বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
পৃথিবীর ইতিহাস বড়ই অদ্ভুত। যুগে যুগে মানুষ তার ক্ষুদ্র ক্ষমতা আর জাগতিক দম্ভ দিয়ে চিরন্তন সত্যের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছে। সম্প্রতি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বা অন্যান্য স্থানে মসজিদ থেকে আজানের মাইক বা লাউডস্পিকার খুলে নেওয়ার যে দৃশ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা কেবল একটি যান্ত্রিক বিধিনিষেধ নয়; এটি মূলত একটি সুগভীর কাঠামোগত বৈষম্য এবং মুমিনের আত্মপরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত ও এক গভির ষড়যন্ত্র। ইসলামি চিন্তাবিদ ও বিশ্লেষক গণের মতে এই ঘটনাটিকে শুধু নীরব বেদনার দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই, বরং এর পেছনের অন্যায়কে চিহ্নিত করা এবং এর প্রত্যক্ষ ও দার্শনিক প্রতিবাদ করা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।
শব্দদূষণের অজুহাত বনাম কাঠামোগত ইসলামোফোবিয়া
আজানকে যখন ‘শব্দদূষণ’ বা ‘বিরক্তি’র কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করে মাইক কেড়ে নেওয়া হয়, তখন আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় হঠকারিতা ও দ্বিচারিতা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে কলকারখানার বিকট শব্দ, যানবাহনের কানফাটানো হর্ন, রাজনৈতিক মিছিলের স্লোগান কিংবা গভীর রাত পর্যন্ত চলা উৎসবের বাদ্যযন্ত্রকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া হয়।
এমনকি একই সমাজব্যবস্থায় আমরা প্রতিনিয়ত দেখি, অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়ে, বিশেষ করে হিন্দুদের মন্দিরগুলোতে যখন উচ্চস্বরে লাউডস্পিকার বাজে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ঢোল, তবলা, কাঁসর ও ঘণ্টার শব্দে উৎসব পালিত হয়, তখন সেগুলোকে কখনোই ‘শব্দদূষণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। প্রশাসন বা সমাজ সেগুলোকে সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে।
অথচ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য যখন মিনারের চূড়া থেকে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেওয়া হয়, তখনই তা কিছু মানুষের কানে বিষাদ হয়ে বাজে, বাতিলের ভীত কেঁপে যায়। এই স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, তাদের মূল আপত্তি ‘শব্দ’ নিয়ে নয়, তাদের মূল আপত্তি আজানের অন্তর্নিহিত ‘বাণী’ নিয়ে, যে আহ্বানে যে সুরে মিশে আছে তাদের পতনের প্রচ্ছায়া। আজানকে স্তব্ধ করার এই আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ মূলত মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকারকে পদদলিত করার এক সুগভীর ষড়যন্ত্র এবং কাঠামোগত ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতিরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এ ধরনের জালিমদের উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন:
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن مَّنَعَ مَسَاجِدَ اللَّهِ أَن يُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ وَسَعَىٰ فِي خَرَابِهَا ۚ أُولَٰئِكَ مَا كَانَ لَهُمْ أَن يَدْخُلُوهَا إِلَّا خَائِفِينَ ۚ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ"তার চেয়ে বড় জালেম আর কে, যে আল্লাহর মসজিদসমূহে তাঁর নাম স্মরণ করতে বাধা দেয় এবং সেগুলো ধ্বংস করতে সচেষ্ট হয়? অথচ ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থা ছাড়া তাদের ওসব মসজিদে প্রবেশ করা উচিত ছিল না। তাদের জন্য দুনিয়ায় রয়েছে লাঞ্ছনা আর আখেরাতে রয়েছে মহাশাস্তি।"— (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াতঃ ১১৪)
মসজিদ থেকে আজানের আওয়াজকে স্তব্ধ করার এই অপচেষ্টা মূলত আল্লাহর ঘরকে তার প্রাণবন্ততা থেকে বঞ্চিত করারই এক আধুনিক ষড়যন্ত্র। আমরা এই হীন ষড়যন্ত্র ও প্রশাসনিক অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানাই।
কারবালার দর্শনঃ সত্যের কণ্ঠরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা
