রাত এখন গভীর। শহরের কোলাহল থিতিয়ে এসেছে, কিন্তু এই ফ্ল্যাটের দেয়ালে দেয়ালে যেন এক অদৃশ্য হাহাকার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মরিয়ম তার বেডরুমের জানালার পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের স্ট্রিট ল্যাম্পের হলুদ আলোটা রুমের অন্ধকার কোণে এসে পড়েছে, যা তার চেহারার বিষণ্ণতাকে আরও ঘনীভূত করছে।
মরিয়ম এমন একজন নারী, যার পৃথিবীটা আবর্তিত হয় তার আল্লাহ এবং তার সংসারকে কেন্দ্র করে। সে অভিযোগ করতে জানে না, সে জানে কেবল 'সবর' বা ধৈর্য ধরতে। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে সে অনুভব করছে, এই ঘরে সাফওয়ান থাকলেও তার রুহ বা আত্মাটা এখানে নেই। মানুষ যখন শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকে কিন্তু মানসিকভাবে অনুপস্থিত হয়, তখন সেই শূন্যতা কোনো আসবাব বা প্রাচুর্য দিয়ে পূরণ করা যায় না।
জায়নামাজের বিলাপ ও নিঃসঙ্গ পরিবেশ
ঘরের কোণে বিছানো আছে মরিয়মের সাদা মখমলের জায়নামাজ। এই জায়নামাজটি মরিয়মের জন্য কেবল ইবাদতের জায়গা নয়, এটি তার একমাত্র আশ্রয়স্থল—যেখানে সে তার জীবনের সব না-বলা কথাগুলো তার রবের কাছে সঁপে দেয়। জায়নামাজের ওপর পড়ে থাকা তসবিহটির দানাগুলো যেন একেকটি অশ্রুবিন্দু।
মরিয়ম জায়নামাজে বসে পড়ল। তার শরীরটা অবসাদে ভেঙে পড়ছে। সে অনুভব করছে, সাফওয়ানের সাথে তার দূরত্বটা এখন আর কেবল সময়ের নয়, বরং তা ইমানের। সাফওয়ান যখন বাসায় থাকে, সে সবসময় তার ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এক সময় যে মানুষটি গভীর রাতে তাকে ডেকে তুলে একসাথে তাহাজ্জুদ পড়ত, সেই মানুষটি এখন গভীর রাত পর্যন্ত কার সাথে যেন নিভৃতে কথা বলে। মরিয়ম জানে না ওপাশে কে, কিন্তু সে জানে ওই ফোনের ওপার থেকে যে বাতাস আসছে, তা তার তিল তিল করে সাজানো নীড়টিকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।
সন্দেহ নয়, এক আধ্যাত্মিক বোধ
নারীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বড় অদ্ভুত। বিশেষ করে যখন সেই নারী হয় ইমানদার। মরিয়ম সাফওয়ানের ফোনে কোনো প্রমাণ খুঁজেনি, সে পাসওয়ার্ড হ্যাক করেনি। সে কেবল সাফওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেছে যে, সেখানে আর নূর নেই। সাফওয়ান যখন তার সামনে আসে, তার মাঝে এক অপরাধবোধ কাজ করে, যা সে অতি উৎসাহী কোনো কথা বা দামী উপহার দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করে।
মরিয়ম বিড়বিড় করে বলল, "হে আল্লাহ, তুমি তো অন্তর্যামী। আমার ঘরটাকে কি কোনো ভাইরাস গ্রাস করছে? সাফওয়ানের কণ্ঠে কেন আজ আর সেই আগের মতো সিজদাহর ব্যাকুলতা পাওয়া যায় না?"
সে দেখল টেবিলের ওপর রাখা সাফওয়ানের সেই ডায়েরিটা। সেখানে সাফওয়ান লিখেছিল—"মরিয়ম, তুমি আমার জান্নাতের সফরসঙ্গী।" মরিয়মের চোখ ফেটে জল এল। যে সফরের গন্তব্য ছিল জান্নাত, সেই সফরে আজ 'পরকিয়া' নামক এই দুনিয়াবি মরীচিকা কীভাবে প্রবেশ করল? সাফওয়ান কি বুঝতে পারছে না যে, সে কেবল মরিয়মকে নয়, বরং তার রবকেও ধোঁকা দিচ্ছে?
