রাত তখন পৌনে বারোটা। ১০ তলার বিশাল কাঁচের জানালাটার ওপারে ঢাকা শহরের আলোঝলমলে ট্রাফিক তখনো ছুটছে। কিন্তু ভেতরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের বাতাসটা বড্ড ভারী, যেন দম আটকে আসে।
অফিসের বিশাল ওক কাঠের কনফারেন্স টেবিলের এক মাথায় একাকী বসে আছে অয়ন। সামনে খোলা ল্যাপটপ, আর টেবিলময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা একগুচ্ছ কালারিং প্রিন্টআউট—আগামীকালের সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্ট প্রেজেন্টেশনের ডেক। গত তিন সপ্তাহ ধরে অয়নের চোখ-মুখের ঘুম উধাও। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারেনি সে। টিমের প্রজেক্ট লিড হিসেবে দায়িত্বটা তার কাঁধেই ছিল, কিন্তু কাজের কাজ যা করার, অয়নকেই একা টানতে হয়েছে।
দরজায় হালকা টুকা পড়ার শব্দে অয়ন চোখ তুলে তাকাল। অফিসের নাইট গার্ড কাসেম ভাই এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে দাঁড়িয়ে।
"স্যার, এখনো যান নাই? শরীরটা তো শেষ কইরা ফালাইতেছেন।"
অয়ন মলিন একটু হেসে চা-টা হাতে নিল। "আর একটু কাজ বাকি, কাসেম ভাই। কালকের প্রেজেন্টেশনটা ঠিকঠাক না হলে সব শেষ।"
কাসেম ভাই চায়ের কাপটা গুছিয়ে রেখে মৃদু স্বরে বললেন, "কাজের চাপের চেয়ে মনের চাপ বড় বিষাল স্যার। এই চার দেয়ালের ভেতরে কত মানুষকে যে প্রতিদিন মরে যেতে দেখি..."
কথাটা অয়নের বুকে গিয়ে বিঁধল। সত্যিই তো, এই চার দেয়ালের ভেতর কত স্বপ্ন প্রতিদিন নিঃশব্দে গুমরে কাঁদে!
কয়েক মাস আগের কথা। অয়ন যখন এই নামকরা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে সিনিয়র প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করে, তখন তার চোখে ছিল একরাশ স্বপ্ন। তাকে বলা হয়েছিল, "আমাদের একটা দারুণ টিম আছে, তুমি এসে নতুন মেধা আর ভিশন দিয়ে লিড করবে।"
প্রথম কয়েকটা সপ্তাহ সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। প্রতি সপ্তাহের টিম মিটিংয়ে কত হাসাহাসি, কত পরিকল্পনা! সবাই বলত, "উই আর এ ফ্যামিলি!" কিন্তু অয়ন বুঝেনি, এই ‘ফ্যামিলি’ আর ‘টিম’ শব্দের আড়ালে লুকিয়ে ছিল দায় এড়ানোর এক জঘন্য রাজনীতি।
ঘটনাটা ঘটল ‘প্রজেক্ট নেক্সাস’-এর লঞ্চিংয়ের দিনে। পুরো টিম মিলে কাজটা সাজানো হয়েছিল। লঞ্চিং সফল হওয়ার সাথে সাথে ম্যানেজিং ডিরেক্টরের কাছ থেকে মেইল এল। সাথে সাথেই টিমের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ভেসে গেল অভিনন্দন বার্তায়।
কনফারেন্স রুমে যখন সিইও সবাইকে ডেকে নিয়ে প্রশংসা করছিলেন, তখন অয়নের টিমের বিভাগীয় প্রধান সাব্বির আহমেদ বেশ চওড়া হেসে বললেন, "স্যার, আমরা পুরো টিম দিনরাত এক করে দিয়েছিলাম। ইট ওয়াজ আ পিওর টিমওয়ার্ক! আমরাই করে দেখিয়েছি।"
টিমের বাকি সদস্যরাও—আরিফ, তানিয়া, রিয়াদ—সবাই একে অপরের পিঠ চাপড়ে কৃতিত্ব ভাগ করে নিল। অয়ন এক কোণে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসছিল। তার ভালো লাগছিল এই ভেবে যে, তার অক্লান্ত পরিশ্রম অন্তত দলকে সফল করেছে।
কিন্তু সেই সুখের আয়ু ছিল মাত্র তিন দিন।
সিস্টেমে একটি কারিগরি ত্রুটির কারণে লঞ্চের চারদিনের মাথায় হঠাৎ করেই মূল সার্ভারে ডেটা ক্র্যাশ করে। ক্লায়েন্টের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সাময়িকভাবে অপ্রাপ্য হয়ে পড়ে। আর্থিক ক্ষতি বড় কিছু না হলেও কোম্পানির ভাবমূর্তিতে হালকা আঁচ লাগে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, অয়নের পায়ের তলার মাটি এক ঝটকায় সরে গেল।
জরুরি মিটিং ডাকা হলো। সেই একই কনফারেন্স রুম, একই মানুষগুলো। কিন্তু বাতাসের মেজাজ সম্পূর্ণ আলাদা। সিইও যখন গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, "হাও ডিড দিস হ্যাপেন? এই ভুলের দায়িত্ব কার?"
