অস্তিত্বের হিমঘর । উপন্যাস। পর্বঃ ৮ মধ্যবিত্তের ডাইনিং টেবিল

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0
অস্তিত্বের হিমঘর । উপন্যাস।

সকালের আলোটা ঠিক উজ্জ্বল হয়ে ফুটল না। কুয়াশার ধোঁয়াটে চাদর চুইয়ে যেটুকু রোদ ঘরের ভেতর ঢুকেছে, তা কেবল ধুলিকণাগুলোকে স্পষ্ট করে তুলেছে। ডাইনিং টেবিলের ওপর সস্তা প্লাস্টিকের দস্তরখান। তার ওপর তিনটে থালা। মাঝখানে এক বাটি পাতলা ডাল আর কয়েকটা ভাজা শুকনো মরিচ।
জাফর চুপচাপ ভাতে হাত দিয়েছে। তার উল্টো দিকে নীলা বসেছে। গতরাতের সর্দিভাবটা কেটে গেছে ওর, কিন্তু মুখের ওপর যে গুমোট মেঘ জমে আছে, তার প্রতিকার কোনো ওষুধে নেই। সে চামচ দিয়ে প্লেটে শব্দ করে ভাত মাখছে—এ এক ধরণের নীরব যুদ্ধঘোষণা।
বাবার আসনটা এখনো খালি। ঘর থেকে তাঁর মৃদু পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। একটু পরেই তিনি লাঠি ভর দিয়ে অতি সাবধানে ডাইনিং স্পেসে এলেন। তাঁর পিঠটা আজ যেন আরও বেশি কুঁজো। জাফরের দিকে তাকাতে গিয়েও তিনি চোখ নামিয়ে নিলেন। গতরাতের সেই কাশি চেপে রাখার ব্যর্থতা তাঁকে আজ ভীষণ লজ্জিত আর কুণ্ঠিত করে রেখেছে।
"বাবা, বসো।" জাফর মৃদুস্বরে বলল।
বাবা বসলেন। কিন্তু তিনি থালাটা টেনে নেওয়ার আগেই নীলা কথা বলে উঠল। ওর গলার স্বরটা ধারালো ছুরির মতো বাতাসের নিস্তব্ধতা চিরে দিল।
"আজকাল রাতের বেলা বাজারেও কি কাশির সিরাপ পাওয়া যায় না?" নীলা জাফরের দিকে না তাকিয়েই সরাসরি আক্রমণ করল। "নাকি ওটাও আমার সর্দি হওয়ার মতো সামান্য কোনো বিষয় বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে?"
বাবার হাতটা থালার ওপরেই স্থির হয়ে গেল। তিনি অপরাধীর মতো নিচু গলায় বললেন, "বউমা, জাফররে আমিই না করছি। আমি ঠিক আছি, শুধু একটু বুকটা ভার হইয়া আছে..."
"বুক ভার হয়ে আছে সেটা বুঝলাম বাবা," নীলা এবার সরাসরি শ্বশুরের দিকে তাকাল। "কিন্তু সেই ভার যখন পাশের ঘরে ড্রিল মেশিনের মতো শব্দ করে, তখন তো আমাদের বুকটাও ধড়ফড় করে। কাল সারারাত আমি এক ফোঁটা ঘুমাতে পারিনি। আজ অফিসে যদি আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাই, তখন কি ওষুধে কাজ হবে?"
জাফর ভাতের গ্রাসটা মুখে দিতে গিয়ে থেমে গেল। তার মনে হলো ভাতগুলো কাঁচের টুকরো হয়ে গলার কাছে আটকে গেছে। সে একবার নীলার দিকে তাকাল। নীলার চোখে কোনো মমতা নেই, আছে কেবল এক ধরণের অধিকারবোধের নিষ্ঠুরতা।
"নীলা, আমি আজ বিকেলে বাবার জন্য সিরাপ নিয়ে আসব।" জাফর খুব নিচু স্বরে বলল। "কাল রাতে সব দোকান খোলা ছিল না।"
"টাকা আছে তো?" নীলা টিটকারি দিয়ে হাসল। "নাকি কাল আমার ওষুধের পেছনেই সব শেষ হয়ে গেছে? থাকলে তো ভালো। আর যদি না থাকে, তবে তোমার ওই দামী স্মার্টফোনটা বাজারে নিয়ে যেও। ওটা বেচলেও দু-চার ফাইল সিরাপ হবে।"
বাবার চোখের কোণে এক ফোঁটা পানি চিকচিক করে উঠল। তিনি তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালেন।
"আমি খাইছি। পেটটা ভরে গেছে।"
তিনি থালাটা যেমন ছিল তেমনই রেখে ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। জাফর দেখল বাবার প্লেটে এক লোকমা ভাতও কমেনি। তিনি কেবল অপমানের বোঝাটা নিয়ে নিজের কামরায় ফিরে গেলেন।
"খাবারটা নষ্ট করার কী মানে?" নীলা নির্বিকারভাবে ডাল দিয়ে ভাত মাখতে লাগল। "আমি কি মিথ্যা কিছু বলেছি? এই ঘরে কি কারোরই শান্তি পাওয়ার অধিকার নেই?"
জাফর হঠাৎ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার ইচ্ছা করছিল টেবিলটা ওল্টাতে, চিৎকার করে বলতে— 'তুমি কি জানো ওই মানুষটা তোমার জন্য কতটা স্যাক্রিফাইস করেছে?' কিন্তু সে কিছুই করতে পারল না। তার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে।
সে কেবল জগ থেকে এক গ্লাস পানি খেল। ঠান্ডা পানিটা গলায় নামার সময় তার মনে হলো, সে আসলে পানি নয়, নিজেরই আত্মসম্মানটা গিলে ফেলছে। মধ্যবিত্তের এই ডাইনিং টেবিলটা আসলে একটা মঞ্চ, যেখানে প্রতিদিন ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার সমাধি ঘটে। আর জাফর সেই সমাধির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক নিরুপায় প্রহরী।
সে যখন বাজারের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখন পেছন থেকে নীলার গলা আবার ভেসে এল, "আসার সময় মনে করে একটু মিষ্টি নিয়ো এসো তো। মুখটা তিতা হয়ে আছে।" জাফর জবাব দিল না। সে অন্ধকারের সেই হিমের দিকেই ফিরে যেতে চাইল, যেখানে অন্তত বাবার নীরবতা আছে, নীলার এই বিষাক্ত বাক্যবাণ নেই।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default