
ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে সত্য ও মিথ্যার লড়াই চলেছে চিরন্তন। তবে বর্তমান সময়ের ট্র্যাজেডি হলো, শত্রু এখন বাইরে নয়, বরং ছদ্মবেশে আমাদের ভেতরেই আসন গেড়েছে। যখন একজন ইহুদি গোয়েন্দা 'আবু হাফস' নাম ধারণ করে কোরআনের হাফেজ হয়, হাজার হাজার হাদিস মুখস্থ করে এবং লিবিয়ার মতো মুসলিম ভূখণ্ডে উগ্রবাদী গোষ্ঠী ‘আইএস’ (ISIS) প্রতিষ্ঠা করে ইমামতি করে—তখন বুঝতে হবে ইসলামি উম্মাহ এক ভয়াবহ মেধা-যুদ্ধের (Intellectual Warfare) সম্মুখীন। এটি কেবল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নয়, বরং মুসলিমদের ঈমান ও ঐক্য ধ্বংস করার এক গভীর আধ্যাত্মিক বিপর্যয়।
কুরআনে মোনাফেকদের স্বরূপ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে এই ধরনের ছদ্মবেশীদের চরিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَىٰ مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ أَلَدُّ الْخِصَامِ
(সূরা আল-বাকারাহঃ ২০৪)
অনুবাদঃ
"মানুষের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে, পার্থিব জীবনের বিষয়ে যার কথাবার্তা তোমাকে মুগ্ধ করে এবং সে নিজের মনের কথার ওপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখে, অথচ সে চরম কলহপ্রিয় শত্রু।"
এই আয়াতের গূঢ় অর্থ হলো, কেবল বাহ্যিক জুব্বা, পাগড়ি বা সুললিত কণ্ঠে মোহিত হওয়া মুমিনের কাজ নয়। শয়তান যেমন ইবাদতের লেবাস ধরে ধোঁকা দিয়েছিল, তেমনি বর্তমানের ‘আবু হাফস’রা ইসলামের পরিভাষা ব্যবহার করেই ইসলামকে জবাই করে। এদের অন্তরে থাকে হিংসা ও বিভেদ, কিন্তু মুখে থাকে দ্বীনের বুলি। আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি বা ‘তাজকিয়া’ ছাড়া কেবল তথ্য মুখস্থ করা যে শয়তানেরই বৈশিষ্ট্য, এই আয়াত তারই প্রমাণ।
হাদিসের আলোকে শেষ জামানার ফিতনা
রাসূলুল্লাহ (সা.) আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে এই সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের খবর দিয়ে গেছেন। সাহাবায়ে কেরামদের ইবাদতের চেয়েও যাদের ইবাদত বাহ্যিকভাবে বেশি মনে হবে, অথচ তাদের ঈমান হবে অন্তঃসারশূন্য।
سَيَخْرُجُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ قَوْمٌ أَحْدَاثُ الأَسْنَانِ سُفَهَاءُ الأَحْلاَمِ يَقُولُونَ مِنْ خَيْرِ قَوْلِ الْبَرِيَّةِ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لاَ يُجَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ
(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
অনুবাদঃ
"শেষ জামানায় এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা হবে অল্পবয়স্ক এবং নির্বোধ। তারা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কথা (কুরআন ও হাদিস) বলবে। তারা কুরআন পড়বে ঠিকই, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না (অন্তরে প্রবেশ করবে না)।"
মোসাদ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ঠিক এই পদ্ধতিই অনুসরণ করছে। তারা এমন ব্যক্তিদের তৈরি করছে যারা তাত্ত্বিকভাবে মেধাবী, কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে মৃত। তারা শিয়া-সুন্নি, আরব-অনারব এবং বিভিন্ন মাযহাবি দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়ে মুসলিমদের একে অপরের রক্ত ঝরানোকে জায়েজ করে তুলছে। তাদের জুব্বা ও কপালের সেজদার চিহ্ন দেখে সাধারণ মানুষ ধোঁকা খাচ্ছে, অথচ তাদের মিশন হলো ইসলামের প্রাণশক্তিকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাওয়া।
