রহমতের পরশ

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

রহমতের পরশ

শহরের বুক চিরে শেষ রাতের যে নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তা কোনো সাধারণ নীরবতা নয়। তা যেন এক মায়াবী আয়না, যার সামনে দাঁড়ালে মানুষের রূপক মুখাওয়াশগুলো খুলে পড়ে আর বুকের ভেতরের আসল মানুষটা জেগে ওঠে।

আহসান ঘরের জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। বুকের ভেতরটা এক অনামুখী পাথরের ভারে চেপে আছে। দিনশেষে চারপাশের মানুষগুলো যখন একে একে ঘুমে তলিয়ে গেল, তখন তার ভেতরের একাকীত্বটা হঠাৎ দ্বিগুণ শব্দে গর্জে উঠল। সারাদিন দুনিয়ার নানা হিসেব মেলানো, দায়িত্বের ভার বহন করা আর সবার সামনে হাসিমুখ ধরে রাখার পর, এই নিঝুম রাতে এসে তার মনে হচ্ছিল—সে যেন এক ধূ ধূ মরুভূমির মাঝে পথ হারানো পথিক।

হঠাৎ জানালা দিয়ে এক পশলা স্নিগ্ধ, ঠাণ্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ল। সেই বাতাসে ভেসে এল রাতের ফোটা কামিনী আর হাসনাহেনার তীব্র, আকুল সুবাস।

আহসান ধীরপায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের দৃশ্যটা দেখে মুহূর্তের জন্য তার নিঃশ্বাস আটকে এল।

আকাশজুড়ে আজ নক্ষত্রদের এক অদ্ভুত মেলা বসেছে। অনাবিল চাঁদের আলো চাদরের মতো ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ধরণীতে। মাথার ওপর মেঘ আর চাঁদের মাঝে চলছে এক মায়াবী লুকোচুরি খেলা। এক টুকরো ধবধবে সাদা মেঘ এসে হঠাৎ চাঁদটাকে ঢেকে দিচ্ছে, আর চারপাশটা এক মুহূর্তের জন্য আধো-আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই সেই আঁধার ভেদ করে আরও দ্বিগুণ দ্যুতিতে বেরিয়ে আসছে রূপালী জোছনা। নিচে বাগানের ঝোপঝাড়ে ছোট ছোট জোনাকিরা দল বেঁধে আলো জ্বালিয়ে মিটমিট করছে—যেন তারা নৈশব্দের মাঝে গোপন কোনো ভালোবাসার কথা রূপান্তর করছে আলোকের ভাষায়।

আহসান এতদিন জেনে এসেছে আঁধার মানেই ভয়, আঁধার মানেই রূপক কোনো পতন। কিন্তু আজ রাতের এই শান্ত আঁধার তাকে ভয় দেখাল না, বরং তার বিষণ্ণ হৃদয়ে এক পরম শান্তির প্রলেপ দিল।

গাছের পাতার ঝিরিঝিরি শব্দ আর কামিনীর সুবাসের মাঝে দাঁড়িয়ে আহসানের মনে হলো—যে মালিক এই বিশাল নীল আকাশ বানিয়েছেন, যিনি আঁধারের অন্তরালে এমন নিখাদ সুখ লুকিয়ে রেখেছেন, যিনি ছোট্ট জোনাকির বুকে আলো জ্বেলেছেন—তিনি কি তার এই বুকের হাহাকারটুকু জানেন না?

হুট করেই আহসানের চোখের কোণ ভিজে উঠল। সে বুঝতে পারল, দুনিয়ার ভিড়ে হাজারটা মান মানুষের আশ্রয় খুঁজে সে ক্লান্ত হয়েছে, অথচ আসল আশ্রয় তো চিরকাল তার খুব কাছেই অপেক্ষা করছিল। সে যতবার ভেবেছে সে একা, ততবার পরম পিতা কেবল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছেন তার ফিরে আসার।

বুকের ভেতর ব্যাকুলতার এক বিশাল নদী জেগে উঠল। আহসান আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না। বারান্দার শান্ত এক কোণে জায়নামাজটা বিছিয়ে দিল।

অন্ধকার ঘরের মাঝে যখন সে হাত তুলে দাঁড়িয়ে বলল, "আল্লাহু আকবার", তখন যেন দুনিয়ার সমস্ত জটিল সমীকরণ, অসংলগ্ন হিসেব আর বিরহ এক নিমেষে উবে গেল। আর যখন সে সেজদায় মাথা নত করল, কপালটা মাটির সাথে ঠেকতেই বুকের ভেতরে জমে থাকা বছরের পর বছর চেপে রাখা যন্ত্রণাগুলো এক বাঁধভাঙা নদীর মতো চোখের জল হয়ে ঝরে পড়তে লাগল।

সে সেজদায় নিথর হয়ে পড়ে রইল। মুখে কোনো শব্দ নেই, কোনো গুছিয়ে বলা প্রার্থনা নেই। কেবল চোখের প্রতিটি ফোঁটা জল আর হৃদয়ের তীব্র আকুতি দিয়ে সে তার রবের কাছে নিজের সমস্ত নিঃস্বতা সঁপে দিল। সে অনুভব করল—মানুষ হয়তো ভাঙা মন নিয়ে কথা বলতে পারে না, কিন্তু যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিথর হৃদয়ের প্রতিধ্বনিও স্পষ্ট শুনতে পান। সেজদার সেই পরম গভীরে তার মনে হলো, এক অসীম রহমত আর ভালোবাসার নদী যেন তার আত্মাকে ধুয়ে-মুছে পবিত্র করে দিচ্ছে।

অনেকক্ষণ পর যখন আহসান সেজদা থেকে মাথা তুলল, আকাশে তখন মেঘের দল সরে গেছে। পূর্ণ চাঁদটা আবার এক অনাবিল স্নিগ্ধতায় চারপাশ ভরিয়ে তুলেছে।

আহসান গভীর এক নিঃশ্বাস নিল। তার বুকের সেই ভারী পাথরটা আর নেই। সেখানে এখন কেবলই এক অদ্ভুত হালকা ভাব, এক নাম-নাহীন প্রাশান্তি আর এক পরম প্রেমের শান্ত ধারা। বাইরে রাতের নীরবতা আগের মতোই আছে, কিন্তু আহসানের ভেতরের পৃথিবীটা চিরতরে বদলে গেছে। সে বুঝে গেছে, জীবনের পথ যতই আঁধারে ঢেকে যাক না কেন, যে মানুষ রাতের শেষ প্রহরে সেজদায় নত হতে জানে, সে কখনো হারায় না।

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default