তাকদির ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলঃ মুমিনের অবিচল আশ্রয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

তাকদির ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলঃ মুমিনের অবিচল আশ্রয়

সৃষ্টিজগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু এক মহান সত্তার ইশারায় আবর্তিত হচ্ছে। মানুষের জীবন
, তার সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি কোনোটিই আকস্মিক নয়। বরং এক মহাজাগতিক পরিকল্পনার অংশ। দুনিয়ার সব মানুষ একত্রিত হয়েও কারো বিন্দুমাত্র উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না, যদি না আসমানের মালিকের ফয়সালা থাকে। এই বিশ্বাসই হলো 'তাকদির'এটি কেবল একটি আকিদা নয়, বরং অন্তরের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক মুক্তির একমাত্র পথ। যখন একজন বান্দা বুঝতে পারে যে তার জীবনের চাবিকাঠি কোনো মানুষের হাতে নেই, তখন সে সৃষ্টির গোলামি থেকে মুক্তি পেয়ে স্রষ্টার প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়

তাকদিরের অমোঘ বিধান ও কুরআনিক দলিল

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মহাবিশ্বের সবকিছুর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন। কোনো শক্তিই তাঁর ইচ্ছার বাইরে কাজ করতে সক্ষম নয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছেঃ

وَمَا تَشَاؤُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

(সূরা আত-তাকভীরঃ ২৯)

অনুবাদঃ "তোমরা যা চাও তা হবে না, যতক্ষণ না জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তা চান।"

এই আয়াতটি বান্দার অহম বা 'নাফস'কে চূর্ণ করে দেয়। মানুষ যখন মনে করে সে নিজেই সব করতে পারে, তখন সে পথভ্রষ্ট হয়। কিন্তু যখন সে অনুভব করে যে তার প্রতিটি নিঃশ্বাস এবং ইচ্ছা মহান আল্লাহর ইচ্ছার অধীন, তখন তার হৃদয়ে প্রকৃত 'ফানা' বা আল্লাহর সত্তায় বিলীন হওয়ার ভাব তৈরি হয়। জগতের সব উপকার বা ক্ষতির মাধ্যম কেবল উসিলা মাত্র, মূল উৎস হলেন স্বয়ং আল্লাহ

ইবনে আব্বাসের (রা.) প্রতি নসিহত

তাকদিরের এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বিখ্যাত হাদিসে। তিনি তাঁর প্রিয় সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রদান করেছিলেন

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেনঃ

وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلاَّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ وَلَوِ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلاَّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ رُفِعَتِ الأَقْلاَمُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ

(সুনানে তিরমিজিঃ ২৫১৬)

অনুবাদঃ "জেনে রেখো, যদি সমস্ত উম্মত (জাতি) তোমার কোনো উপকার করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে তারা তোমার ততটুকুই উপকার করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি তারা সবাই মিলে তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায়, তবে তারা ততটুকুই ক্ষতি করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার ভাগ্যে লিখে রেখেছেন। কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং খাতা শুকিয়ে গেছে।"

এই হাদিসটি মুমিনের হৃদয়ে এক অভয়বাণী। এটি আমাদের শেখায় যে, দুনিয়ার ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের রক্তচক্ষু বা কৃপা কোনোটাই চূড়ান্ত নয়। চূড়ান্ত ফয়সালা কেবল আরশ থেকে আসে। কলম শুকিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহর জ্ঞান ও পরিকল্পনা অনাদি এবং অপরিবর্তনীয়

আহলুল বাইয়েতের (আ.) দৃষ্টিকোণ ও ধৈর্য

আহলুল বাইয়েত বা নবী-পরিবারের সদস্যগণ ছিলেন তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকার মূর্ত প্রতীক। মাওলা আলী (আ.)-এর একটি প্রসিদ্ধ বাণী রয়েছেঃ "যদি তুমি তাকদিরের ওপর ধৈর্য ধরো, তবে তুমি পুরস্কার পাবে এবং তাকদির তার কাজ করে যাবে। আর যদি তুমি অধৈর্য হও, তবে তাকদির তবুও তার কাজ করে যাবে, কিন্তু তুমি গুনাহগার হবে।"

