বিষাক্ত নীল পদ্ম উপন্যাস পর্বঃ ৪ শয়তানের আলখেল্লা

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

বিষাক্ত নীল পদ্ম উপন্যাস
ক্যাফে থেকে ফেরার পথে সাফওয়ানের মনে হচ্ছিল তার গাড়িটি যেন একটি চলন্ত কবর। বাইরের বৃষ্টির ঝাপটা কাঁচের ওপারে এক ঝাপসা জগত তৈরি করেছে। সে স্টিয়ারিং হুইল ধরে আছে ঠিকই, কিন্তু তার গন্তব্য আজ বড়ই অনিশ্চিত। সাহেলার সেই হাতের স্পর্শ এখনো তার চামড়ায় এক অদ্ভুত দহন তৈরি করছে। সে জানে, সে এক মস্ত বড় সীমালঙ্ঘন করে ফেলেছে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, তার অবচেতন মন এখনো তাকে নির্দোষ প্রমাণ করার অজুহাত খুঁজে যাচ্ছে।

শয়তান যখন কোনো পরহেজগার মানুষকে আক্রমণ করে, তখন সে সরাসরি মদের বোতল বা নগ্নতার প্রলোভন দেখায় না; বরং সে আসে একটি 'পবিত্র আলখেল্লা' পরে। সে পাপকে ইবাদতের রঙে রাঙিয়ে দেয়। সাফওয়ান নিজেকে বোঝাচ্ছে—"আমি তো সাহেলাকে দ্বীনের পথে ধরে রাখার চেষ্টা করছি। ওর স্বামী ওকে গুরুত্ব দেয় না, আমি গুরুত্ব না দিলে ও তো আরও বেশি পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে!" এটিই সেই শয়তানি ধোঁকা, যা একজন ইমানদার মানুষকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যায়।

স্টুডিওর ছায়া এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতা

সাফওয়ান তার বাসায় না গিয়ে আবার তার স্টুডিওতে ফিরে এল। এই মধ্যরাতে স্টুডিওর চারপাশ এক ভৌতিক নিস্তব্ধতায় ঘেরা। করিডোরের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো মিটমিট করছে। সাফওয়ান তার চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। সামনে রাখা দামী মাইক্রোফোনটি যেন একটি বিচারকের মতো তার দিকে চেয়ে আছে।

সে তার ফোনটা বের করল। সাহেলার সাথে তার মেসেজগুলো স্ক্রল করতে লাগল। কী অদ্ভুত সেই কথোপকথন! প্রতিটি বাক্য শুরু হয় 'ইনশাআল্লাহ' বা 'আলহামদুলিল্লাহ' দিয়ে, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর লালসা। সাহেলা লিখেছে—"আপনার কণ্ঠে যখন আল্লাহর প্রশংসা শুনি, তখন আমার মনে হয় পৃথিবীটা খুব সুন্দর। আপনি আমার আত্মার আত্মীয়।"

সাফওয়ান ভাবছে, যে সম্পর্কের ভিত্তি লৌকিকতা আর মিথ্যে, তা কীভাবে আত্মার আত্মীয়তা হতে পারে? ইমাম গাজ্জালি বলেছিলেন, "নফস হলো একটি অবাধ্য ঘোড়ার মতো, তাকে যদি লাগাম দিয়ে টেনে না ধরা হয়, তবে সে তার সওয়ারিকে জাহান্নামের গর্তে ফেলে দেয়।" সাফওয়ান এখন সেই ঘোড়ার পিঠে বসা এক অসহায় সওয়ারি।

মরিয়মের মেসেজ এবং বিবেকের দংশন

ফোনের স্ক্রিনে মরিয়মের সেই মিসড কলটা এখনো জ্বলজ্বল করছে। একটু পরেই মরিয়মের একটি টেক্সট এল—"অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। তুমি কি স্টুডিওতে? সাবধানে এসো। তোমার প্রিয় আদা চা ফ্লাস্কে রাখা আছে।"

এই অতি সাধারণ কথাগুলো সাফওয়ানের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। একদিকে সাহেলার সেই 'আধ্যাত্মিক' প্রেমের বিষাদ, আর অন্যদিকে মরিয়মের এই নিঃস্বার্থ মায়া। মরিয়ম তার জন্য দোয়া করে, আর সাহেলা তার কাছে কেবল নিজের নফসের খোরাক চায়। সাফওয়ান বুঝতে পারল, সে আসলে একটি হীরা ফেলে কাঁচের সন্ধানে নেমেছে।

