শ্রাবণের এক বিষণ্ণ বিকেলে রিফাতের ডেস্কের ওপারে কাঁচ ঘেরা জানালায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছিল। কর্পোরেট অফিসের কাচঘেরা ঘরের ভেতরটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলেও, রিফাতের বুকের ভেতর এক ধরণের তীব্র দমবন্ধ করা উত্তাপ।
রিফাত এই স্বনামধন্য টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানের কোয়ালিটি অ্যান্ড অপারেশনস ম্যানেজার। বয়স চল্লিশের কোঠায়। দীর্ঘ পনেরো বছরের চাকরি জীবনে রিফাতের একটা পরিচয়ই সবার মুখে মুখে ফেরে—"রিফাত সাহেব মানুষটা আয়নার মতো স্বচ্ছ, কিন্তু তলোয়ারের মতোই ধারালো।" সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলাটাই তার জীবনের একমাত্র ধর্ম। তবে এই ধর্মের মূল্য তাকে প্রতিপদে চুকোতে হয়েছে।
কিন্তু আজকের দিনটা অন্য সব দিনের মতো নয়। আজ তার মুখোমুখি বসে আছেন জহির সাহেব—কোম্পানির সিনিয়র ডিরেক্টর, আর সম্পর্কে রিফাতের আপন বড় খালু। শৈশবে বাবা হারানোর পর এই জহির সাহেবের হাত ধরেই রিফাতের বড় হওয়া, পড়ালেখা এবং আজকের এই অবস্থানে আসা। আজ রিফাত যে চেয়ারে বসে আছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই মানুষটিই।
জহির সাহেব চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে নিচু গলায় বললেন, "রিফাত, আগামীকালের ইন্টারনাল অডিট রিপোর্টটা একটু বদলে দাও। যে সাড়ে তিনশ গজ ফেব্রিক নষ্ট হয়েছে, সেটাকে 'শিপমেন্ট ড্যামেজ' হিসেবে দেখাও। বোর্ড মিটিংয়ে এই ইস্যুটা উঠলে আমার ডিপার্টমেন্টের বিশাল বাজেট কাটছাঁট হবে। আর তুমি তো জানো, সামনের মাসে আমার রিটায়ারমেন্ট। এই সময় আমার রেপুটেশনে কোনো দাগ পড়তে দিতে পারি না।"
রিফাত স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল জহির সাহেবের দিকে। মানুষটির চুলে পাক ধরেছে, চোখে ক্লান্তি। এই হাত দুটোই একদিন তাকে সাইকেল চালানো শিখিয়েছিল, শিখিয়েছিল কিভাবে সাঁতার কেটে প্রতিকূল পানির স্রোত থেকে বেঁচে কূলে উঠতে হয়।
রিফাত আস্তে করে ফাইলটা বন্ধ করল। গলার স্বর কিছুটা কাঁপছিল তার, "খালু... আপনি ভালো করেই জানেন ড্যামেজটা কুরিয়ারের কারণে হয়নি, আমাদের ফ্যাক্টরির গাফিলতিতেই হয়েছে। শিফট ইনচার্জ মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল, আর আপনি সেটা জেনেশুনেই সাইন করেছেন। আমি রিপোর্টে মিথ্যা লিখতে পারব না।"
জহির সাহেবের মুখের হাসির রেখা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি শক্ত হয়ে উঠল, "তুমি আমায় শেখাচ্ছ রিফাত? এই অর্গানাইজেশনে লবিং আর গ্রুপিং কীভাবে চলে, তা তুমি ভালো করেই জানো। আমি না থাকলে আজ তুমি এই পদে আসতে পারতে না। আর আজ একটু চোখের চামড়া বুজে সত্যটা গোপন করতে বলছি বলে তুমি নীতি দেখাচ্ছ?"
