সেই রাতে আকাশের বুক চিরে রূপালি জোছনা নয়, বরং ঝরছিল সাদা সাদা হাসনাহেনার দীর্ঘশ্বাস। আমিনা যখন তার বাসর ঘরে পা রাখল, তখন ঘরের দেয়ালগুলো থেকে চুইয়ে পড়ছিল পুরনো স্মৃতির ঘ্রাণ। তার স্বামী, যার নাম গ্রামের মানুষ শুধু এক দীর্ঘশ্বাসের সাথে উচ্চারণ করে, সে ঘরে ছিল না। কিন্তু পালঙ্কটি সাজানো ছিল এক অদ্ভুত রত্নে। সেটি কোনো কাঠ বা লোহায় তৈরি নয়; সেটি তৈরি হয়েছিল আমিনার জীবনের সমস্ত জমিয়ে রাখা দুঃখ দিয়ে।
আমিনার বাসর রাতের সেই পালঙ্কটি ছিল নীল রঙের এক কঠিন বরফখণ্ড।
সেখানে বসতেই তার শরীরের তাপে বরফ গলতে শুরু করল না, বরং চারপাশ থেকে ফুটে উঠতে
শুরু করল হাজারো নীল কলি। লোকে যাকে দুঃখ বলে, আমিনা তাকেই তার রাজপ্রাসাদ
বানিয়ে নিয়েছে।
গ্রামের মানুষ বলে, আমিনার দুই পায়ে যে রুপোর মল বাজে, ওগুলো আসলে
শিকল। শাসনের বেড়ি। কিন্তু আমিনা যখন হাঁটে,
সেই মলের শব্দে বাতাসের গায়ে ঘায়ের
মতো দাগ পড়ে না, বরং ঝরঝর করে ঝরে পড়ে শ্বেতশুভ্র বকুল। তার দুই পায়ে
সমাজের বেঁধে দেওয়া সেই অদৃশ্য বেড়িগুলো আজ অলঙ্কার হয়ে গেছে। সে জানে, এই
পৃথিবীতে নিয়ম আর শাসনের দেয়ালগুলো কত শক্ত,
কিন্তু তার হৃদয়ের স্পন্দন তার চেয়েও
তীব্র।
শহরের প্রান্তে সাতটি নদী আছে। লোকে বলে, ওই নদীতে
নামলে মানুষের সব পাপ ধুয়ে যায়। কিন্তু আমিনা যেদিন সেই নদীতে হাত ছোঁয়াল, নদীর জল
কালো হয়ে গেল। সাত নদীর সব কলঙ্ক যেন আমিনার গলার হার হয়ে ঝুলে রইল। লোকে তাকে
নিন্দা করে, কুৎসা রটায়। কিন্তু সেই নিন্দার প্রতিটি শব্দ আমিনার কাছে এক একটি
প্রেমের উপহার। সে যখন আয়নায় দাঁড়ায়,
নিজের চোখের নিচের কালি দেখে সে হাসে।
সে কালি তো কেবল রাতের ঘুমহীনতা নয়,
ওটা তার হৃদয়ের সব না-বলা কথাদের
কাজল। সেই কাজলে সে এঁকে নেয় তার নিজস্ব এক আকাশ।
আমিনার বুকের ভেতরে একটা প্রদীপ জ্বলে। সেটি কোনো তেলের প্রদীপ নয়, সেটি হলো 'মরমের আগুন'। বাইরে যখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ে, মেঘেরা যখন
গুমরে গুমরে কাঁদে, তখন আমিনার বুকের সেই আগুন আরও দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে ওঠে।
সেই আগুনের তাপে ঘরের কোণে জমে থাকা একাকীত্বগুলো ছোট ছোট পাখির মতো ডানা ঝাপটায়।
সে একা। ভীষণ একা। দিবস যায়,
রাত্রি আসে, কিন্তু তার
নিসঙ্গতা যেন এক বিশাল বটবৃক্ষের মতো ডালপালা মেলতে থাকে। এই একাকীত্বেরও এক
নিজস্ব সুবাস আছে। যখন সে জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকায়, সে দেখতে
পায় চাঁদের হাসি আজ বড় করুণ। চাঁদ যেন আকাশের বুকে এক টুকরো ফাটা আয়না, যেখানে
শুধু ভাঙা স্বপ্নের প্রতিফলন দেখা যায়।
সুখের সাথে ঘর করা আমিনার আর হলো না। সুখ পাখিটা তার বারান্দায়
এসেছিল একবার, কিন্তু আমিনার বুকের ভেতরে যে কাঁটাটা গেঁথে আছে, তার
তীক্ষ্ণতায় ভয় পেয়ে সে উড়ে গেছে গোধূলির ওপারে। আমিনা সেই কাঁটাটাকে উপড়ে ফেলতে
চায়নি কোনোদিন। কেন চাইবে? এই কাঁটাটাই তো তাকে মনে করিয়ে দেয় যে সে বেঁচে আছে। এই
রক্তক্ষরণই তো তার অস্তিত্বের প্রমাণ।
তার কপালের লিখন আজ আর কেবল কাগজ-কলমের আঁচড় নয়। সেই ভাগ্যলিপি এখন
এক দীর্ঘ রেশমি কাপড়ের মতো তার সারা অঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সেই কাপড়টা পরলে তার শীত
লাগে না, আবার খুব একটা ওমও পাওয়া যায় না। ওটা একটা অদ্ভুত আবরণ, যা তাকে এই
চেনা পৃথিবীর মানুষগুলোর থেকে আলাদা করে রাখে।
সে যখন উঠোনে গিয়ে দাঁড়ায়,
তার পায়ের ছাপ থেকে রক্তাভ গোলাপ ফুটে
ওঠে। প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে দেখে, কিন্তু কেউ বুঝতে পারে না—একটি ফুল ফোটাতে কতটা দহনের
প্রয়োজন হয়। আমিনা হাসে। তার সেই হাসিতে ভোরের শিশিররা মুক্তোর মতো ঝরে পড়ে।
গল্পের শেষে দেখা যায়,
আমিনা সেই দুঃখের পালঙ্কে শুয়ে আছে।
তার চারপাশটা এখন এক গহীন অরণ্য। যেখানে শুধু নিন্দার গান গাওয়া পাখি আর স্মৃতির
লতাপাতা। সে চোখ বোজে। তার চোখের পাতা থেকে টুপ করে এক ফোঁটা জল পড়ে মেঝেতে। আর
সাথে সাথেই সেখানে জন্ম নেয় এক বিশাল পদ্ম। সেই পদ্মের পাপড়িতে লেখা আছে এক গোপন
কথা: "যার কেউ নেই,
তার জন্য খোদার আরশ সব সময়
খোলা।"
ধীরে ধীরে সারা ঘরটা এক অপার্থিব শান্তিতে ভরে যায়। আমিনা আর আলাদা
কেউ নয়, সে নিজেই এখন একটা কবিতা,
যা মহাকালের খাতায় কেউ একজন গভীর মমতা
দিয়ে লিখে রেখেছেন


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।