রাত দুটো বাজে। অ্যাপোলো হাসপাতালের নিউরোলজি আইসিইউ-এর বাইরে লাল আলোটা একনাগাড়ে জ্বলে আছে। বেঞ্চে মাথা গুঁজে বসে আছে সাজিদ। পরনের শার্টটা কুঁচকে গেছে, চোখের নিচে বেশ কালচে ছোপ।
ভেতরে লাইফ সাপোর্টে লড়ছেন সাজিদের বাবা—অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম। সন্ধ্যারাতে হঠাৎ ব্রেইন স্ট্রোক করার পর থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। ডাক্তার সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, "আগামী ১২ ঘণ্টা খুব ক্রিটিক্যাল। জরুরিভিত্তিতে একটি সার্জারি করতে হবে, তার জন্য রাত পোহানোর আগেই লাগবে অন্তত চার লাখ টাকা।"
সাজিদ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। গত পাঁচ বছর ধরে একটা নামকরা ডেভেলপমেন্ট সংস্থায় সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত। বেতন মন্দ নয়, কিন্তু মাস শেষে সংসার চালানো আর বাবার নিয়মিত ওষুধের খরচ মিটিয়ে হাতে বিশেষ কিছু জমার সুযোগ হতো না।
হাত বাড়িয়ে যখন টাকার ফোনকলগুলো করা শুরু হলো, তখনই রূপ বদলাতে শুরু করল চারপাশের পৃথিবীটা।
মাত্র চার মাস আগের কথা। সাজিদ আর নাবিলা—দুজনের বিবাহবার্ষিকীর গ্র্যান্ড পার্টি হয়েছিল উত্তরের এক অভিজাত রেস্তোরাঁয়। সাজিদের আমন্ত্রণে অফিসে তার সহকর্মী, বসের দল থেকে শুরু করে বন্ধুমহলের প্রায় সবাই উপস্থিত ছিল।
টেবিলে জমকালো খাবার, পেছনে আলোঝলমলে ব্যাকড্রপ। সেদিন সাজিদের ম্যানেজার তানভীর সাহেব পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, "সাজিদ, ইউ আর মাই মোস্ট ট্রাস্টেড ম্যান! জীবনে কোনো সাপোর্ট লাগলে এক কলে তানভীর ভাইকে পাবে।"
বন্ধু শুভ এসে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, "আমাদের পুরো গ্যাংয়ের প্রাণ ভাই তুই! তোর জন্য জীবনের যেকোনো দরজায় হাত বাড়াতে রাজি।"
ছবি উঠেছিল শ’খানেক। সাজিদ ভেবেছিল, তার জীবনটা কত ভালোবাসায় ঘেরা! তার চারপাশে কত মানুষ, কত শুভাকাঙ্ক্ষী!
কিন্তু হাসপাতালের আইসিইউ-এর বাইরের হিমশীতল বারান্দায় সেই বিশাল 'আপনজনদের' তালিকাটা হঠাৎ করেই এক ফুঁয়ে উবে যেতে লাগল।
ঘড়ির কাঁটা আড়াইটা ছুয়েছে।
সাজিদ কাঁপা হাতে প্রথম কলটি করল ম্যানেজার তানভীর সাহেবকে।
তিনবার রিং হওয়ার পর ফোনটা ধরতেই সাজিদ এক নিঃশ্বাসে পরিস্থিতিটা বলল, "স্যার, বাবার অবস্থা খুব খারাপ। ভোরেই সার্জারি। স্যার, কাল অফিসে গিয়ে যা প্রসেস করার করব, আপনি যদি ব্যক্তিগতভাবে এখন লাখ দুয়েক টাকা..."
ওপাশ থেকে একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল। "ওহ সাজিদ! খুব খারাপ খবর। বাট ইউ সি, আমি তো ফ্যামিলি নিয়ে এখন কক্সবাজারে ভ্যাকেশনে। অ্যাকাউন্ট থেকে এত টাকা এখন অনলাইন ট্রান্সফার করা ঝামেলা ভাই। তুমি অন্য কোথাও একটু ম্যানেজ করার চেষ্টা করো না?"
কলটা কেটে গেল।
সাজিদ এরপর কল করল শুভকে। শুভ ফোন ধরে আধো ঘুমে বলল, "দোস্ত! বিশ্বাস কর, গতকালই তো একটা নতুন ফ্ল্যাটের ডাউনপেমেন্ট আটকে গেল। হাত একদম খালি রে। খুব খারাপ লাগছে তোর জন্য..."
এক এক করে সাজিদ তার ফোনে থাকা সেই সব 'কাছের মানুষের' তালিকা ধরে অন্তত বারো-তেরো জনকে ফোন করল—যাদের নিয়ে সে উৎসব উদযাপন করেছে, যাদের সুখে-দুঃখে দিনরাত এক করেছে। কারো ফোন ধরলই না, কেউ বলল তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ব্লকড, আর কেউ বা সহানুভূতি দেখিয়ে মিষ্টি কথায় সরে পড়ল।
সাজিদের মনে হচ্ছিল, চারপাশের আলোগুলো যেন ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। চার লাখ টাকা নয়, তার চোখের সামনে যেন ধসে পড়ছে দীর্ঘদিনের বানানো একটা রঙিন ভণ্ডামির জগত।
যে মানুষগুলোর হাসিতে সে এতদিন নিজের প্রতিফলন দেখত, বিপদের এক ধাক্কায় সেই আয়নাগুলো সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সাজিদ আইসিইউ-এর মেঝেই হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে পড়ল। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে—বাবার চিন্তায় নয়, বরং চারপাশে ভেসে থাকা হাজার হাজার ভুয়া মুখের ভিড়ে নিজেকে বড্ড অসহায় আর নিঃসঙ্গ মনে হওয়ার যন্ত্রণায়।
রাত তিনটা বাজে।
হঠাৎ সাজিদের ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। কোনো ফোনকল নয়, একটা নোটিফিকেশন। ব্র্যাক ব্যাংকের অ্যাপ থেকে আসা একটি জমা মেসেজ—"BDT 4,000,00 Instant Fund Transfer."