গৃহের পরিবেশ ও বিষাদ
ড্রয়িংরুমের কোণে থাকা অ্যাকুয়ারিয়ামটির দিকে মরিয়মের চোখ পড়ল। মাছগুলো অবিরাম সাঁতরে বেড়াচ্ছে। কাঁচের ঘেরাটোপে তারা বন্দী, কিন্তু তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার আর অক্সিজেন ঠিকই আছে। মরিয়মের মনে হলো, সে নিজেও আজ এই ঘরের এক বন্দী মাছ। তার কাছে দামী আসবাব আছে, দামী কাপড় আছে, সমাজের চোখে সে এক 'সেলিব্রেটি' নাশিদ শিল্পীর স্ত্রী—কিন্তু তার হৃদয়ের অক্সিজেন, অর্থাৎ সাফওয়ানের শুদ্ধ ভালোবাসা এবং বিশ্বাস, তা যেন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে।
বাইরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ বাড়ছে। জানালার পর্দাগুলো অশুভ কোনো সংকেতের মতো দুলছে। মরিয়মের মনে হলো, এই বাতাস যেন তাকে সাবধান করে দিচ্ছে যে, একটি বড় ঝড় ধেয়ে আসছে। যে ঝড়টি এলে কেবল সাফওয়ানের ক্যারিয়ার নয়, বরং তাদের পুরো আভিজাত্য ধুলোয় মিশে যাবে।
ইমাম শাফিঈ (রহ.) বলেছিলেন—"মানুষ যখন তার রবের অবাধ্য হয়, তখন সে তার প্রভাব তার বাহন এবং তার পরিবারের আচরণের মাঝে দেখতে পায়।" মরিয়ম আজ সেই সত্যেরই মুখোমুখি। সাফওয়ানের ইমানের অবনতি তার ঘরে এক নীরব অশান্তি ডেকে এনেছে।
দীর্ঘশ্বাসের শেষ সীমানা
রাত তিনটে। কলিংবেলের শব্দে মরিয়ম সজাগ হয়ে উঠল। সাফওয়ান ফিরেছে। মরিয়ম দরজা খুলে দিতেই সাফওয়ানের সেই কৃত্রিম হাসিমাখা মুখটা দেখতে পেল। সাফওয়ানের গায়ে সেই তীব্র সুগন্ধি, যা মরিয়ম তাকে কোনোদিন কিনে দেয়নি।
সাফওয়ান বলল, "অনেক দেরি হয়ে গেল, কাজ শেষ করতে পারছিলাম না।"
মরিয়ম কোনো কথা বলল না। সে সাফওয়ানের চোখের দিকে একবার তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো গভীরতা নেই, কেবল এক চঞ্চল লুকোচুরি। সাফওয়ান দ্রুত বাথরুমে ঢুকে গেল। মরিয়ম ড্রয়িংরুমে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, সাফওয়ান যেন কেবল শরীরটা নিয়ে ঘরে ঢুকেছে, তার মনটা রয়ে গেছে সেই ক্যাফের নীল আলোর টেবিলে।
মরিয়ম জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশের চাঁদটা আজ মেঘে ঢাকা। ঠিক যেমন তাদের দাম্পত্যের ধ্রুবতারাটি আজ পরকিয়ার কালো মেঘে আচ্ছন্ন। সে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই দীর্ঘশ্বাসটি কোনো অভিযোগ নয়, বরং এটি আল্লাহর দরবারে এক নীরব আরজি।
"হে আল্লাহ, তুমি যদি আমার ঘরকে রক্ষা না করো, তবে কার সাধ্য আছে একে বাঁচানোর?"
মরিয়মের দুগাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে জানে না আগামী কাল কী অপেক্ষা করছে। সে জানে না সাফওয়ানের পকেটে থাকা ফোনটিতে সাহেলার কোন নতুন মেসেজটি তাদের ধ্বংসের পরোয়ানা নিয়ে আসবে। কিন্তু সে জানে, তার রবের বিচার বড় অমোঘ।
মরিয়ম কি আজ রাতেই সাফওয়ানের ফোনে এমন কিছু দেখে ফেলবে যা তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে? নাকি সাফওয়ান নিজেই তার পাপের ভারে ভেঙে পড়বে মরিয়মের সামনে?
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।