুসাফিরের প্রতিটি স্নায়ুতে, প্রতিটি রক্তকণিকায় স্পন্দিত হচ্ছে। আকাশের সেই ছাইরঙা, বিষণ্ণ চাদর সরে গিয়ে পূর্ব দিগন্তে এখন এক অপূর্ব সুবহে সাদেকের আলো ফুটে উঠেছে। সেই আলোতে মিশে আছে এক গভীর মায়া, এক অনন্ত ক্ষমার আশ্বাস।

মুসাফির সিজদা থেকে মাথা তোলে। তার মুখমণ্ডলে এখন আর কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো অপরাধবোধের কালো ছায়া। সেখানে শুধুই নূরের আভা। তার চোখ দুটি এখনো সিক্ত, কিন্তু সেই অশ্রুতে আর কোনো হাহাকার নেই। আছে এক পরম প্রাপ্তির তৃপ্তি। সে বুঝতে পেরেছে, তাওবা শুধু একটি ক্ষমাপ্রার্থনা নয়, তাওবা হলো রবের কোলে ফিরে আসা, নিজের হারানো পরিচয়কে ফিরে পাওয়া। গুনাহ মানুষকে দূরে ঠেলে দেয় ঠিকই, কিন্তু সত্যিকারের তাওবা মানুষকে রবের এত কাছাকাছি নিয়ে যায়, যা গুনাহ না করলে হয়তো কোনোদিন সম্ভব হতো না। রুমি যেমন বলেছিলেন, ক্ষতের ভেতর দিয়েই আলো মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে। আজ মুসাফিরের সেই ক্ষতই তার জন্য মারেফাতের দরজা খুলে দিয়েছে।

মরুভূমির বাতাস এখন বড় শান্ত। গাছের পাতার মর্মরে এখন আর কোনো বিষণ্ণতা নেই, আছে কেবল নিঃশব্দ জিকিরের সুর। প্রতিটি পাতা, প্রতিটি বালুকণা যেন তার সাথে একাত্ম হয়ে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছে। মুসাফির ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার সামনের পথ এখন আর ধূসর বা লক্ষ্যহীন নয়, মারেফাতের স্নিগ্ধ আলোয় তা উদ্ভাসিত। সে আবার হাঁটতে শুরু করে। তবে এবার সে আর একা নয়, তার সাথে আছে তার রবের অফুরন্ত রহমত আর ইশকে ইলাহীর অটুট বন্ধন।

 যে রব এত দয়ালু, যাঁর রহমতের কোনো সীমা নেই, তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে এই সুবিশাল কায়েনাতে? স্তব্ধতায় ডুবে যায় চারপাশ, শুধু কালবের গহিনে অনুরণিত হতে থাকে চিরন্তন সেই নূরানী আহ্বান।
শেয়ার করুন: f W t ➤ in

মন্তব্যসমূহ