সাজিদ চমকে উঠে ফোনটা হাতে নিল। চার লাখ টাকা একদম হুবহু জমা হয়েছে! কে পাঠাল?
সে মেসেজটা খোলার আগেই আরেকটি কল এল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একটা নাম—"কামাল (অফিস পিওন)"।
কামাল সাজিদের অফিসের সবচেয়ে কম বেতনের পিয়ন। বয়সে সাজিদের চেয়ে কিছুটা বড়, নীরব আর শান্ত স্বভাবের মানুষ। অফিসে সবাই তাকে দিয়ে চা আনা বা ফাইল সরানোর কাজ করায়, তেমন কেউ বিশেষ পাত্তা দেয় না। তবে সাজিদ প্রতিদিন সকালে অফিসে ঢুকে কামাল ভাইয়ের সাথে এক কাপ চা খেত আর তার পরিবারের খোঁজখবর নিত।
কাঁপা কণ্ঠে ফোনটা কানে তুলল সাজিদ, "কামাল ভাই...?"
ওপাশ থেকে কামাল ভাইয়ের শান্ত ও গভীর কণ্ঠ ভেসে এল, "সাজিদ ভাই, টাকাটা পাইছেন? আমি বিকালের দিকেই শুনছিলাম আপনার আব্বা হঠাৎ অসুস্থ হইছেন। রাতে অফিসে কাসেম ভাইয়ের কাছে শুনলাম অবস্থা নাকি জটিল। ভাবলাম আপনার টাকার দরকার হইতে পারে।"
সাজিদ স্তব্ধ হয়ে গেল। "কামাল ভাই... চার লাখ টাকা! আপনি এত টাকা কোথায় পেলেন?"
কামাল ভাই মৃদু হেসে বললেন, "ভাই, গ্রামের ভিটেবাড়ির যে জমিটা নিয়ে মামলা চলছিল, গত মাসে সেটার সমাধান হইছে। জমি বেচা চার লাখ টাকা ব্যাংকেই রাখা ছিল... গ্রামে একটা ছোট ঘর তোলার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু মানুষ বাঁচানো তো ঘরের চেয়ে বড় কাজ, তাই না ভাই?"
সাজিদ কোনো কথা বলতে পারছিল না। তার গলা ধরে এসেছে।
কামাল ভাই আবার বললেন, "আপনি কোনো চিন্তা কইরেন না ভাই। টাকা ফেরতের কোনো তারা নাই। আঙ্কেল সুস্থ হইয়া ঘরে ফিরুক, এইটা আগে দরকার। আমি হাসপাতালের নিচে রিসেপশনে দাঁড়ায়া আছি, রিসিপ্ট প্রসেস করার দরকার হইলে বলেন, আমি ভেতরে আসব?"
সাজিদ ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ফেলল। সে আর নিজের ভেতরের কান্নাটা চেপে রাখতে পারল না।
সব আলো, সব বাহবা, আর সব সাজানো ভালোবাসা পার হয়ে যে মানুষটি অন্ধকারের মধ্যে তার হাতটা এসে ধরল—সে তার কোনো তথাকথিত দামি বন্ধু নয়, কোনো ক্ষমতাধর বস নয়। সে এমন একজন, যাকে সমাজ 'ছোট চাকরিজীবী' বলে এড়িয়ে চলে।
সকাল ছয়টা।
দীর্ঘ জটিল অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসক বাইরে এসে হাসিমুখে জানালেন, "অপারেশন সাকসেসফুল। আপনার বাবা এখন বিপদমুক্ত। সময়মতো টাকা জমা না পড়লে রক্ত আর ওষুধপত্র রেডি করা অসম্ভব হতো।"
সাজিদ আইসিইউ-এর কাঁচের জানালার পাশ দিয়ে তার বাবাকে দেখল। তারপর পাশে এসে দাঁড়াল কামাল ভাইয়ের।
ভোরের আলোটা হাসপাতালের বারান্দায় এসে পড়েছে। সাজিদ আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। গত ১২ ঘণ্টার ঝড় তার জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, আবার তার চেয়েও বেশি কিছু উপহার দিয়েছে।
সেদিন রাতে সাজিদ কেবল একজন সন্তান হিসেবে লড়াই করেনি, সে জীবনের সবচেয়ে বড় পাঠটি শিখেছে।
সে বুঝেছে—সুখের সময় অনেকেই পাশে থাকে, হাত মেলায়, মিষ্টি হেসে ছবি তোলে। কিন্তু দুঃসময়ই বলে দেয় কে সত্যিকারের আপন, আর কে শুধুই স্বার্থের টানে কাছে এসেছিল। জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলো মানুষকে ভীষণ কষ্ট দেয় সত্যি, তবে সেই কষ্টই মানুষ চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আয়না হয়ে ওঠে। খারাপ সময় আসলে জীবনের কোনো অভিশাপ নয়, বরং ছদ্মবেশী আত্মিক বন্ধুদের মুখোশ খুলে দিয়ে খাঁটি মানুষকে চেনার এক অমূল্য শিক্ষা।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।