"আমি আপনার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ খালু," রিফাতের চোখে জল ছলছল করে উঠল, "কিন্তু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে আমি মিথ্যার সাথে আপস করতে পারব না। আপনাকে বাঁচানোর জন্য আমি মিথ্যা বললে, কাল অন্য কেউ অন্যায় করার সাহস পাবে।"
"বেশ! তবে জেনে রেখো, এই সত্যবাদিতা তোমাকে বড্ড একা করে দেবে," টেবিল চাপড়ে উঠে দাঁড়ালেন জহির সাহেব। "রাজনীতির এই খেলায় তোমার পাশে কেউ থাকবে না। সবাই তোমার পেছনে বাঁশ দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে, আজ থেকে তোমার নিজের খালুও আর তোমার পাশে থাকবে না।"
জহির সাহেব হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেল, আর রিফাত অনুভব করল এক গভীর শূন্যতা।
পরের কয়েকটা মাস রিফাতের জীবনের ওপর দিয়ে যেন কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেল। অডিট রিপোর্টে সত্য উন্মোচন করার পর অফিসে এক চরম গুঞ্জন শুরু হলো। সহকর্মীরা তাকে "বিশ্বাসঘাতক" বলতে শুরু করল, যে নিজের রক্তের সম্পর্কের মানুষকেও ছাড়েনি।
অফিসের লাঞ্চ টেবিলে আগের মতো আর কেউ রিফাতের পাশে বসে না। যে মিটিংগুলোতে রিফাত আগে প্রধান সিদ্ধান্ত নিত, সেখান থেকে কৌশলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো। তার নিজস্ব টিমের জুনিয়র কর্মীরাও এখন তার থেকে দূরে দূরে থাকে—পাছে রিফাতের সাথে মিশলে ওপর মহলের রোষানলে পড়তে হয়! এমনকি তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মিথ্যা গাফিলতির অভিযোগ তুলে ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারিও শুরু করা হলো। লবিংয়ের রাজনীতি তাকে চারপাশ থেকে চেপে ধরল।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এলো পারিবারিক জীবনে। জহির সাহেব পরিবারের সবাইকে জানিয়ে দিলেন, রিফাত অকৃতজ্ঞ, অহংকারী এবং নিজের অহংকার বজায় রাখতে আপনজনের ক্ষতি করতেও দ্বিধা করে না। পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে রিফাতের নিমন্ত্রণ বন্ধ হয়ে গেল। ঈদ বা বিশেষ দিনে যে বাড়িটায় রিফাতের হাসিমুখ ছাড়া উৎসব জমত না, সেই বাড়ির দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
একদিন গভীর রাতে রিফাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। পাশে এসে দাঁড়াল তার স্ত্রী। রিফাতের চোখ দিয়ে নীরবে পানি গড়াচ্ছিল।
"খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না?" স্ত্রী আলতো করে রিফাতের কাঁধে হাত রাখল।
রিফাত শক্ত করে স্ত্রীর হাতটা চেপে ধরল। ভারী গলায় বলল, "কষ্টটা একা হয়ে যাওয়ার নয়। কষ্টটা হলো, মানুষ কেন সত্যের চেয়ে সুবিধাকে বেশি ভালোবাসে? যে মানুষটা আমাকে মানুষ করল, আজ তিনিই আমাকে সবচেয়ে বড় শত্রু ভাবেন। সত্য বলতে গিয়ে আমি আমার স্বজন হারালাম, বন্ধু হারালাম... কাজ করার পরিবেশ হারালাম।"
স্ত্রী তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, "তুমি যা হারিয়েছ তা সাময়িক, কিন্তু যা ধরে রেখেছ তা তোমার বিবেক। মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো সম্পর্ক তাসের ঘরের মতো, আজ না হোক কাল ভেঙে যেতই।"
এর ছয় মাস পর। কোম্পানির বার্ষিক জেনারেল মিটিং।
প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হঠাৎ করেই রিফাতকে ডেকে পাঠালেন। জহির সাহেব তখনো এক কোণে মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন। চেয়ারম্যান রিফাতের দিকে তাকিয়ে কয়েকটা ফাইল এগিয়ে দিলেন।
"রিফাত সাহেব, গত ছয় মাস ধরে আপনার ওপর দিয়ে কী গেছে, আমি তার সব খবর রেখেছি," চেয়ারম্যান ধীর শান্ত গলায় বললেন। "অফিসের ভেতরের লবিং, গ্রুপবাজি আর আপনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আমি নিজে তদন্ত করেছি। আমি দেখেছি কীভাবে সবাই আপনাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে, কারণ আপনি তাদের অন্যায় বা মিথ্যার অংশ হননি।"
পুরো মিটিং রুম নিস্তব্ধ। চেয়ারম্যান এবার জহির সাহেবের দিকে তাকালেন, তারপর রিফাতের দিকে ফিরে বললেন, "আমাদের বোর্ডে এমন একজন মানুষকে অত্যন্ত প্রয়োজন, যাকে কোনো ভয়, লোভ বা সম্পর্কের দোহাই দিয়ে কেনা যায় না। আপনাকে আমাদের নতুন 'হেড অব কমপ্লায়েন্স অ্যান্ড এথিক্স' হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানে আপনিই হবেন সত্যের শেষ কথা।"
মিটিং শেষে সবাই একে একে বেরিয়ে গেল। রিফাত ধীরে ধীরে জহির সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জহির সাহেবের চোখ তখন নিচের দিকে ঝোঁকা, অপরাধবোধে আচ্ছন্ন।
"খালু..." রিফাত নিচু গলায় ডাকল।
জহির সাহেব মাথা তুলে তাকালেন। তার চোখে ফোঁটায় ফোঁটায় জল আটকে ছিল। তিনি রিফাতের দু হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, "আমাকে ক্ষমা করে দিস রে রিফাত। আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম লবিং আর মিথ্যাই আমাকে বাঁচাবে। কিন্তু আজ বুঝলাম, মিথ্যার ভিত যত শক্তই হোক, সত্যের আলোর সামনে তা ভেঙে পড়ে। আমি সম্পর্কের দোহাই দিয়ে তোকে হারাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুই সত্যের দোহাই দিয়ে আমার নীতিকে বাঁচিয়ে দিলি।"
ঝাপসা চোখে রিফাত তার খালুকে জড়িয়ে ধরল।
হয়তো সত্যের পথটা বড্ড একাকী, বড্ড বন্ধুর। কিন্তু এই পথের শেষপ্রান্তে যে আলো থাকে, তা শুধু একজন মানুষকে জয়ী করে না—তার চারপাশের ভেঙে যাওয়া সম্পর্কগুলোকেও এক নতুন আর পবিত্র মর্যাদায় ফিরিয়ে দেয়।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।