পবিত্র রমজান মাস মুমিনের জীবনে কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়। এটি মূলত আত্মিক উৎকর্ষ, নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং খোদাপ্রেমের এক গভীর সাধনা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই মাসকে দিয়েছেন যেন বান্দা তার পশুবৃত্তিকে দমন করে ফেরেশতাসুলভ গুণাবলি অর্জন করতে পারে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যখন আধ্যাত্মিকতার এই বসন্তকাল আসে, তখন একদল অসাধু ব্যবসায়ী একে পার্থিব মুনাফা লোটার হাতিয়ারে পরিণত করে। এই মানসিকতা রমজানের মূল শিক্ষা ও ‘ইহসান’ (কল্যাণকামিতা) এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
কুরআনিক
বিধান ও তাকওয়ার স্বরূপ
রমজানের মূল
লক্ষ্য হলো 'তাকওয়া' বা খোদাভীতি অর্জন
করা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
(সূরা আল-বাকারাঃ ১৮৩)
অনুবাদঃ হে
মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল
তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (পরহেজগারি)
অর্জন করতে পারো।
এখানে ‘তাকওয়া’ মানে কেবল ইবাদত নয়, বরং স্রষ্টার ভয়ে সৃষ্টিকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা। একজন রোজাদার যখন
ক্ষুধার্ত থাকে, তখন সে অন্যের ক্ষুধা অনুভব করে। কিন্তু যদি
সেই রোজাদারই ব্যবসায়ী হয়ে অন্য রোজাদারের পকেট কাটে, তবে
তার রোজা কেবল উপবাস ছাড়া আর কিছুই নয়। সুফি দর্শনে একে বলা হয় ‘নফসে আম্মারা’ বা
মন্দ আত্মার জয়।
সততা
ও ইহসান
ব্যবসা
ইসলামে অত্যন্ত সম্মানের পেশা, যদি তা সততার সাথে হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেনঃ
التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ
(তিরমিজিঃ ১২০৯)
অনুবাদঃ সত্যবাদী
ও আমানতদার ব্যবসায়ী (কিয়ামতের দিন) নবীগণ, সিদ্দিকগণ এবং
শহীদগণের সঙ্গী হবেন।
বিপরীত দিকে, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ায়, তাদের
সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে। সিন্ডিকেট বা মজুদদারী (ইহতিকার) ইসলামে অভিশপ্ত।
রমজানে পণ্যের দাম দ্বিগুণ করা মূলত সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম। অথচ প্রকৃত মুমিনের
বৈশিষ্ট্য হলো ‘ইহসান’ বা অন্যের জন্য সহজ করা। যেখানে বিশ্বজুড়ে রমজানে ছাড় দেওয়া
হয়, সেখানে দাম বাড়ানো ইমানের দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
আগে
দ্বীন শেখো, তারপর ব্যবসা করো
মাওলা আলী
(আ.)-এর শাসনামলে তিনি নিজে বাজারে যেতেন এবং ব্যবসায়ীদের তাকওয়ার নসিহত করতেন।
তিনি বলতেন, "হে ব্যবসায়ীরা! আগে দ্বীন শেখো, তারপর ব্যবসা করো।" ইমাম জাফর সাদিক (আ.) একবার তাঁর এক খাদেমকে
ব্যবসার জন্য অর্থ দিয়েছিলেন। খাদেম যখন সেই পণ্য বাজারে দুষ্প্রাপ্য দেখে দ্বিগুণ
দামে বিক্রি করে অতিরিক্ত লাভ নিয়ে ফিরলেন, ইমাম তখন ব্যথিত
হয়ে সেই অতিরিক্ত লভ্যাংশ নিতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, "তলোয়ারের লড়াইয়ের চেয়েও হালাল রুজি অন্বেষণ করা কঠিন।"
সুফি সাধক হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর মতে, "তুমি যদি সৃষ্টির প্রতি দয়া না করো, তবে স্রষ্টার দয়া আশা করো কী করে?" রমজান হলো ত্যাগের মাস, ভোগের নয়। একজন সুফি কখনও অন্যের বাধ্যবাধকতা বা অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নিজের আখের গোছান না। রমজানে পণ্যের দাম বাড়ানো মানে হলো আধ্যাত্মিক দেউলিয়াত্ব।
ব্যবসায়িক
নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
আমাদের দেশে
রমজান এলেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি একটি ‘মহাউৎসবে’ রূপ নেয়। এটি কেবল একটি
অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি নৈতিক অবক্ষয়। একজন
ভোক্তা যখন একটি পণ্যের জন্য হাহাকার করেন, আর ব্যবসায়ী সেই
সুযোগে মুনাফা খোঁজেন, তখন সেখানে বরকত বিদায় নেয়। রাসুল
(সা.)-এর সুন্নাহ হলো অন্যের জন্য সহজ করা। যারা রমজানে ছাড় দেয়, আল্লাহ তাদের রিজিক বাড়িয়ে দেন। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর ‘এহ্ইয়াউ
উলুমিদ্দীন’ গ্রন্থে ব্যবসাকে একটি ‘ফরজে কিফায়া’ ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছেন,
যদি তা জনকল্যাণে হয়। কিন্তু যখন তা শোষণে রূপ নেয়, তখন তা হারামে পরিণত হয়।
অসাধু
ব্যবসায়ীদের বোঝা উচিত
আসুন, আমরা এই রমজানকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখি। রমজান আমাদের
শিখিয়েছে সংযম। এই সংযম কেবল জিহ্বায় নয়, বরং লোভের ক্ষেত্রেও থাকা
