দুঃখের দহন ও মাবুদের নিকট সমর্পণ

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

দুঃখের দহন ও মাবুদের নিকট সমর্পণ

মানুষের জীবন এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম। এখানে হাসি আছে, আবার অশ্রুও আছে। কিন্তু আধুনিক যুগে আমরা আমাদের দুঃখ ও অভাবের কথা মানুষের কাছে প্রকাশ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, আর সোসিয়াল মিডিয়ায় তো আমরা আঠার মতো লেগে আছি। দুঃখ আর কষ্ট হোক কিম্বা আনন্দ সাথে সাথে শেয়ার। অথচ আধ্যাত্মিকতার মূল কথা হলো—বান্দা তার সমস্ত আরজি কেবল তার রবের দরবারেই পেশ করবে। মাওলা আলী (আ.)-এর সেই অমর বাণী এবং ওলি-আল্লাহদের জীবনদর্শন আমাদের শেখায় যে, মানুষের কাছে হাত পাতা বা দুঃখ প্রকাশ করা মানে নিজের মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করা। প্রকৃত মুমিন তার হৃদয়ের ক্ষতগুলো কেবল তার মালিকের সামনেই উন্মোচিত করে।

রূহানি হাকিকত

পবিত্র কুরআনে হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনের এক চরম সংকটের মুহূর্তে তার ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি নিখাদ বিশ্বাসের কথা বর্ণিত হয়েছে। যখন তিনি তার প্রিয় পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে হারিয়ে ব্যথিত ছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন:

قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ

(সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৬)

অনুবাদ: তিনি বললেন, "আমি আমার অসহনীয় দুঃখ ও শোকের অভিযোগ কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি।"

এই আয়াতের ইঙ্গিত হলো, 'শেকওয়া' বা অভিযোগ যদি আল্লাহর কাছে করা হয়, তবে তা সবর বা ধৈর্যের পরিপন্থী নয়। বরং এটি 'মাকামে আবুদিয়াত' বা দাসত্বের সর্বোচ্চ শিখর। সৃষ্টির কাছে অভিযোগ করা মানে হলো স্রষ্টার ফয়সালার প্রতি এক প্রকার অনাস্থা জ্ঞাপন করা। ইয়াকুব (আ.) আমাদের শিখিয়েছেন যে, চোখের জল যদি ঝরতেই হয়, তবে তা যেন জায়নামাজে ঝরে।

আল্লাহর ওপর ভরসা

রাসূলে কারীম (সা.) সবসময় সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন যেন তারা সৃষ্টিজীবের মুখাপেক্ষী না হন। একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:

قَالَ النَّبِيُّ ﷺ: مَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِالنَّاسِ لَمْ تُسَدَّ فَاقَتُهُ، وَمَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِاللَّهِ فَيُوشِكُ اللَّهُ لَهُ بِرِزْقٍ عَاجِلٍ أَوْ آجِلٍ

(সুনানে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ২৩২৬)

অনুবাদ: নবীজি (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি অভাব-অনটনে পতিত হয়ে তা মানুষের কাছে তুলে ধরে, তার অভাব দূর করা হয় না। আর যে ব্যক্তি অভাবের সম্মুখীন হয়ে তা আল্লাহর কাছে পেশ করে, আল্লাহ তাকে দ্রুত বা বিলম্বে রিজিক দান করেন।"

হাদিসের এই অমিয় বাণীটি ইনপুটকৃত আলেম সাহেবের সেই বক্তব্যের সাথে হুবহু মিলে যায়। যখন আমরা মানুষের কাছে অভাবের কথা বলি, তখন আমরা আমাদের 'তাওয়াক্কুল' বা নির্ভরতা আল্লাহর ওপর থেকে সরিয়ে সৃষ্টির ওপর নিবদ্ধ করি। ফলে আল্লাহ তায়ালা সেই বান্দার জিম্মাদারী তুলে নেন এবং তাকে ওই সৃষ্টির হাতেই ছেড়ে দেন। সৃষ্টির কী সাধ্য যে অন্যকে পূর্ণতা দান করবে?

