শরীরের শেষ রক্তবিন্দুটিও আজ নিতান্তই মূল্যহীন

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

শরীরের শেষ রক্তবিন্দুটি আজ নিতান্তই মূল্যহীন

আকাশের গায়ে আজ এক পশলা তপ্ত বিষাদ। ১৯শে রমজান। কুফার মসজিদে যখন সেজদারত অবস্থায় আমীরুল মুমিনীন আলীর (আ.) কপালে সেই বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাত লেগেছিল, তখন মহাবিশ্বের হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল। জিবরাঈল (আ.)-এর আর্তনাদে আসমানের পর্দাগুলো কেঁপে উঠেছিল— “হেদায়েতের স্তম্ভ আজ ভেঙে পড়েছে!” আজ সেই দিন, যখন বাতাসের দীর্ঘশ্বাসেও রক্তের ঘ্রাণ পাওয়া যায়, যখন প্রতিটি ধূলিকণা মাওলা আলীর বিরহে রোদন করে।

কিন্তু জাফরের জানালার বাইরের পৃথিবীটা আজ বড্ড নিথর। সেখানে কোনো কান্নার রোল নেই, নেই কোনো আধ্যাত্মিক দহন। জাফর দেখছে, গোধূলির আলোটা ঠিক আগের মতোই ফিকে হয়ে আসছে। তার কাছে ১৯শে রমজান মানে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ, ক্ষুধার্ত পেটে ইফতারের প্রতীক্ষা। দুনিয়ার মায়া তার আত্মার চারপাশে এমন এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে, যার ওপাশে মা’রিফাতের কোনো আলো পৌঁছায় না। সে ভুলে গেছে, এই সেই দিন—যেদিন ‘বাবুল ইলম’ বা জ্ঞানের দরোজাটি রক্তাক্ত হয়েছিল।

ইফতার শেষ হয়েছে। সালাতের পর জাফর তার ছোট সাজানো সংসারে ডাইনিং টেবিলের চারপাশে বসল। সামনে স্ত্রী জুলেখা, দুই মেয়ে। তসবিহ পড়ার বদলে সেখানে এখন নতুন বায়নার গুঞ্জন। বড় মেয়ে আবদার তুলল, মার জন্য একটা দামী স্মার্টফোন চাই। জাফর হাসল। সে হাসিতে তৃপ্তি ছিল না, ছিল ক্লান্তির এক বিবর্ণ ছাপ। সে বিড়বিড় করে বলল, “তোমাদের জন্যই তো আমার এই হাড়ভাঙা খাটুনি। বিশ্বাস করো, শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমি তোমাদের মুখে হাসি দেখতে চাই।”

জাফরের এই কথাটি যেন এক টুকরো কাঁচের মতো মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। বড় মেয়ে বিদ্রূপের এক তীক্ষ্ণ হাসি হাসল। সে হাসিতে কোনো মমতা ছিল না, ছিল কেবল অবজ্ঞা। জুলেখা পাশ থেকে বলে উঠল, “থামো তো বাপু! খাওয়ার সময় এসব নাটুকে কথা বললে বদহজম হয়ে যাবে। শরীরের রক্তবিন্দু দিয়ে কী হবে? আমাদের তো জিনিসটা দরকার।” ছোট মেয়েটি টিপ্পনী কেটে যোগ করল, “আব্বু মাঝে মাঝে এমন অদ্ভুত কথা বলে না!”

মুহূর্তেই জাফরের মেরুদণ্ড বরাবর একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। তার মনে হলো, সে কোনো লিভিং রুমে নেই, বরং এক বিচারালয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক দণ্ডিত অপরাধী। তার ভালোবাসা, তার ত্যাগের প্রতিশ্রুতিগুলো যেন বাজারের কোনো সস্তা মুদ্রার মতো মূল্যহীন হয়ে ডাইনিং টেবিলে পড়ে আছে। সে মাথা নিচু করল। যে হাত দিয়ে সে সারাদিন কলম চালিয়েছে বা শ্রম দিয়েছে, সেই হাত দুটো তার কাছে আজ ভীষণ ভারী মনে হতে লাগল।

বাইরে তখন কুফার সেই বিয়োগান্তক স্মৃতির ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। মাওলা আলী (আ.)-এর সেই পবিত্র রক্ত, যা সিজদাহর জায়নামাজকে সিক্ত করেছিল, তা ছিল উম্মতের মুক্তির জন্য। আর জাফরের এই তথাকথিত ‘রক্তবিন্দু’ দান করার বাসনা কেবল একদল অকৃতজ্ঞ হৃদয়ের তুষ্টির জন্য। কী এক অদ্ভুত বৈপরীত্য! একদিকে আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাটের শাহাদাতের পথে যাত্রা, আর অন্যদিকে এক নগণ্য মানুষের তুচ্ছ সংসারের চাপে পিষ্ট হওয়া নিজের অস্তিত্ব।

জাফর অনুভব করল, তার নফস তাকে এতদিন মিথ্যে এক জান্নাতের স্বপ্ন দেখিয়েছে। সে ভেবেছিল, সে এই সংসারের স্তম্ভ। কিন্তু আজ সে দেখল, সে কেবল এক যন্ত্র—যার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে বা যার আবেগ তাদের চাহিদার সাথে না মিললে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে কারো দ্বিধা নেই। তার রূহ যেন এক খাঁচাবন্দী পাখির মতো ডানা ঝাপটাতে লাগল। সে বুঝতে পারল, সে মাওলা আলীর সেই অমর বাণীটির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে: “যে যত দুনিয়া দুনিয়া করবে, সে তত দুনিয়াতে জড়িয়ে যাবে; তবুও সে দুনিয়াকে পাবে না, বরং নিজের আখেরাতকেই নষ্ট করবে।”

জাফরের মনে হলো, তার অন্তরের ভেতর এক বিশাল মরুভূমি তৈরি হয়েছে। সেখানে ‘ইশক-এ-ইলাহি’র কোনো ফোয়ারা নেই, আছে শুধু মরুঝড়। সে নিজেকে প্রশ্ন করল—কার জন্য এই আত্মাহুতি? যার জন্য সে মাওলা আলীর শোক দিবসেও উদাসীন রইল, সেই সংসারই আজ তাকে ‘নিঃস্ব’ করে দিল। তার বেঁচে থাকার অর্থগুলো আজ কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে।

রাতের নিস্তব্ধতায় জাফর যখন একা জায়নামাজে বসল, তখন তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল। সেই অশ্রুগুলো কি তওবার? নাকি অপমানের? হতে পারে তা এক আধ্যাত্মিক জাগরণের শুরু। সে বুঝতে পারল, দুনিয়ার এই মরীচিকা তাকে চিরকাল তৃষ্ণার্তই রাখবে। মহব্বতের আসল কেন্দ্র তো আহলে বায়তের সেই ত্যাগের মহিমায়, যা মানুষকে নফসের গোলামি থেকে মুক্তি দেয়।

বাইরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে যেন আলীর (আ.) সেই শেষ উক্তিটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— “কাবার রবের শপথ, আমি সফল হয়েছি!” আর জাফর? সে কি সফল? নাকি এক মুঠো ধুলোর মোহে হারিয়ে ফেলা এক দিশেহারা পথিক? সেজদায় লুটিয়ে পড়ে সে কেবল এটুকুই বলতে পারল, “হে মাবুদ, আমাকে দুনিয়ার মায়া থেকে মুক্ত করো, আমাকে চিনে নিতে দাও সেই নূর—যা কখনো ম্লান হয় না।”

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default