রক্তিম সূর্যাস্তের তসবিহঃ একটি শাহাদতের মহাকাব্য

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

 

রক্তিম সূর্যাস্তের তসবিহঃ একটি শাহাদতের মহাকাব্য

আকাশের নীলিমা আজ যেন একটু বেশিই ফিকে ছিল। তেহরানের আলবোরজ পর্বতমালায় কি মেঘ জমেছিল, নাকি ওটা ছিল আরশের ফেরেশতাদের দীর্ঘশ্বাস? মিসাম তাইয়ার কিছুই জানত না। সে তখন যান্ত্রিকতার এক নিপুণ বন্দি। অফিসের ফাইলের স্তূপ, কিবোর্ডের খটখট শব্দ আর সাংসারিক দেনা-পাওনার গোলকধাঁধায় তার রুহ্ যেন এক ধুলোমাখা আয়না হয়ে পড়েছিল। দুনিয়ার এই তুচ্ছ কোলাহলে সে এতটাই মগ্ন ছিল যে, বাতাসের হাহাকার তার কানে পৌঁছায়নি।

মিজান স্যারের কেবিনের দরজায় যখন সে নক করল, তখনো সে জানত না—এক মহাজাগতিক শোকের ছায়া তার দরজায় কড়া নাড়ছে। মিজান স্যার মুখ তুললেন। তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা, যেন কোনো অতলান্ত সাগরের তলদেশ।

"মিসাম, ইমাম আলী খামেনেয়ী শাহাদত বরণ করেছেন।"

মিসাম তাইয়ার থমকে দাঁড়াল। সময় কি থমকে গেল? নাকি দেয়ালঘড়ির কাঁটাগুলো উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল? সে অস্ফুট স্বরে বলল, "জি? কি বললেন?" মিজান স্যার আবারও বললেন, "আমাদের নেতা আর নেই। লৌহ মানব মুসলিম জাহানের কন্ঠস্বর ইমাম আলী খামেনয়ী আর নেই। তাকে শহীদ করা হয়েছে।" মিসাম তাইয়ারের মস্তিষ্ক যেন এক নিরেট পাথর। সে তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করল, "কে? কার কথা বলছেন?"

আসলে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। যে মানুষটি ছিল উম্মাহর হিমালয়, যার তর্জনীর ইশারায় বাতিলের প্রাসাদ কেঁপে উঠত, তিনি কি এভাবে চলে যেতে পারেন? মিসামের মনে হলো, সূর্য যদি আজ পশ্চিম দিকে উদিত হতো, তবে হয়তো সে বিশ্বাস করত; কিন্তু এই সংবাদ—এ যে কালবৈশাখীর চেয়েও ভয়ংকর। সে দ্রুত পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। তার মনে হলো অফিসের অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছে। প্রতিটি কলাম, প্রতিটি চেয়ার, প্রতিটি ডেস্ক যেন তাকে উপহাস করছে।

সে করিডোরে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী ফিজ্জা তাইয়ারকে ফোন করল। ওপাশ থেকে ফিজ্জার কণ্ঠ পেতেই মিসামের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে বলতে চাইল, "ফিজ্জা, আমরা এতিম হয়ে গেছি।" কিন্তু শব্দগুলো গলায় এসে দলা পাকিয়ে গেল। কান্নার নোনা স্বাদ তার জিহ্বায়। সে কথা বলতে পারল না। ওপাশে ফিজ্জার ব্যাকুল কণ্ঠস্বর ডুবে গেল মিসামের রুদ্ধশ্বাসে। সে ফোনটা কেটে দিল।