চাই। অসাধু ব্যবসায়ীদের বোঝা উচিত, মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর
বদদোয়া নিয়ে অর্জিত সম্পদ কখনও সুখ বয়ে আনে না। আমরা যেন মুনাফাখোরীকে ‘না’ বলি
এবং ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দিই। আল্লাহ যেন আমাদের ব্যবসায়ীদের অন্তরে রহম দান
করেন এবং আমাদের সকলকে রমজানের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য—অর্থাৎ আত্মশুদ্ধি হাসিলের
তৌফিক দান করেন। ইয়া রাব্বুল আলামিন, আমাদের রোজাগুলোকে কবুল
করুন। আমিন।
দেশের
প্রতিটি মসজিদের সম্মানিত খতিব এবং ইমাম সাহেবগণ হচ্ছেন সমাজের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক
অভিভাবক। জুমার মিম্বর থেকে আপনাদের একটি শক্তিশালী আহ্বান বদলে দিতে পারে সমাজের
চিত্র,
রুখে দিতে পারে রমজানের এই মুনাফাখোরীর মহোৎসব।
জুমার
খুতবায় ইমামগণের প্রতি আহ্বানঃ রমজানের পবিত্রতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ
সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম ও নায়েবে রাসুল (সা.), আমাদের প্রতিটি পবিত্র মাহে রমজান। এটি ইবাদত, মাগফিরাত এবং আত্মশুদ্ধির মাস। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজের একদল অসাধু ব্যবসায়ী এই বরকতময় মাসকে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। মসজিদের মিম্বর থেকে আপনাদের কণ্ঠস্বরই পারে এই নৈতিক অবক্ষয় রোধ করতে এবং ব্যবসায়ীদের অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করতে। আপনাদের প্রতি আমার আকুল আবেদন পবিত্র মাহে রমজানের জুম্মার প্রতিটি খুৎবায় যদি মুনাফাখোরীর সর্বগ্রাসী রূপ ও সৎ ব্যবসায়ীদের কল্যানকর দিক সম্পর্কে সচেতন করার।
খুতবার
মূল আলোচ্য বিষয় ও দলীলসমূহ
১.
ব্যবসাকে ইবাদতে রূপান্তরের আহ্বানঃ
খুতবায়
ব্যবসায়ীদের স্মরণ করিয়ে দিন যে, ইসলামে ব্যবসা কেবল অর্থ
উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদত—যদি তা সততার
সাথে হয়।
রাসুলুল্লাহ
(সা.) বলেছেনঃ "কেয়ামতের দিন আমানতদার ও সত্যবাদী
ব্যবসায়ীগণ নবী ও শহীদদের সাথে থাকবেন।" (তিরমিজি)
২.
কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারির ভয়াবহতাঃ
পণ্য মজুত
করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো (ইহতিকার) ইসলামে অভিশপ্ত কাজ। যারা রমজান উপলক্ষে
পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়, তারা মূলত আল্লাহর লানত বা অভিশাপ
কুড়িয়ে নেয়।
হাদিস
শরিফঃ "যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যশস্য মজুত করে
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ ও দারিদ্র্য
দিয়ে শাস্তি দেন।" (ইবনে মাজাহ)
৩. 'ইহসান' বা দয়া প্রদর্শনের শিক্ষাঃ
রমজান হলো
সহমর্মিতার মাস। খতিব সাহেবগণ খুতবায় এই বিষয়টি জোর দিয়ে বলবেন যে, বিশ্বের অমুসলিম দেশগুলোতেও পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে দাম কমানো হয়, অথচ মুসলিম প্রধান দেশে দাম বাড়ানো আমাদের ইমানের জন্য লজ্জাজনক। মাওলা
আলী (আ.)-এর সেই অমর বাণীটি স্মরণ করিয়ে দিন— "মানুষের
প্রতি দয়া করো, তবেই আসমানের অধিপতি তোমার প্রতি দয়া
করবেন।"
ইমামগণের
প্রতি বিশেষ অনুরোধ (অ্যাকশন প্ল্যান)
- ব্যবসায়ীদের আলাদাভাবে সম্বোধনঃ
খুতবার একটি অংশ সরাসরি স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের উদ্দেশ্যে
উৎসর্গ করুন। তাদের বলুন, রমজানের অল্প লাভ এবং অধিক
বরকত তাদের ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
- সাধারণ মানুষকে সচেতন করাঃ
সাধারণ মুসল্লিদের বলুন যেন তারা আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা (Panic
Buying) না করেন। কারণ, অহেতুক পণ্য মজুত
করলে বাজারে চাহিদাও কৃত্রিমভাবে বেড়ে যায়, যা অসাধু
ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দেয়।
- বাজার পরিদর্শনের নসিহতঃ
খুতবা শেষে মুসল্লিদের নিয়ে দোয়া করুন যেন আমাদের বাজারগুলো জুলুমমুক্ত হয়।
প্রয়োজনে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তাদের
রমজানের পবিত্রতা রক্ষার অনুরোধ জানান।
হে
আল্লাহর ঘরের খাদেমগণ
আপনাদের একটি
আলোচনা যদি একজন ব্যবসায়ীর মনেও আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) তৈরি করতে পারে, তবে হাজারো সাধারণ মানুষ এই রমজানে শান্তিতে ইফতার ও সেহরি করতে পারবে।
এটিই হোক এই রমজানের বড় খেদমত। আসুন, মিম্বর থেকে আমরা ঘোষণা
করি— "রমজান হোক ত্যাগের, ভোগের
নয়; রমজান হোক সেবার, শোষণের নয়।"
আল্লাহ তায়ালা আপনাদের জবান ও আমলকে কবুল করুন। আমিন।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।