অয়ন আশা করেছিল, তার সহকর্মীরা, যাদের সাথে সে দিনরাত কাজ করেছে, তারা একসাথে বলবে—"আমরা বিষয়টি দেখছি, কোথায় ভুল হয়েছে খুঁজে বের করছি।"
কিন্তু সাব্বির আহমেদ এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে অয়নের দিকে আঙুল তুলে বললেন, "স্যার, অয়ন প্রোডাক্ট লিড হিসেবে শেষ মুহূর্তে কোডের কিছু মডিফিকেশন একাই অ্যাপ্রুভ করেছিল। আমরা টিম থেকে ওকে বারণ করেছিলাম, কিন্তু ও শোনে নাই। পুরো রেসপন্সিবিলিটি অয়নের।"
অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেল। আরিফ আর তানিয়া, যারা সেই মডিফিকেশনের সময় অয়নের পাশেই বসে কফি খাচ্ছিল এবং সানন্দে সম্মতি দিয়েছিল, তারা চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ একটা শব্দও বলল না।
যে টিম সাফল্য আসার পর বুকে হাত দিয়ে বলেছিল "আমরা করেছি", সামান্য একটা ঝড়ের মুখে তারাই একজোট হয়ে সব দায় চাপিয়ে দিল অয়নের একার কাঁধে। অয়ন বুঝল, কৃতিত্ব ভাগ করে নেওয়ার লোক এখানে শত শত, কিন্তু ভুলের দায়ভার বহন করার মতো মানুষ এই দলের একজনও নেই।
পরের দুটো মাস অয়নের জন্য ছিল এক নরকযন্ত্রণা।
যে অয়ন একসময় নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে অফিসে আসত, সে এখন মিটিংয়ে মুখ খুলতে ভয় পায়। তার আত্মবিশ্বাস একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। প্রতি রাতে বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের চেহারা দেখে নিজেরই অচেনা লাগত। যে কাজের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ছিল, সেই কাজটাই এখন তার কাছে এক অভিশাপের মতো মনে হয়। সে বুঝতে পারছিল, সে শুধু একটা অফিসে কাজ করছে না, সে এমন এক জায়গায় আটকে গেছে যেখানে সহযোগিতা নেই, আছে শুধুই দায় এড়িয়ে যাওয়ার নোংরা প্রতিযোগিতা।
মানুষের ক্রিয়েটিভিটি বা সৃজনশীলতা কখনো ভয়ের পরিবেশে ডানা মেলতে পারে না। অয়নের ভেতরের সেই প্রাণোচ্ছ্বল, স্বপ্নবাজ মানুষটা প্রতিদিন একটু একটু করে মারা যাচ্ছিল।
আজ রাতে একা বসে প্রেজেন্টেশন রেডি করতে করতে অয়ন শেষবারের মতো নিজের মুখোমুখি হলো। কাসেম ভাইয়ের সেই কথাটা তার কানে বাজতে লাগল—"এই চার দেয়ালের ভেতরে কত মানুষকে যে প্রতিদিন মরে যেতে দেখি..."