কারবালার ময়দানে ইমাম হুসাইন (আ.) যখন তাঁর পরিবারের সদস্যদের একে একে বিদায় দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর মুখে অভিযোগ ছিল না। বরং তিনি বলছিলেন, "رضاً بقضائك" অর্থাৎ—হে আল্লাহ! তোমার ফয়সালার ওপর আমি সন্তুষ্ট। এটিই হলো 'তাজকিয়াতুন নাফস' বা নফসের সর্বোচ্চ স্তর। দুনিয়ার সব মানুষ মিলে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ক্ষতি করতে চেয়েছিল, তারা হয়তো তাঁর পার্থিব জীবন কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু তারা তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদা এক চুলও কমাতে পারেনি। বরং আল্লাহ যা লিখে রেখেছিলেন, সেই শাহাদাতের মাধ্যমেই তিনি কিয়ামত অবধি অমর হয়ে রইলেন

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলতেন, "আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা) হলো এমন এক দুর্গ, যা কোনো শত্রু ভেদ করতে পারে না।" যখন বান্দা নিজেকে আল্লাহর সোপর্দ করে দেয়, তখন সমগ্র সৃষ্টির ভয় তার অন্তর থেকে মুছে যায়

ইশক ও সমর্পণ

সুফি সম্রাট মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.)-এর মতে, তাকদির হলো প্রেমিকের জন্য তার মাহবুবের (আল্লাহর) পক্ষ থেকে পাঠানো উপহার। তিনি তাঁর 'মসনবী'তে শিখিয়েছেন যে, যদি তোমার গায়ে কাঁটা ফোটে, তবে জানবে এটি তোমার প্রিয়তমের ইচ্ছা। আর যদি সেই কাঁটাকে তুমি ফুল হিসেবে গ্রহণ করতে পারো, তবেই তুমি প্রকৃত 'আরিফ' বা মারেফাত অর্জনকারী

ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর 'ইহয়াউ উলুমিদ্দিন' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মানুষের অন্তরে পেরেশানি তখনই আসে, যখন সে নিজের পরিকল্পনাকে আল্লাহর পরিকল্পনার ওপর প্রাধান্য দেয়। সুফিগণ একে 'তদবির' (নিজস্ব পরিকল্পনা) বনাম 'তাকদির' (আল্লাহর পরিকল্পনা) বলেন। হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) বলতেন, "হে বৎস! তোমার যা নির্ধারিত আছে তা তোমার কাছে পৌঁছাবেই, যদিও তুমি তা না চাও। আর যা তোমার জন্য নয়, তা তুমি শত চেষ্টা করেও পাবে না।"

এই দর্শন মানুষকে লোভ ও হিংসা থেকে মুক্ত করে। যখন আমি জানি যে অন্য কেউ আমার রিজিক বা সম্মান ছিনিয়ে নিতে পারবে না, তখন আমার ভেতর অন্যের প্রতি ঘৃণা বা প্রতিযোগিতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। হৃদয়ে কেবল বিরাজ করে 'ইশক-এ-ইলাহি'

হে সত্যান্বেষী পাঠক! দুনিয়ার এই চাকচিক্য আর মানুষের ভিড়ে নিজেকে কখনো নিঃসঙ্গ ভেবো না। মনে রাখবে, তোমাকে রক্ষার জন্য মহাবিশ্বের মালিক যথেষ্ট। মানুষ যখন তোমার ওপর জুলুম করতে চায়, তখন তারা আসলে আল্লাহর ইশারার বাইরে কিছুই করতে পারে না। আবার কেউ যখন তোমাকে অনেক উপরে তুলে দিতে চায়, তখনও জানবে সেটি কেবল আল্লাহর করুণা

আমাদের করণীয়ঃ

সবর (ধৈর্য)- প্রতিকূল অবস্থায় বিচলিত না হওয়া

শোকর (কৃতজ্ঞতা)- সব অবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা করা

তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা)- নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেয়া

আসুন, আমরা আমাদের হৃদয়ের কপাট আল্লাহর জন্য উন্মুক্ত করে দেই। মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়ে মওলার মুখাপেক্ষী হই। যে দিন আপনি বুঝতে পারবেন যে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কিছু করার ক্ষমতা নেই, সেই দিনই আপনার অন্তরে জান্নাতি প্রশান্তি নেমে আসবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default