ইতিহাস সাক্ষী, সত্যকে স্তব্ধ করার এই চেষ্টা নতুন কিছু নয়। কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ ভেবেছিল, ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করার মাধ্যমে সে ইসলামের মূল সুরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তার হাতে রাষ্ট্র ছিল, ক্ষমতা ছিল, প্রশাসন ছিল।
কিন্তু কারবালার বন্দিদশা থেকে ফিরে যখন ইব্রাহিম ইবনে তালহা ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)-কে উপহাস করে প্রশ্ন করেছিল, "কারবালায় কার জয় হলো?" তখন ইমাম এক চিরন্তন দর্শনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, "যখন নামাজের সময় হবে, তখন আজান ও ইকামাত দিয়ে দেখো, কার জয় হয়েছে।"
ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) বুঝিয়ে দিলেন, ক্ষমতা বা বাহুবল দিয়ে সাময়িক বিজয় লাভ করা যায় বা সাময়িকভাবে কাউকে দমিয়ে রাখা যায়, কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় তো তাঁর, যাঁর নাম প্রতিদিন পাঁচবার মিনার থেকে উচ্চারিত হয়। ইয়াজিদের রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। আজানের ধ্বনিতে "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ"—এই ঘোষণা আজও লক্ষ কোটি বার উচ্চারিত হচ্ছে। এই ঘোষণাই প্রমাণ করে, সত্য চিরঞ্জীব।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই সত্যটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন:
يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ"তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে (সত্য দ্বীনকে) নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ তাঁর নূরকে পরিপূর্ণ করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।"— (সূরা আস-সাফ, আয়াতঃ ৮)
প্রতিবাদের ভাষা এবং আমাদের আত্মদর্শন
ইসলাম আমাদের অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে শেখায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করে, তা সম্ভব না হলে মুখ দিয়ে (প্রতিবাদ করে), আর তা-ও সম্ভব না হলে অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে।" (সহিহ মুসলিম)। তাই আইনি, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিটি উপায়ে আমাদের আজানের অধিকার আদায়ের জন্য আওয়াজ তুলতে হবে।
তবে, এই প্রতিবাদের পাশাপাশি আমাদের একটি গভীর আত্মদর্শনেরও প্রয়োজন আছে। আমরা মাইকের অধিকারের জন্য লড়বো ঠিকই, কিন্তু আমাদের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে আজানের মূল উদ্দেশ্য যেন আমাদের জীবনে বাস্তবায়িত হয়। প্রতিদিন আজানে বলা হয়— "হায়্যা আলাস সালাহ" (এসো শান্তির দিকে), "হায়্যা আলাল ফালাহ" (এসো কল্যাণের দিকে)। মাইক খুলে নেওয়ার প্রতিবাদ আমরা তখনই সফলভাবে করতে পারবো, যখন ওই নিঃশব্দ মিনারের মসজিদগুলোও আমাদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাবে। শান্তির সুবাতাস বয়ে যায়, কল্যানের সুমধুর কলতান সৃষ্টি হয়।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, মসজিদ থেকে মাইক নামিয়ে ফেলার এই অন্যায় দৃশ্য আমাদের ক্ষুব্ধ করে ঠিকই, তবে তা আমাদের হতাশ করে না। এটি আমাদের জন্য এক নবজাগরণের ডাক। প্রশাসন হয়তো জোর করে মাইক কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু মুমিনের ঈমানি স্পৃহা কেড়ে নেওয়ার কোনো আইন আজও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি।
আসুন, আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার পাশাপাশি নিজেরাই একেকটি জীবন্ত আজান হয়ে যাই। আমাদের চরিত্র, আমাদের সততা, আমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা এবং আমাদের ইবাদত—এগুলোই হোক সমাজের বুকে সবচেয়ে উচ্চকিত আজান। যখন আমাদের আদর্শ ও চরিত্র দেখে মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য বুঝতে পারবে, তখন পৃথিবীর কোনো স্বৈরাচারী শক্তিই আর সত্যের এই আলো নিভিয়ে দিতে পারবে না।
আল্লাহ আমাদের সেই ঈমানি শক্তি দান করুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সাহস দিন এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।