অফিসের এই চার দেয়ালের মাঝে মিসাম বরাবরই এক নিঃসঙ্গ মুসাফির। তার সেজদাহ্, তার তসবিহ্—এসবই কলিগদের কাছে এক রহস্যময় আদিখ্যেতা। সে জানে, এই মুহূর্তে তার চোখের জল যদি কেউ দেখে ফেলে, তবে তারা সেটাকে 'উগ্র আবেগ' বলে দাগিয়ে দেবে। সে এক কঠিন পাথর হয়ে নিজের ডেস্কে ফিরে গেল। আঙুলগুলো কিবোর্ডে চলছে, কিন্তু তার আত্মা তখন কারবালার সেই তপ্ত বালুচরে ইমাম হোসেনের (আ.) জিলহজ মাসের শেষ বিদায়ের স্মৃতি হাতড়াচ্ছে। হৃদয়ে তোলপাড় ইয়া হুসাইন!! ইয়া হুসাইন!!

যোহরের আজান যখন কানে এল, মিসাম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে মুছল্লায় গিয়ে দাঁড়াল। আল্লাহু আকবার... তাকবির বলার সাথে সাথে তার মনে হলো, সারা বিশ্বের মজলুম মানুষের হাহাকার তার কাঁধে এসে চেপেছে। সূরা ফাতেহা শুরু করল সে— "আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন..."। কিন্তু একি! শব্দগুলো বের হচ্ছে না। তার কণ্ঠনালী রুদ্ধ। আক্ষরিক অর্থেই তার চোখ থেকে অশ্রু নয়, যেন তার অস্তিত্বের প্রতিটি কণা গলে গলে পড়ছে। সে যখন সেজদাহয় গেল, তার মনে হলো এই কার্পেট নয়, সে যেন ইমামের পবিত্র রক্তের ওপর মাথা রেখেছে।

ইহুদিবাদী জাওনিষ্ট ই-জরা/ইল আর আগ্রাসী আমে/রি-কার এই পৈশাচিক হামলায় শুধু একজন মানুষ নিহত হননি, বরং নিহত হয়েছে এক যুগের বিবেক। আকাশ থেকে যখন সেই অগ্নিবৃষ্টি ঝরছিল, তখন কি আরশের মালিক দেখছিলেন না? অবশ্যই দেখছিলেন। মিসামের মনে পড়ল, আহলে বায়তের সেই মহান ঐতিহ্য—যেখানে শাহাদত মানে পরাজয় নয়, বরং মাবুদের সাথে মিলনের এক পরম বাসর।

সেজদাহ্ থেকে মাথা তুলে মিসাম দেখল, তার তসবিহ্ দানাগুলো যেন একেকটি নক্ষত্রের মতো জ্বলছে। ইরানের সেই পবিত্র মাটি, যেখানে হাজারো বীরের রক্ত মিশে আছে, সেখান থেকে এক সুবাস ভেসে আসছে। মিসাম বুঝতে পারল, এই শাহাদত বিফলে যাবে না।

হে আরশের অধিপতি! তুমি এই মহান ইমামের রক্তকে ইসলামের বিজয়ের সোপান করে দাও। মাটির ওপর হয়তো শয়তানের তান্ডব চলে, কিন্তু চূড়ান্ত বিজয়ের ফয়সালা তো আসমানে লেখা হয়ে গেছে অনেক আগেই। জালিমের অহংকার চূর্ণ হবেই, কারণ শহীদের রক্ত বৃথা যায় না—তা তো উম্মাহর ধমনীতে ঈমানের জোয়ার হয়ে ফিরে আসে।

নামাজ শেষে মিসাম যখন চোখ মুছল, তার ভেতরে এক অলৌকিক প্রশান্তি নেমে এল। দুঃখ আছে, কিন্তু সেই দুঃখের ওপর লেপন করা আছে 'রেজা বিল কাযা' বা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টির প্রলেপ। বাইরের পৃথিবীটা আগের মতোই আছে, কিন্তু মিসাম তাইয়ার এখন অন্য এক মানুষ। সে জানে, তার নেতা হারাননি, তিনি এখন সিদরাতুল মুনতাহার ছায়াতলে এক চিরস্থায়ী মুচকি হাসি হাসছেন।

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default