সাওমের হাকিকত ও আধ্যাত্মিক পরিক্রমা

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

 

সাওমের হাকিকত ও আধ্যাত্মিক পরিক্রমা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।পবিত্র রমজান মাস কেবল উপবাসের সময় নয়, বরং এটি নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ এবং রূহের পুনর্জাগরণের এক ঐশী মহোৎসব। 'সাওম' বা রোজা হলো মুমিনের জন্য একটি ঢাল, যা তাকে পাপাচার থেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহর নৈকট্যের পথে ধাবিত করে। এটি এমন এক ইবাদত যেখানে বান্দা এবং রবের মাঝে কোনো পর্দা থাকে না

সাওমের পরিচয় ও শারয়ী বিধান

'সাওম' (صوم) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বিরত থাকা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইবাদতের নিয়তে পানাহার ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তি থেকে বিরত থাকাকে রোজা বলা হয়। তবে সুফি গবেষকদের মতে, প্রকৃত রোজা হলো কেবল পেট ও ইন্দ্রিয়ের উপবাস নয়, বরং অন্তরকে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছু থেকে বিমুখ রাখা

কুরআনিক দলিলঃ

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

(সূরা আল-বাকারাহ, আয়াতঃ ১৮৩)

অনুবাদঃ "হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (পরহেজগারি) অর্জন করতে পারো।"

কাদের জন্য ফরজ?

ইসলামি বিধি অনুযায়ী, প্রত্যেক সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান মুসলিম নর-নারীর ওপর রমজান মাসের রোজা রাখা ফরজ। তবে অসুস্থ, মুসাফির, অতি বৃদ্ধ এবং গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী নারীদের জন্য শরিয়ত বিশেষ শিথিলতা প্রদান করেছে

রোজা ফরজের গূঢ় রহস্য ও আধ্যাত্মিক দর্শন

আল্লাহ কেন রোজা ফরজ করেছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে 'তাকওয়া' শব্দের মাঝে। ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর মতে, মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তি (নফস-এ-আম্মারা) দমনের প্রধান অস্ত্র হলো ক্ষুধা। যখন পেট খালি থাকে, তখন রিপুগুলো দুর্বল হয়ে যায় এবং রূহ শক্তিশালী হয়

হাদিসের আলোকচ্ছটাঃ

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেনঃ

قَالَ اللَّهُ كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ

(সহীহ বুখারী, হাদিস নংঃ ১৯০৪)

অনুবাদঃ "আল্লাহ তাআলা বলেন, বনী আদমের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কেবল রোজা ছাড়া। কারণ রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।"

এই হাদিসে 'আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব' বাক্যের এক গভীর ব্যাখ্যা দিয়েছেন আরিফগণ। তাঁরা বলেন, রোজাদার যখন আল্লাহর প্রেমে নিজের বৈধ চাহিদা বিসর্জন দেয়, তখন প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ নিজেকেই তার জন্য সঁপে দেন

আহলুল বাইয়েত ও সুফি দর্শনঃ অন্তরের রোজা

মাওলা আলী (আ.) রোজাকে তিন স্তরে ভাগ করেছেনঃ

১. আম রোজাঃ সাধারণ মানুষের পানাহার বর্জন

২. খাস রোজাঃ চোখ, কান, জিহ্বা ও হাত-পা’কে পাপ থেকে রক্ষা করা

৩. খাসুল খাস রোজাঃ অন্তরকে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব চিন্তা থেকে মুক্ত রাখা

হযরত মাওলা আলী (আ.) বলেন, "জিহ্বার রোজার চেয়ে অন্তরের রোজা (অন্যায় চিন্তা থেকে বিরত থাকা) অনেক বেশি কঠিন ও মর্যাদাপূর্ণ।" ইমাম জাফর সাদিক (আ.) শিখিয়েছেন যে, রোজা কেবল খানা-পিনা ত্যাগ নয়, বরং এটি হলো আখলাকে হাসানা বা সুন্দর চরিত্রের নামান্তর

সুফি সম্রাট মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) তাঁর 'মসনবী'তে লিখেছেন, মানুষের অস্তিত্ব একটি বাঁশির মতো। বাঁশি যতক্ষণ ফাঁকা থাকে, ততক্ষণই তাতে ঐশী সুর বেজে ওঠে। রোজা আমাদের ভেতরটা পরিষ্কার করে দেয়, যাতে সেখানে আল্লাহর নূর প্রতিধ্বনিত হতে পারে। হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর মতে, রোজা হলো সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর অবিচল থাকার মহড়া

রোজার বহুমুখী উপকারিতাঃ আধ্যাত্মিক, মানসিক ও শারীরিক

১. আধ্যাত্মিক সুস্থতাঃ

রোজার মাধ্যমে মানুষ 'ইসতিগনা' বা অমুখাপেক্ষিতা অর্জন করে। এটি নফসের অন্ধকার দূর করে রূহকে আসমানি জগতের দিকে টেনে নেয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর মতে, রোজা ফেরেশতাসুলভ গুণাবলি অর্জনের মাধ্যম

২. মানসিক প্রশান্তিঃ

আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলে, আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-control) মানুষের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে। রোজা ধৈর্য ও সহনশীলতা শেখায়। এটি মানুষের ভেতরে পরার্থপরতা ও ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা জাগিয়ে তোলে, যা মানসিক বিষণ্ণতা দূর করতে সহায়ক

৩. শারীরিক সুস্থতাঃ

বিজ্ঞান আজ স্বীকার করছে যে, 'অটোফেজি' (Autophagy) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোজা শরীরের বিষাক্ত কোষগুলো ধ্বংস করে। এটি লিভার, কিডনি এবং পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ—পরিমিত ইফতার ও সেহরি—মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে মুক্তি দেয়

আধ্যাত্মিক বার্তা

রোজা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি পরম সত্তার সাথে মিলনের এক নিভৃত পথ। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে 'লৌহ মানব' হতে হয়, যে নিজের লালসার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। হে মুমিন! আপনার রোজাকে কেবল তৃষ্ণা ও ক্ষুধার শিকলে বন্দী করবেন না; বরং একে প্রেমের অগ্নিতে পরিণত করুন যা আপনার ভেতরের সমস্ত অহংকার ও কলুষতাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে

আসুন, আমরা এবারের রমজানে কেবল মুখ বন্ধ না রাখি, বরং আমাদের কুচিন্তা, গিবত এবং পরনিন্দা থেকেও বিরত থাকি। তবেই আমাদের রোজা হবে 'সাওমে হাকিকি' বা প্রকৃত উপবাস

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default