অস্তিত্বের হিমঘর । উপন্যাস। পর্বঃ ৪ ঘোমটার আড়ালে শেকল

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

 

অস্তিত্বের হিমঘর

দরজাটা খুলতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এল। ঘরোয়া স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ আর ওষুধের কটু গন্ধের মিশ্রণ। নীলা বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে, হাতে মোবাইল ফোন। জাফরের প্রবেশের শব্দে সে মুখ তুলল না, কেবল ভ্রু জোড়া কুঁচকে ঘড়ির দিকে তাকাল

"এত দেরি হলো? তুমি কি হেঁটে দিল্লি গিয়েছিলে?" নীলার কণ্ঠস্বরে চাবুকের মতো একটা ধার

জাফর কোনো কথা বলল না। সে পকেট থেকে নেসাল স্প্রে আর ওষুধের প্যাকেটটা ধীরলয়ে টেবিলের ওপর রাখল। আলনা থেকে গামছাটা নিয়ে সে যখন ঘাড়ের ঘাম আর কুয়াশার পানি মুছছিল, তার মনে পড়ল বিয়ের প্রথম মাসগুলোর কথা। লম্বা ঘোমটা পরে নীলা যখন এই ঘরে প্রথম পা রেখেছিল, তখন ঘরটা আলোয় ভরে গিয়েছিল। কিন্তু সেই আলো যে খুব দ্রুত দাবদাহে রূপ নেবে, জাফর তা বুঝতে পারেনি

বিয়ের প্রথম বছরটা ছিল মানিয়ে নেওয়ার অভিনয়। জাফর তখনো চাকরিতে দাপুটে। মাস শেষে হাতে মোটা অংকের টাকা আসত। নীলার শখগুলো পূরণ করা ছিল তখন এক ধরণের আনন্দ। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো যখন জাফরের বাবা অবসর নিলেন এবং মা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলেন

"তোমার মা-বাবাকে কি এখানেই থাকতে হবে?" নীলা একদিন চা খেতে খেতে খুব নির্লিপ্তভাবে প্রশ্নটি করেছিল

জাফর থমকে গিয়েছিল। "এখানে থাকবে না তো কোথায় থাকবে? আমার কাছেই তো থাকবে।"

"কিন্তু জাফর, আমাদের একটা প্রাইভেসি আছে না? তাছাড়া তোমার মায়ের ওই খসখসে কাশি শুনলে আমার মাথার রগ দপদপ করে। শহরের ফ্ল্যাটে এভাবে তিন জেনারেশন একসাথে থাকা যায় না।"

সেদিন জাফর প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু সেই প্রতিবাদ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নীলা জানত কীভাবে জাফরের দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে হয়। কয়েকদিন কথা বন্ধ রাখা, খাবার টেবিলে মুখ ভার করে বসে থাকা, আর মাঝেমধ্যে "আমি বাপের বাড়ি চলে যাব" বলে কান্নাকাটি করা—এগুলো ছিল নীলার অমোঘ অস্ত্র

জাফর ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, সে এক অদৃশ্য শেকলে আটকা পড়েছে। যে শেকলের এক প্রান্তে তার জন্মদাতা পিতা-মাতা, আর অন্য প্রান্তে তার ভালোবাসার নারী। নীলার ঘোমটা পরা মুখটি জাফরের কাছে তখন আর সোহাগের চিহ্ন রইল না; ওটা যেন হয়ে উঠল এক রক্তক্ষয়ী সীমান্তের রেখা। নীলা প্রতি পদক্ষেপে বুঝিয়ে দিত, এই সংসারে তার আধিপত্য সবার উপরে

এক রাতে নীলা আলমারি খুলে জাফরের জমানো কিছু টাকা নিয়ে আবদার ধরল একটা দামী নেকলেসের

জাফর মৃদু স্বরে বলেছিল, "বাবাকে কাল হার্ট স্পেশালিস্ট দেখানোর কথা রয়েছে নীলা। টাকাটা সেখানে লাগবে।"

নীলা এক মুহূর্তও ভাবেনি। জবাব দিয়েছিল, "তোমার বাবার তো বয়স হয়েছে, টুকটাক অসুখ থাকবেই। আমার কি কোনো সাধ-আহ্লাদ নেই? ওই হার্ট স্পেশালিস্টের সিরিয়াল পরের মাসে দিলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।"

জাফর সেদিনও হেরে গিয়েছিল। বাবার অসুস্থতাকে পাশ কাটিয়ে সে স্ত্রীকে গয়না কিনে দিয়েছিল। সেই রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নীলা যখন গয়না পরে খুশি মনে নিজেকে দেখছিল, জাফর তখন পাশের ঘরে গিয়ে দেখেছিল তার বাবা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে শূন্য চোখে চেয়ে আছেন। বাবার সেই দৃষ্টি জাফরকে যেন ধিক্কার দিচ্ছিল

আজকের এই শীতের রাতে, স্প্রেটা হাতে নিতে নিতে নীলা বিড়বিড় করে বলল, "যাক, সারা রাত তো অন্তত নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাবে। তোমার বাবার ঘরটা ঠিকমতো বন্ধ করে দিয়ে এসো, কাশির আওয়াজ যেন আমার ঘরে না আসে।"

জাফর গামছাটা কাঁধে নিয়ে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, নীলা শুধু শেকলই পরায়নি, সে জাফরের হৃৎপিণ্ডটাকেও এক হিমশীতল পাথর বানিয়ে ফেলেছে। সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে বাবার ঘরের দিকে পা বাড়াল

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”
Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default