পবিত্র মাহে রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, বরং এটি আত্মিক বিবর্তন এবং নফসের (অহম) সাথে জিহাদের সময়। এই মাসের প্রতিটি ইবাদতের একটি বাহ্যিক রূপ (শরিয়ত) এবং একটি অভ্যন্তরীণ রহস্য (মারেফত) রয়েছে। ইফতার—যা সারাদিনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার পর পরম তৃপ্তির মুহূর্ত—যখন অন্য কারো সাথে ভাগ করা হয়, তখন তা কেবল উদরপূর্তির গণ্ডি পেরিয়ে এক সুউচ্চ আধ্যাত্মিক সাধনায় পরিণত হয়। এই ভাগ করে নেওয়ার মূলে রয়েছে 'বিসর্জন' এবং 'প্রেম'। সুফি পরিভাষায় একে বলা হয় ’ঈসার’ বা পরার্থপরতা। যখন একজন মুমিন নিজের ক্ষুধার ওপর অন্য ভাইয়ের ক্ষুধাকে প্রাধান্য দেয়, তখন তার অন্তরে খোদায়ী নূরের প্রতিফলন ঘটে।
পরার্থপরতার খোদায়ী সনদ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে আনসার সাহাবীদের প্রশংসা
করে ত্যাগের এক অনন্য মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। যা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য
পথপ্রদর্শক।
وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
(সূরা
আল-হাশর, আয়াতঃ ৯)
অনুবাদঃ "তারা
নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়,
যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হয়। আর
যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।"
আধ্যাত্মিক (ইশারি) ব্যাখ্যাঃ সুফি
দর্শনের অন্যতম স্তম্ভ হলো 'শুহ-এ-নফস'
বা অন্তরের সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি।
ইফতারের টেবিলে যখন হরেক রকম খাবার সাজানো থাকে, তখন নফস চায় সবটুকু নিজে ভোগ
করতে। কিন্তু মারেফতের পথিক (সালেক) যখন নিজের প্রিয় অংশটি অন্যের পাতে তুলে দেন, তখন তিনি
আসলে তার নফসকে জবাই করেন। ইমাম ইবনে আরাবি (রহ.)-এর মতে, সৃষ্টির
সেবা করা মূলত স্রষ্টারই সেবা করা,
কারণ সৃষ্টি হলো স্রষ্টার গুণের
প্রকাশস্থল। তাই অন্যকে ইফতার করানো মানে আল্লাহর 'রাজ্জাক' (রিজিকদাতা)
গুণের আয়না হওয়া।
রূহানি প্রতিদান
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইফতার করানোর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে একে গুনাহ
মাফের ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির উসিলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ، غَيْرَ أَنَّهُ لاَ يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا
(সুনানে
তিরমিজি, হাদিসঃ ৮০৭)
অনুবাদঃ "যে ব্যক্তি কোনো রোজা পালনকারীকে ইফতার করাবে, সে তার
সমপরিমাণ সওয়াব পাবে; তবে এতে রোজা পালনকারীর সওয়াব সামান্যও কমবে না।"
মারেফতি বিশ্লেষণঃ
এই হাদিসের গূঢ় রহস্য হলো 'বারাকাহ' বা বরকত।
বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে খাবার ভাগ করলে কমে যাচ্ছে, কিন্তু
আধ্যাত্মিকভাবে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর 'এহইয়াউ
উলুমিদ্দীন' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে,
মুমিনের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করানো
আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। ইফতারের সময় একজন ক্ষুধার্ত রোজাদারের মুখে খাবার
তুলে দিয়ে তার অন্তরে যে প্রশান্তি আনা হয়,
সেই প্রশান্তিই দানকারীর রুহানি
উন্নতির সোপান হয়ে দাঁড়ায়। এটি কেবল সওয়াবের বিনিময় নয়, বরং এটি
হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের এক আধ্যাত্মিক সেতু।
