মেঘের পালক থেকে ঝরে পড়া সন্ধ্যার অন্ধকারে যখন চারপাশ ম্লান হয়ে আসে, তখন রহিমুদ্দিনের ঘরের কোণে এক অদ্ভুত সুবাস পাওয়া যায়। সেই সুবাস কোনো আতরের নয়, বরং এক অনুতপ্ত আত্মার দীর্ঘশ্বাসের। রহিমুদ্দিনের জীবনে বাস্তবতা আর অলৌকিকতা এক হয়ে মিশে গেছে অনেক আগেই। সে যখন কাঁদে, তার চোখের পানি মাটিতে পড়ার আগেই ছোট ছোট সাদা পাথরে পরিণত হয়। সেই পাথরগুলো যেন এক একটা বোবা ইশতেহার—তার হাজারো নাফরমানির খতিয়ান।
সেদিন আসমানের বুক চিরে এক চিলতে রুপালি চাঁদ উঠেছিল। রহিমুদ্দিনের মনে হলো, ওই চাঁদটা আসলে একজোড়া মায়াবী চোখ, যা কেবল তার কলুষিত হৃদয়ের দিকেই তাকিয়ে আছে। সে পাপের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে এখন এক ক্লান্ত নাবিক। তার ডাইনে পচাগলা স্মৃতির স্তূপ, বাঁয়ে অন্ধকারের দেয়াল। তার ঘরের প্রতিটি দেয়াল যেন তার গুনাহর ভারে নুয়ে পড়েছে। সে যখন হাঁটে, তার ছায়াটা তার সাথে চলতে অস্বীকার করে। ছায়াটা যেন বলে, "তোর এত পাপের বোঝা আমি বইব না।"
রহিমুদ্দিন জায়নামাজে দাঁড়াল। এক টুকরো সেলাই করা মেঘের ওপর যেন সে পা রেখেছে। সে নিয়ত বাঁধল, কিন্তু জবান দিয়ে সুরা বেরোল না। তার ঠোঁটের ডগায় মৌমাছির মতো গুঞ্জন করতে লাগল কেবল একটি শব্দ—‘আস্তাগফিরুল্লাহ’। আলহামদু-র বদলে তার বুক চিরে বেরোতে লাগল ক্ষমার আকুতি। সে যখন সুরা পড়তে চায়, তার জিহ্বায় তখন কেবল তপ্ত বালুর স্বাদ। ফেরেশতারা যেন তার মুখের শব্দগুলো কেড়ে নিয়ে সেখানে অনুতাপের নকশা এঁকে দিচ্ছে।
সে সেজদায় গেল। মাটির গভীর থেকে সে শুনতে পেল পূর্বপুরুষদের কান্নার আওয়াজ। চার রাকাতের নামাজ অথচ দুই রাকাত পড়েই সে সালাম ফিরিয়ে ফেলল। তার মনে হলো, সময়টা যেন এক জাদুকরী সুতোয় টান খেয়ে ছোট হয়ে গেছে। তার হাতের তালুতে তখন অদ্ভুত এক শীতলতা। সে সালাম ফিরিয়ে ডানে তাকাতেই দেখল, তার ঘরের কোণে রাখা পুরনো তসবিহটা একা একাই ঘুরছে। প্রতিটি দানায় যেন জিকিরের আলো ঠিকরে পড়ছে।
“হে মালিক,” রহিমুদ্দিনের কণ্ঠস্বর তখন মাঝরাতে ঝরে পড়া শিশিরের মতো কোমল। “আমি চার রাকাতের নামাজ দুই রাকাতে শেষ করছি কেন? আমি কি তবে তোমার রহমতের কাছে পৌঁছানোর জন্য খুব বেশি তাড়া করছি? নাকি আমার পাপের ভার আমাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দিচ্ছে না?”
সে আবার উঠে দাঁড়াল। তার দুপায়ে তখন লোহার শেকল নয়, বরং এক অদৃশ্য মায়ার টান। সে অনুভব করল, তার ঘরের প্রতিটি কোণ থেকে হাজার হাজার জোনাকি বেরিয়ে আসছে। সেই জোনাকিরা তার চোখের পানির সাদা পাথরগুলোকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। পাথরগুলো গলে গলে ছোট ছোট চারাগাছে রূপ নিচ্ছে। বিশ্বাসের ফুল ফুটছে সেই মরুময় হৃদয়ে। রহিমুদ্দিনের মনে হলো, সে আর এই পৃথিবীতে নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্ত নীলিমার নিচে, যেখানে কেবল মালিক আর বান্দার লুকোচুরি খেলা চলে।
“মালিক! আমি আর নিতে পারছি না,” সে আর্তনাদ করে উঠল। তার এই আর্তনাদ যেন আকাশের গায়ে একটা চওড়া ফাটল তৈরি করল। “আমি আর সহ্য করতে পারছি না এই বিরহ। তোমার বিচ্ছেদ যেন আমার কলিজায় এক বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধে আছে। তুমি আমায় তোমার দিদার দাও। আমায় টেনে নাও তোমার সিনা চিরে রাখা সেই অসীম নূরানি চাদরের নিচে।”
রহিমুদ্দিনের চোখ দিয়ে এবার পানি নয়, আলো ঝরতে শুরু করল। সে যখন দ্বিতীয়বার নামাজে দাঁড়াল, তার মনে হলো ঘরটা ক্রমে ক্রমে প্রসারিত হচ্ছে। দেয়ালগুলো অদৃশ্য হয়ে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠেছে জান্নাতি বাগিচার ঝাপসা অবয়ব। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় এখন আর গুনাহর গন্ধ নেই, আছে সিদরাতুল মুনতাহার পাতার ঘ্রাণ। সে বুঝতে পারল, তার এই দিশেহারা ভাব আসলে এক পবিত্র প্রেমাতুর দশা। মানুষ যখন সব হারিয়ে রিক্ত হয়, তখনই কেবল সেই সুউচ্চ দরজায় কড়া নাড়ার অধিকার পায়।
রহিমুদ্দিনের হাত দুটি তখন আকাশের দিকে ওড়া দুটি সাদা কবুতর। সে আর নিজেকে নিজের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছে না। তার সত্তা গলে গিয়ে মিশে যাচ্ছে আরশের নিস্তব্ধতায়। সালাম ফেরানোর সময় সে দেখল, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই জীর্ণ গাছটিতে রাতারাতি রক্তলাল গোলাপ ফুটেছে। সেই গোলাপের পাপড়িতে লেখা—‘ক্ষমা’।
রাত শেষ হয়ে আসছে। ভোরের আলো যখন ফুটল, রহিমুদ্দিনকে আর সেই ঘরে পাওয়া গেল না। জায়নামাজের ওপর পড়ে ছিল কেবল একমুঠো সুগন্ধি মাটি আর এক টুকরো প্রশান্তির ছায়া। মানুষ বলে, সে নাকি আকাশের নীলিমায় বিলীন হয়ে গেছে। আর কেউ কেউ বলে, সে এখন মালিকের সেই দিদারের সাগরে ডুব দিয়ে আছে, যেখান থেকে কেউ কোনোদিন ফিরে আসতে চায় না। ঘরজুড়ে কেবল রয়ে গেছে এক অপার্থিব নীরবতা, যা বলে দেয়—অনুশোচনার চেয়ে সুন্দর আর কোনো পথ নেই।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।