সত্য চেনার কষ্টিপাথর
মাওলা আলী (আ.)-এর একটি অমর বাণী এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলতেন, "মানুষ দেখে সত্যকে চিনো না, বরং সত্যকে জানো তাহলে সত্যবাদীকে চিনতে পারবে।" আজ আমরা ব্যক্তিকে দিয়ে সত্য বিচার করি বলেই মোসাদ এজেন্টরা মুফতি, আল্লামা, উলামা বা শায়েখ সেজে আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারছে।
আহলুল বাইয়েতের ইমামগণ সবসময় উম্মাহর ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলতেন, জ্ঞান হলো একটি নূর যা আল্লাহ মুমিনের হৃদয়ে স্থাপন করেন। কেবল তথ্য বা কিতাব মুখস্থ করা জ্ঞান নয়। লিবিয়ার সেই আবু হাফস বা আজকের ছদ্মবেশী এজেন্টদের মস্তিষ্ক তথ্যে ঠাসা থাকতে পারে, কিন্তু তাদের হৃদয়ে খোদাভীতির সেই 'নূর' নেই।
সুফি দর্শনে একে বলা হয় 'সুফিয়ায়ে খাম' বা কাঁচা সুফি এবং 'উলামায়ে সূ' বা মন্দ আলেম। হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) তার 'ফুতুহুল গায়ব' গ্রন্থে বারবার সতর্ক করেছেন যে, দাজ্জালি শক্তি সবসময় দ্বীনের লেবাস পরে আসবে। তারা মুসলমানদের গাঁধা বানানোর জন্য তাদের আবেগকে ব্যবহার করবে। তারা ধনী-গরিব ও আভিজাত্যের বিভেদ তৈরি করে মুসলিমদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের ব্যর্থতা
বাংলাদেশে আজ যে ধর্মীয় মেরুকরণ আমরা দেখছি, এর পেছনে কি কেবলই মতপার্থক্য? নাকি পর্দার আড়ালে কোনো বড় শক্তি কাজ করছে? যখন একজন আলেম অন্য আলেমকে বিদাতী বা কাফের বলে ফতোয়া দেয়, যখন ছোটখাটো বিষয়ে সমাজকে বিভক্ত করা হয়, তখন রাসুলের (সা.) সেই সতর্কবাণী মনে পড়ে যায়—"আলেমরা হবে আসমানের নিচে নিকৃষ্ট জীব, যদি তারা ইলমকে দুনিয়াবি স্বার্থে ব্যবহার করে।"
মোসাদ বা কোনো গোয়েন্দা সংস্থা আপনাকে তখনই গাঁধা বানাতে পারবে যখন আপনার মধ্যে 'বাসিরাত' বা অন্তর্দৃষ্টি থাকবে না। আমরা যদি কেবল লেবাস দেখে মুরিদ হই এবং চিন্তাশক্তি বন্ধ করে দিই, তবে এটা আমাদেরই ব্যর্থতা। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে দলিলে বিশ্বাস করতে, কোনো ব্যক্তির জাদুকরী বক্তব্যে নয়।
হে উম্মাহর সন্তানরা! জেগে ওঠার সময় এখনই। কেবল লম্বা দাড়ি, লম্বা টুপি আর জুব্বা বা সুন্দর তিলওয়াতই একজন মানুষের হকের মাপকাঠি হতে পারে না। যে আলেম বা শায়খ উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, যে মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়ায় এবং যে সত্যের চেয়ে ব্যক্তিপূজাকে বড় করে দেখে—সে যে-ই হোক না কেন, তার পেছনে কোনো অশুভ শক্তির ইশারা থাকা অসম্ভব নয়।
আসুন, আমরা রুমি ও জিলানীর সেই আধ্যাত্মিকতায় ফিরে যাই যেখানে 'ইশক' (প্রেম) ও 'আকল' (বিবেচনা)-এর মিলন ঘটে। অন্তরের আয়না পরিষ্কার করুন, যেন সেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য ধরা পড়ে। মনে রাখবেন, আল্লাহ আমাদের জ্ঞান দিয়েছেন সত্য চেনার জন্য, অন্ধভাবে কারো গোলামি করার জন্য নয়। ফিতনার এই যুগে আপনার সবচেয়ে বড় ঢাল হলো আপনার 'তাকওয়া' এবং 'ঐক্য'। শত্রু আমাদের বিভক্ত করে শাসন করতে চায়, আর আমাদের ধর্ম আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজয় লাভ করতে শেখায়।
(এই লেখাতে ব্যবহৃত ছবি প্রতীকী, এই ছবির সাথে যদি কারো কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় তবে তা নিতান্তই কাকতালীয়)
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।