কিন্তু মানুষের মন বড় বিচিত্র। সে যখন একবার কোনো নিষিদ্ধ পথে পা বাড়ায়, তখন সেই পথের কাদা তার কাছে চন্দনের মতো মনে হয়। সাফওয়ান স্টুডিওর লাইট নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে বসে সে তার নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। তার মনে হলো, রুমের কোণে কেউ একজন দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। না, সেখানে কেউ নেই, ওটা কেবল তার নিজের পাপের ছায়া।

সে পড়ে যেতে চায় না

বাইরে বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। স্টুডিওর টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন এক অবিরাম তবলার আওয়াজ। এই বৃষ্টির শব্দে এক সময় সাফওয়ান সুর খুঁজে পেত, আজ সে কেবল হাহাকার শুনতে পাচ্ছে। সে জানালার পর্দা সরাতেই দেখল, রাস্তার ধারের একটা গাছ প্রচণ্ড বাতাসে নুয়ে পড়ছে। গাছটা ডালপালা দিয়ে যেন মাটি আঁকড়ে ধরতে চাইছে, যেন সে পড়ে যেতে চায় না।

সাফওয়ানের অবস্থাও আজ সেই নুয়ে পড়া গাছটির মতো। সমাজের খ্যাতির বাতাসে সে আজ টালমাটাল। তার ইমানের শিকড় কি যথেষ্ট গভীর? নাকি সে কেবল ওপর দিয়ে সবুজ, ভেতরে সে ঘুণে ধরা কাঠ?

সে তার ল্যাপটপ খুলল। তার নাশিদের কমেন্ট বক্সে হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসা। কেউ লিখেছে—"আপনার কণ্ঠ শুনলে নামাজে একাগ্রতা বাড়ে।" সাফওয়ানের হাসি পেল। কী নিদারুণ পরিহাস! যে মানুষটির নিজের নামাজে আজ কোনো প্রাণ নেই, তার কণ্ঠ শুনে অন্য মানুষের একাগ্রতা বাড়ছে? সে কি তবে সেই প্রদীপের মতো, যে নিজে পুড়ে শেষ হয়ে যায় কিন্তু অন্যকে আলো দেয়? না, সে আসলে সেই অভিনেতার মতো, যে পবিত্রতার অভিনয় করতে করতে নিজেই বিশ্বাস করে নিয়েছে যে সে পবিত্র।

শয়তানের শেষ চাল

সাফওয়ান স্থির করল সে সাহেলাকে আর মেসেজ দেবে না। সে সব শেষ করে দেবে। কিন্তু ঠিক তখনই সাহেলার একটি অডিও মেসেজ এল। সে কাঁদছে। অস্পষ্ট কণ্ঠে সে বলছে—"সাফওয়ান, আপনিও কি আমাকে একা ফেলে চলে যাবেন? সবাই আমাকে ছেড়ে যায়, আপনি অন্তত আমাকে আলোর পথ দেখান।"

ব্যস! সাফওয়ানের সংকল্প মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। শয়তান তার আলখেল্লাটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সাফওয়ান টাইপ করতে শুরু করল—"কেঁদো না সাহেলা। আমি আছি। আল্লাহ আমাদের ধৈর্য ধরার তৌফিক দিন।"

আবার সেই 'আল্লাহর নাম'! পবিত্রতার মোড়কে অপবিত্রতার লেনদেন। সাফওয়ান জানল না, এই একটি বাক্য তাকে মরিয়মের কাছ থেকে আরও হাজার মাইল দূরে ঠেলে দিল। সে জানল না, এই 'আলোর পথ' দেখানোর নাম করে সে আসলে তাকে নিয়ে অন্ধকারের অতল গহ্বরে ঝাঁপ দিচ্ছে।

রাতের শেষ প্রহর শুরু হয়েছে। আজানের শব্দ শোনা যাচ্ছে না, কেবল বৃষ্টির একঘেয়ে আওয়াজ। সাফওয়ান স্টুডিওর সোফায় শুয়ে পড়ল। তার দুচোখে ঘুম নেই, কেবল এক নীল আলোর মায়া আর শয়তানের সেই অদৃশ্য আলখেল্লার ভার।

সাফওয়ান কি পারবে এই 'দ্বীনি সেবার' ফাঁদ থেকে বের হতে? নাকি পরবর্তী অধ্যায়ে মরিয়ম এমন কিছু আবিষ্কার করবে যা সাফওয়ানের এই সাজানো জগতকে তছনছ করে দেবে? 

জানতে পড়ুন পরবর্তী পর্ব।

["কল্পনার তুলিতে আঁকা এই কাহিনীর প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনা একান্তই কাল্পনিক। ইতিহাসের কোনো পাতা বা বাস্তবের কোনো মানুষের ছায়ার সাথে এর কোনো যোগসূত্র নেই। কোনো মিল পাওয়া গেলে তা লেখকের অনিচ্ছাকৃত এবং নিছক কাকতালীয় ঘটনা মাত্র।"]

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default