বাবুল ইলম এর দর্শন

মাওলা আলী (আ.) ছিলেন 'বাবুল ইলম' বা জ্ঞানের শহর। তিনি মানুষের আত্মমর্যাদা ও আধ্যাত্মিক উচ্চতা সম্পর্কে যে দর্শন দিয়েছেন, তা অতুলনীয়। তিনি বলেছেন:

"তোমার অভাব ও কষ্টের কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করা মানে হলো নিজের মর্যাদাকে খাটো করা এবং তোমার শত্রুকে আনন্দিত করা।"

আহলুল বাইয়েতের (আ.) মূল শিক্ষা হলো 'ইজ্জতে নফস' বা আত্মসম্মান রক্ষা করা। ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) তার 'সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া'য় আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মহান রবের সাথে একান্তে কথা বলতে হয়। আহলুল বাইয়েতের আদর্শ অনুযায়ী, কষ্টের সময় মানুষের কাছে হাত পাতা হলো 'শিরকে খফি' বা প্রচ্ছন্ন শিরকের একটি রূপ। কারণ, বান্দা মনে করছে তার সমস্যার সমাধান আল্লাহর চেয়ে কোনো মানুষ ভালো করতে পারবে।

হাদিসে সাকালাইনের চেতনা হলো—আল্লাহর কিতাব ও আহলুল বাইয়েতের আদর্শকে আঁকড়ে ধরা। আর তাদের প্রত্যেকের জীবনই ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর পূর্ণ সন্তুষ্ট (রেজা বিল কাজা)। কারবালার প্রান্তরে চরম পিপাসা ও শোকের মুহূর্তেও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জবান মোবারকে কেবল আল্লাহরই প্রশংসা ছিল। তিনি মানুষের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করেননি, বরং শাহাদাতের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে প্রকৃত মুক্তি কেবল আল্লাহর কাছেই।

অন্তরের নিভৃত আলাপ

দুঃখ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক গোপন দাওয়াত। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) বলেন, "ক্ষত দিয়েই আলো প্রবেশ করে।" অর্থাৎ, আপনার কষ্টগুলো হলো আল্লাহর কাছে ফেরার পথ।

ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তার 'এহইয়াউ উলুমিদ্দিন' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে না, সে যেন আল্লাহর জমিনে বসবাস না করে। সুফিদের মতে, 'ফকর' বা অভাব হলো আধ্যাত্মিক সম্পদ। হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) বলতেন, "যতক্ষণ তোমার নজরে মানুষ উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা রাখে, ততক্ষণ তুমি প্রকৃত তৌহিদ বা একত্ববাদের স্বাদ পাবে না।"

ইবনে আরাবি (রহ.)-এর দর্শনে, এই মহাবিশ্ব হলো আল্লাহর গুণের বহিঃপ্রকাশ। আপনার অভাবটি আসলে আল্লাহর 'আল-গনি' (অভাবমুক্ত) গুণের প্রতি আপনার মুখাপেক্ষী হওয়ার একটি সুযোগ। যখন আপনি মানুষের কাছে আপনার দুঃখ বলেন, তখন আপনি এই মহিমান্বিত সুযোগটি নষ্ট করেন। সুফিবাদ আমাদের শেখায় 'জিকর' ও 'ফিকর'-এর মাধ্যমে নিজের নফসকে এমন স্তরে নিয়ে যেতে, যেখানে দুনিয়ার কোনো অভাব বা অভিযোগ মানুষের কানে পৌঁছাবে না, বরং তা আরশে আজিমে সরাসরি পৌঁছাবে।

মুমিনের পাথেয়

পরিশেষে বলা যায়, আমাদের দুঃখ-দুর্দশা হলো আমাদের রবের সাথে একান্ত আলাপের এক স্বর্ণালি সুযোগ। মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলে কেবল সহমর্মিতা পাওয়া যায়, কিন্তু সমাধান পাওয়া যায় না। সমাধান কেবল তাঁরই কাছে যিনি অন্তরের খবর রাখেন। মাওলা আলী (আ.)-এর সেই অমোঘ সত্য আমাদের হৃদয়ে গেঁথে নিতে হবে—আমরা যেন নিজের দুঃখের কথা বলে নিজেকে অন্যের কাছে ছোট না করি।

আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে অভাব পেশ করা মানে হলো জিম্মাদারী হারানো। আসুন, আমরা আমাদের চোখের জলকে কেবল মহান আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত রাখি। প্রতিটি সেজদাহ হোক আমাদের অভিযোগ আর আরজির মিলনস্থল। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন এবং তিনি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট।

হে পথিক! তোমার হৃদয়ের ভাঙা টুকরোগুলো নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেও না। কারণ মানুষ ভাঙা জিনিস দিয়ে ঘর সাজায় না। কিন্তু মনে রেখো, আমার রব সেই মহান সত্তা, যিনি ভাঙা হৃদয়েই বসবাস করেন। তোমার অভাবগুলো তাঁর কাছে পেশ করো, তিনি তোমাকে অমুখাপেক্ষিতার রাজমুকুট পরিয়ে দেবেন। ইনশাআল্লাহ।

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default