ত্যাগের মহিমা
আহলুল বাইয়েত বা নবী-পরিবারের জীবনদর্শন হলো ত্যাগের সর্বোচ্চ
শিখর। সূরা আদ-দাহর (বা সূরা ইনসান) নাজিল হয়েছিল মাওলা আলী (আ.) এবং সাইয়্যিদা
ফাতিমা (আ.)-এর এক অলৌকিক ত্যাগের ঘটনার প্রেক্ষিতে।
তাঁরা টানা তিন দিন রোজা রেখেছিলেন এবং ইফতারের মুহূর্তে যখনই খাবার
মুখে নিতে যাবেন, তখনই দরজায় যথাক্রমে মিসকিন, ইয়াতিম ও
কয়েদি এসে উপস্থিত হয়। তাঁরা নিজেদের ইফতারের সামান্য রুটিটুকু
সাহায্যপ্রার্থীকে দিয়ে শুধু পানি দিয়ে ইফতার করেন। তাঁদের এই ত্যাগ সম্পর্কে
আল্লাহ বলেনঃ
"তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীকে অন্ন দান করে এবং বলে—আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির
জন্যই তোমাদের আহার্য দান করি।"
(সূরা দাহরঃ ৮-৯)।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলতেনঃ
"যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য এক লোকমা
খাবার ত্যাগের মানসিকতা রাখে, আল্লাহ জান্নাতে তার জন্য বিশাল দস্তরখান বিছিয়ে
দেবেন।"
এখানে শিক্ষা হলো—দান করার সময় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ নয়, বরং নিজেকে
আল্লাহর দয়ার একজন উসিলা মাত্র মনে করা। হাদিসে সাকালাইন-এর চেতনা অনুযায়ী, আহলুল
বাইয়েতের এই আদর্শ অনুসরণ করাই হলো প্রকৃত মারেফত।
অন্তরের পরিশুদ্ধি (তাজকিয়াতুন নাফস)
সুফি সাধকগণ ইফতার ভাগ করে নেওয়াকে 'ফুতুওয়াত' বা
আধ্যাত্মিক বীরত্ব বলে অভিহিত করেছেন। সুলতানুল মাশায়েখ নিজামুদ্দিন আউলিয়া
(রহ.) নিজে ইফতারের সময় খুব সামান্য খেতেন এবং মজলিসের সবার মাঝে খাবার বিলিয়ে
দিতে আনন্দ পেতেন।
ইমাম আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর শিক্ষাঃ
বড় পীর সাহেব বলতেন,
"তোমার হাত যেন সর্বদা দাতার
হয়।" সুফিবাদের দৃষ্টিতে, ইফতার ভাগ করে নেওয়ার সময় তিনটি স্তর থাকেঃ
১. শরিয়তি স্তরঃ সওয়াবের আশায় অন্যকে খাওয়ানো।
২. তরিকতি স্তরঃ নিজের নফসকে দমন করতে এবং ভ্রাতৃত্ব বাড়াতে খাওয়ানো।
৩. হাকিকতি স্তরঃ এই উপলদ্ধি করা যে,
'খাওয়ানোর মালিক আল্লাহ, আমি কেবল
মাধ্যম'। এখানে
দাতা ও গ্রহীতার ভেদাভেদ লুপ্ত হয়ে যায়।
ইমাম গাজ্জালির মতে,
ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করা হলো
শয়তানের দুর্গ ধ্বংস করার শামিল। রমজানে যখন আমরা অন্যের সাথে ইফতার ভাগ করি, তখন আমাদের
ভেতরকার 'কারুণি' (সম্পদ পুঞ্জীভূত করার) স্বভাব দূর হয়ে 'মুহাম্মদী' স্বভাবের
উদয় ঘটে। এটিই হলো 'তাজকিয়াতুন নাফস'
বা আত্মার পরিশুদ্ধি।
একটি আধ্যাত্মিক বার্তা
ইফতারি ভাগ করে নেওয়া কেবল ডাল-ভাতের লেনদেন নয়, এটি হলো
হৃদয়ের মহব্বত ভাগ করে নেওয়া। যখন দস্তরখানে বসে আপনি আপনার পাশের মানুষটিকে
তৃপ্ত হতে দেখেন, তখন আপনার ভেতরে যে এক প্রশান্তি অনুভূত হয়—সেই
প্রশান্তিই হলো আল্লাহর দিদার বা সাক্ষাতের ক্ষুদ্র আভাস।
মারেফতের মূল কথা হলো—সবকিছুর মাঝে আল্লাহকে দেখা। ক্ষুধার্তের জঠরজ্বালায়, তৃষ্ণার্তের শুষ্ক কণ্ঠে যখন আপনি শান্তির বারিবর্ষণ করেন, তখন আপনি আসলে আপনার রবের সন্তুষ্টির দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছেন। তাই এবারের রমজানে আমাদের ইফতার কেবল নিজের পরিবারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে, অসহায় ও সাধারণ মানুষের সাথে ভাগ করে নিই। মনে রাখবেন, দস্তরখান যত বড় হবে, রহমতের ছায়াও তত বিস্তৃত হবে।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।