অয়ন ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কালকের প্রেজেন্টেশনটি একদম নিখুঁত হয়েছে। কিন্তু এবার সে আর নিজেকে বলি দেবে না। সে ড্রয়ার থেকে একটা সাদা কাগজ বের করল। নিজের কলম দিয়ে খুব শান্ত হাতে কয়েকটা লাইন লিখল।
ইস্তফাপত্র।
কাগজটা ল্যাপটপের পাশে রেখে অয়ন ল্যাপটপ বন্ধ করল। সে উপলব্ধি করল, বিষাক্ত পরিবেশে টিকে থাকা কোনো বীরত্ব নয়। নিজের আত্মসম্মান, নিজের মেধা আর মানসিক শান্তিকে বিকিয়ে দিয়ে কখনো কোনো বড় স্বপ্ন পূরণ হতে পারে না।
পরদিন সকাল ১০টা।
কনফারেন্স রুমে বোর্ড মেম্বাররা উপস্থিত। সাব্বির আহমেদ দাঁড়িয়ে অয়নকে ইশারা করলেন প্রেজেন্টেশন শুরু করতে।
অয়ন উঠে দাঁড়াল। কিন্তু সে ল্যাপটপের দিকে গেল না। সে পকেট থেকে সাদা খামটা বের করে সিইও-র সামনে রাখল।
পুরো রুমে পিনপতন নীরবতা। সিইও ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, "হোয়াট ইজ দিস, অয়ন?"
অয়ন খুব শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "স্যার, এটি আমার পদত্যাগপত্র। আজকের প্রেজেন্টেশনের সমস্ত ফাইল নিখুঁতভাবে ফোল্ডারে গুছিয়ে রাখা আছে। এই ডেক টিমকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।"
সাব্বির আহমেদ কিছুটা বিচলিত হয়ে বললেন, "অয়ন, ইজ দিস আ জোক? প্রজেক্টের এত গুরুত্বপূর্ণ দিনে তুমি এসব কী বলছ?"
অয়ন সাব্বির আহমেদের চোখে চোখ রেখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির সাথে হাসল। তারপর পুরো ঘরের মানুষের দিকে তাকিয়ে বলল:
"আমি এতদিন ভাবতাম আমি একটা টিমে কাজ করছি। কিন্তু কাল রাতে আমি একটা সত্য উপলব্ধি করেছি। সব অফিসে টিম থাকে, কিন্তু সব টিমে টিমওয়ার্ক থাকে না।
যেখানে সাফল্য এলে সবাই একস্বরে বলে, 'আমরাই করেছি', অথচ সামান্য কোনো ভুল হলেই আঙুল উঠে যায় কেবল একজনের দিকে... যেখানে কৃতিত্ব শতভাগে ভাগ হয়, কিন্তু ভুলের সব বোঝা একা বহন করতে হয়—সেটি কোনো টিম নয়। সেটি সহযোগিতা নয়, সেটি দায় এড়িয়ে যাওয়ার এক বিষাক্ত সংস্কৃতি।
এমন পরিবেশ মানুষের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়, কাজের আলো কাড়ে, মানুষকে ভেতরে ভেতরে মেরে ফেলে। আমি বুঝেছি, আমি এতদিন কোনো টিমে ছিলাম না, আমি একটা ট্র্যাপে ছিলাম।"
অয়ন একটু থামল। পুরো রুমে তখন কেউ নিঃশ্বাস ফেলতেও যেন ভুলে গেছে।
অয়ন তার ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে শেষ কথাটি বলল, "মনে রাখবেন, একটি সত্যিকারের টিম ভুলের দিনে কাঁধে হাত রেখে পাশে দাঁড়ায়, আর সাফল্যের দিনে আপনাকে সামনে ঠেলে দেয়। যদি কোনো জায়গায় তার উল্টোটা ঘটে... তবে যত দ্রুত সম্ভব সেই ট্র্যাপ থেকে বেরিয়ে আসাই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।"
কারো কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে অয়ন কনফারেন্স রুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
অফিসের ১০ তলার কাঁচের দরজা ঠেলে যখন সে রাস্তার খোলা বাতাসে এসে দাঁড়াল, তখন মাথার ওপর দুপুরের প্রখর রোদ। কিন্তু অয়নের বুকের ভেতরে এখন আর কোনো ভারী মেঘ নেই। দীর্ঘ কয়েক মাস পর সে আজ মুক্তভাবে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল।
সে তার চাকরিটা হারিয়েছে সত্যি, কিন্তু নিজেকে আর তার আত্মসম্মানকে আবার নতুন করে ফিরে পেয়েছে।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।