শহরের এক কোণে অবস্থিত ছিমছাম, আভিজাত্যে ঘেরা একটি ক্যাফে—'দ্য ব্লু লোটাস'। ক্যাফেটির ভেতরে আলো-আঁধারির এক রহস্যময় খেলা। মৃদু ভলিউমে বাজছে এক যান্ত্রিক সুর, যা মানুষের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সাফওয়ান ক্যাফের একদম পেছনের দিকের একটি টেবিলে বসে আছে। তার মাথায় ক্যাপ, চোখে কালো চশমা—যেন কেউ তাকে চিনে না ফেলে। একজন বিখ্যাত নাশিদ শিল্পী হিসেবে তার এই সতর্কতা স্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু সাফওয়ান জানে এই লুকোচুরি আসলে তার নিজের বিবেকের কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা।
স্মার্টফোনের মায়াবী কারাগার
সাফওয়ানের সামনে রাখা স্মার্টফোনটির স্ক্রিন বারবার জ্বলে উঠছে। সেই নীল আলো সাফওয়ানের মুখে এক ভৌতিক আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই নীল আলো কেবল চোখের ক্ষতি করে না, এটি যেন ধীরে ধীরে হৃদয়ের গভীরতম কোণে জমে থাকা আল্লাহর ভয়কেও ফিকে করে দেয়। সাফওয়ান দেখল সাহেলার মেসেজ—"আমি পার্কিংয়ে। আসছি।"
সাফওয়ানের হাত সামান্য কাঁপছে। সে কি পারবে এই টেবিল ছেড়ে উঠে চলে যেতে? সে কি পারবে এই মরীচিকাকে বিদায় জানিয়ে আবার সেই জায়নামাজে ফিরতে? ইয়াসমিন মুজাহিদ একবার লিখেছিলেন—"হৃদয় যখন আল্লাহর বদলে অন্য কিছু দিয়ে পূর্ণ হয়, তখন সেখানে প্রশান্তি নয়, বরং এক অশান্ত দহন শুরু হয়।" সাফওয়ান সেই দহন অনুভব করছে, কিন্তু তার নফসের তৃষ্ণা তাকে আটকে রেখেছে।
সাহেলার প্রবেশঃ এক নিষিদ্ধ সুবাস
ক্যাফের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল সাহেলা। পরনে দামী সিল্কের আবায়া, চোখেমুখে এক আভিজাত্যের ছাপ। সে যখন সাফওয়ানের টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছে, সাফওয়ানের মনে হলো এক ঝোড়ো হাওয়া তার দীর্ঘদিনের তৈরি করা 'ধার্মিকতার দুর্গ' ভাসিয়ে দিচ্ছে, ধসিয়ে দিচ্ছে। সাহেলার সুগন্ধিটা তীব্র—যা কোনো পর্দানশীন নারীর সাজের সাথে মানায় না। এটি যেন এক ইশারা, এক হাতছানি।
সাহেলা বসেই মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো পবিত্রতা নেই, আছে কেবল এক গভীর আসক্তি। "অনেক দেরি করে ফেললাম, তাই না? আসলে ঘর থেকে বের হওয়াটা এখন বড় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে," সাহেলা বলল।
সাফওয়ান কোনোমতে উত্তর দিল, "না, ঠিক আছে। আমিও তো কেবল এলাম।"
কথার জালে বন্দী ইমান
তাদের কথোপকথন শুরু হলো। অদ্ভুতভাবে, সাহেলা বারবার দ্বীনি প্রসঙ্গের আড়ালে নিজের একাকীত্বের কথা বলতে লাগল। পরকিয়ার এই এক বড় কৌশল—সেখানে নিজেকে খুব অসহায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সাহেলা বলছে তার স্বামী কীভাবে তাকে বোঝে না, কীভাবে সে দ্বীন পালন করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়।
সাফওয়ান মুগ্ধ হয়ে শুনছে। তার মনে হচ্ছে সে যেন একজন বড় উদ্ধারকর্তা। সে সাহেলাকে 'সান্ত্বনা' দেওয়ার ছলে এমন সব কথা বলছে, যা কেবল তার স্ত্রী মরিয়মের প্রাপ্য ছিল। শয়তান এখানে খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করছে। সে সাফওয়ানকে বোঝাচ্ছে যে, সে তো কোনো পাপ করছে না, সে তো কেবল একজন মানুষের 'মানসিক সেবা' করছে।
কিন্তু সাফওয়ানের অবচেতন মন বারবার বলছে—"সাফওয়ান, তুমি কি ভুলে গেছ সেই হাদিস? যেখানে বলা হয়েছে, যখনই একজন পুরুষ আর একজন নারী নির্জনে মিলিত হয়, তখন তাদের মধ্যে তৃতীয়জন হয় শয়তান।"
ক্যাফের বাইরে তখন আকাশ মেঘলা হয়ে এসেছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকালো। ক্যাফের বড় বড় জানালার ওপারে দেখা যাচ্ছে রাজপথের ব্যস্ততা। মানুষ ছুটছে যার যার গন্তব্যে। সাফওয়ান ভাবছে, তার গন্তব্য কোথায়? এই টেবিলের এই নীল আলোর মায়ায় সে কি তার আখেরাতকে বিক্রি করে দিচ্ছে?
ক্যাফের কাঁচের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। প্রতিটি ফোঁটা যেন এক একটি কান্নার শব্দ। সাফওয়ানের মনে হলো, এই বৃষ্টি যেন তাকে ধুয়ে দিতে চাইছে, কিন্তু সে নিজেকে এক অদৃশ্য শিকলে বেঁধে ফেলেছে। সাহেলার চোখের দিকে তাকালে সে তার স্ত্রীর সেই সরল, পবিত্র চোখের চাহনি ভুলে যায়। এটিই পরকিয়ার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি—এটি মানুষের দেখার দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
একটি কম্পন
সাহেলা হঠাৎ সাফওয়ানের হাতের ওপর হাত রাখল। সাফওয়ান চমকে উঠল, যেন কোনো বৈদ্যুতিক শক খেয়েছে। তার শরীরের প্রতিটি লোম দাঁড়িয়ে গেল। এটি সেই স্পর্শ, যা তার জন্য হারাম। ঠিক সেই মুহূর্তে সাফওয়ানের ফোনটি আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—'মরিয়ম কলিং'।
সাফওয়ানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে দেখল সাহেলা তার দিকে এক রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, আর ফোনের স্ক্রিনে মরিয়মের নামটা ক্রমাগত কাঁপছে। একপাশে তার সাজানো সংসার, তার সম্মান, তার ইমান; আর অন্যপাশে এই নীল আলোর মায়া, এই নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ।
সাফওয়ান কি ফোনটা ধরবে? নাকি সাহেলার হাতটি আরও শক্ত করে ধরবে? এই এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত হয়তো তার পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। সে বুঝতে পারল, সে আসলে কোনো মানুষের সাথে নয়, সে তার নিজের স্রষ্টার সাথে যুদ্ধ করছে। আর আল্লাহর সাথে যুদ্ধে জেতার সাধ্য কার আছে?
সে রহস্য ভেদ করতে হলে পড়ুন পরবর্তী পর্ব।
["কল্পনার তুলিতে আঁকা এই কাহিনীর প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনা একান্তই কাল্পনিক। ইতিহাসের কোনো পাতা বা বাস্তবের কোনো মানুষের ছায়ার সাথে এর কোনো যোগসূত্র নেই। কোনো মিল পাওয়া গেলে তা লেখকের অনিচ্ছাকৃত এবং নিছক কাকতালীয় ঘটনা মাত্র।"]
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।