নীলার ঘর থেকে বেরিয়ে জাফর যখন বারান্দায় পা রাখল, চারপাশটা যেন
হঠাৎ করেই অনেক বেশি শান্ত হয়ে গেল। এই নিস্তব্ধতা আরামদায়ক নয়, বরং একটা ভারি
পাথরের মতো বুকের ওপর চেপে বসে। কাঠের পুরোনো দরজাটা ঠেলে সে বাবার ঘরে ঢুকল।
ঘরটা হিমঘরের মতো ঠাণ্ডা। এক কোণে একটা ম্লান হারিকেন জ্বলছে, যার আলো
দেয়ালের প্লাস্টার খসা কোণগুলোকে আরও বিভীষিকাময় করে তুলেছে। পুরাতন খাটের উপর জীর্ণ
একখানা লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন তার বাবা। মানুষটা যেন দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছেন, লেপের তলায়
তাঁর অস্তিত্বটুকু কেবল এক দলা হাড়ের সমষ্টির মতো দেখাচ্ছে।
জাফর সাবধানে খাটের এক কোণে বসল। কাঠের পালঙ্কটা ককিয়ে উঠল এক
যন্ত্রণাকাতর সুরে। বাবা নড়ে উঠলেন। লেপের ভেতর থেকে একটা শীর্ণ হাত বেরিয়ে এল, কাঁপছে। জাফর
দেখল বাবার চোখ দুটো খোলা। অন্ধকারে সেই চোখের মণি দুটো হিরের মতো চকচক করছে—শুকনো
অশ্রু না কি কোনো গভীর অভিমান, জাফর বুঝতে পারল না।
"বাবা, জেগে আছো?" জাফর
খুব নিচু গলায় ডাকল।
বাবা একটা শুকনো ঢোক গিললেন। তাঁর গলা দিয়ে একটা ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরোল, যেন ভাঙা
টিনের ওপর কেউ পাথর ঘষছে। "হুম। ওষুধ পাইছস? নীলার কি সর্দি কমছে?"
জাফরের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যে মানুষটা নিজে একটু আগে বুক ফেটে
আসা কাশি চাপার চেষ্টা করছিল, তার প্রথম প্রশ্নটাই হলো সেই মেয়েটিকে নিয়ে যে কি না তাকে
এই বাড়িতে এক আপদ মনে করে।
"হুম, দিয়া
আসলাম।" জাফরের কণ্ঠস্বর বুজে এল। "তোমার শরীর কেমন বাবা?"
বাবা হঠাৎ হেসে ফেললেন। সেই হাসিতে কোনো শব্দ নেই, কেবল বুকটা
হাপরের মতো ওঠানামা করছে। "আমার শরীর দিয়া কী করবি বাজান? শরীর তো আছে
কেবল মাটি হওয়ার অপেক্ষায়। তুই বড় ক্লান্ত রে জাফর। তোর চোখের তলায় কালি জমছে। যা, শুইয়া পড়
গিয়া।"
ঠিক তখনই বাবার শরীরের ভেতর থেকে একটা কাশি উথলে উঠল। বাবা প্রাণপণ
চেষ্টা করলেন সেটা চেপে রাখতে। মুখটা নীল হয়ে উঠল, গলার রগগুলো ফুলে রশির মতো হয়ে
গেল। লেপের কোণা দিয়ে মুখ চেপে ধরলেন তিনি,
পাছে পাশের ঘরে নীলার ঘুম ভেঙে যায়, পাছে জাফরকে
কোনো কৈফিয়ত দিতে হয়।
প্রতিটি কাশির শব্দ জাফরের কানে চাবুকের মতো বাজতে লাগল। এই তো সেই
মানুষ, যিনি এক সময় জাফরকে কাঁধে নিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাতেন। যাঁর হাতের
আঙুল ধরে জাফর প্রথম হাঁটতে শিখেছিল। আজ সেই মানুষটা একটা সামান্য কাশির সিরাপের
জন্য অপেক্ষা করছেন না, তিনি অপেক্ষা করছেন তাঁর ছেলের একটু মমতার জন্য। অথচ জাফর
আজ পকেটে করে নিয়ে এসেছে বিলাসিতার স্প্রে।
"বাবা, আমি কাল সকালে
বাজারে গিয়া তোমার সিরাপটা নিয়া আসব। আজ টাকাটা একটু কম আছিল তো..."
জাফর কথা শেষ করতে পারল না। মিথ্যা বলতে গিয়ে তার জিহ্বা যেন জড়িয়ে
যাচ্ছিল।
বাবা হাত বাড়িয়ে জাফরের হাতে একটা চাপ দিলেন। সেই স্পর্শে কোনো অভিযোগ
ছিল না, ছিল কেবল এক অসীম ক্ষমা। "লাগব না রে বাজান। তুলসী পাতা চিবাইলে
ঠিক হয়া যাইব। তুই শুধু পাশে একটু বস।"
জাফর বসে রইল। দেয়ালের টিকটিকিটার শব্দ আর বাবার অনিয়মিত নিঃশ্বাসের
শব্দ মিলে এক অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করল। হারিকেনের তেল ফুরিয়ে আসছে, শিখাটা
লাফাচ্ছে। জাফর বুঝতে পারল, এই ঘরে যে প্রতিধ্বনি হচ্ছে, তা কেবল বাবার কাশির নয়—তা হলো
তার নিজের ব্যর্থতার, তার মেরুদণ্ডহীনতার এক নিঃশব্দ হাহাকার।
বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। জানালার শিক দিয়ে সেই হিম হাওয়া ভেতরে ঢুকছে। জাফর বাবার গায়ের লেপটা ভালো করে টেনে দিল, কিন্তু সে জানে, এই সামান্য কাপড় দিয়ে সেই শীতকে আটকানো সম্ভব নয় যা তাদের সম্পর্কের মাঝখানে বরফ হয়ে জমে আছে।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।