একবিংশ শতাব্দীতে মুসলিম উম্মাহর সংকট কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি একটি গভীর আদর্শিক ও ঐক্যের সংকট। একদিকে ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইয়েমেনের ওপর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, অন্যদিকে ইরানের মতো শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘ ৪৬-৪৭ বছরের অর্থনৈতিক অবরোধ। এই কঠিন সময়ে মুসলিমদের মধ্যে 'তাকফির' বা একে অপরকে কাফের ঘোষণা করার প্রবণতা একটি আত্মঘাতী ব্যাধি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেনঃ
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
"তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।" (সূরা আলে-ইমরান: ১০৩)
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য ঐক্যকে ফরজ এবং বিচ্ছিন্নতাকে হারাম করেছেন। ইমাম খামেনির মতো নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় যখন ইরান একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে, তখন কেবল মাজহাবগত পার্থক্যের কারণে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এই আয়াতের সরাসরি লঙ্ঘন।
অবরোধ ও প্রতিরোধঃ ইসলামি স্বনির্ভরতার দর্শন
ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদী অবরোধ সত্ত্বে ইমাম খামেনির নেতৃত্বে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ এবং সামরিক স্বনির্ভরতা মূলত কুরআনের এই আয়াতের প্রতিফলনঃ
وَ اَعِدُّوۡا لَهُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ وَّ مِنۡ رِّبَاطِ الۡخَیۡلِ تُرۡهِبُوۡنَ بِهٖ عَدُوَّ اللّٰهِ وَ عَدُوَّكُمۡ وَ اٰخَرِیۡنَ مِنۡ دُوۡنِهِمۡ ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَهُمۡ ۚ اَللّٰهُ یَعۡلَمُهُمۡ ؕ وَ مَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَیۡءٍ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ یُوَفَّ اِلَیۡكُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لَا تُظۡلَمُوۡنَ ﴿۶۰﴾
"তোমরা তাদের (মোকাবিলার) জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও সুসজ্জিত অশ্ব প্রস্তুত রাখ,[1] এ দিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রু তথা তোমাদের শত্রুকে সন্ত্রস্ত করবে এবং এ ছাড়া অন্যদেরকে যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ জানেন। আর আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি অত্যাচার করা হবে না।" (সূরা আনফাল: ৬০)
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তিতে ইরানের এই অগ্রগতি প্রমাণ করে যে, ঈমানি শক্তি ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে বৈশ্বিক চাপ মোকাবেলা করা সম্ভব। এটি কেবল ইরানের সাফল্য নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা।
কাউকে 'কাফের' আখ্যা দেওয়াঃ শরিয়াহর কঠিন সতর্কতা
ইমাম খামেনি বা অন্য কোনো মুসলিমকে রাজনৈতিক কারণে 'কাফের' বলা ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী অত্যন্ত গর্হিত কাজ। যারা কালেমা পাঠ করে এবং কিবলার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করে, তাদের কাফের বলা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে বলে 'হে কাফের', তবে তাদের দুজনের যে কোনো একজনের ওপর তা বর্তাবে (যদি সে কাফের না হয় তবে যে বলেছে সে নিজেই কাফের হয়ে যাবে)।" (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)
অন্যত্র রাসূল (সা.) বলেছেন, "তিনটি বিষয় ঈমানের মূল ভিত্তিঃ
১. যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তাকে কষ্ট না দেওয়া, এবং
২. কোনো পাপের কারণে তাকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার না করা,
৩. কোনো আমলের কারণে তাকে কাফের আখ্যা না দেওয়া।" (আবু দাউদ)
সুতরাং, শরিয়াহর দৃষ্টিতে ফিলিস্তিন ও ইসলামের পক্ষে লড়াই করা একজন নেতাকে কাফের বলা কেবল বোকামি নয়, বরং দ্বীনের মৌলিক নীতি লঙ্ঘনের শামিল।
ফিলিস্তিন ইস্যু ও আল-আকসার আমানত
ইরান ও ইমাম খামেনির ফিলিস্তিন নীতির ভিত্তি হলো মাজলুমের পাশে দাঁড়ানো। কুরআন মজিদে আল্লাহ বলেনঃ
وَ مَا لَكُمۡ لَا تُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ الۡمُسۡتَضۡعَفِیۡنَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَآءِ وَ الۡوِلۡدَانِ الَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَاۤ اَخۡرِجۡنَا مِنۡ هٰذِهِ الۡقَرۡیَۃِ الظَّالِمِ اَهۡلُهَا ۚ وَ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ وَلِیًّا ۚۙ وَّ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ نَصِیۡرًا ﴿ؕ۷۵﴾
"তোমাদের কী হলো যে তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করছ না সেই অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য যারা প্রার্থনা করছে—হে আমাদের রব! আমাদের এই অত্যাচারীদের জনপদ থেকে উদ্ধার করুন।" (সূরা নিসা: ৭৫)
খামেনির এই অবস্থানকে অস্বীকার করা মানে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রধান শক্তিকে দুর্বল করা, যা পরোক্ষভাবে ইসলামের শত্রুদেরই সহযোগিতা করা।
বিভেদ ও দুর্বলতা: কুরআনি হুঁশিয়ারি
অভ্যন্তরীণ বিভেদকে আল্লাহ তায়ালা আযাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেনঃ
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَهْبَ ذِيحُكُمْ
"তোমরা পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া করো না, করলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রভাব (বাতাস) বিলুপ্ত হবে।" (সূরা আনফাল: ৪৬)
বর্তমান পৃথিবীতে মুসলিমদের দুর্বলতার প্রধান কারণ হলো অভ্যন্তরীণ বিবাদ। শিয়া-সুন্নি বা আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণেই আমেরিকা ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে ছড়ি ঘোরাতে পারছে। এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, বিবাদ করলে মুসলিমদের 'বাতাস' বা প্রভাব নষ্ট হয়ে যাবে।
আজ আমেরিকা ও ইসরায়েল যে মুসলিমদের সম্পদ দখল করতে পারছে, তার প্রধান কারণ আমাদের অনৈক্য। রাসূল (সা.) মুসলিম উম্মাহকে একটি দেহের সাথে তুলনা করেছেন। দেহের এক অঙ্গে আঘাত লাগলে যেমন পুরো শরীর ব্যাথা পায়, তেমনি ইরানের ওপর অবরোধ বা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা পুরো উম্মাহরই সংকট।
উত্তরণের পথঃ 'একক প্ল্যাটফর্ম' ও ভ্রাতৃত্ব
উম্মাহর উন্নতির জন্য ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো প্রধান দেশগুলোকে রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে কুরআনের এই ঘোষণার ওপর ঐক্যবদ্ধ হতে হবেঃ
اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ اِخۡوَۃٌ فَاَصۡلِحُوۡا بَیۡنَ اَخَوَیۡكُمۡ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ ﴿۱۰﴾
"নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।" (সূরা হুজুরাত: ১০)
ইমাম খামেনির মতো নেতাদের ওপর ধর্মীয় তকমা দিয়ে বিভেদ তৈরি করা মূলত মুসলিম উম্মাহর পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করছে। বর্তমান নাজুক অবস্থায় তাকফিরি মানসিকতা পরিহার করে বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া আজ আমাদের ওপর অর্পিত ইবাদত। অন্যথায়, আমরা কেবল শত্রুর কাছেই লজ্জিত হবো না, বরং কিয়ামতের ময়দানেও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।