মাহে রমজান কেবল উপবাসের নাম নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি এবং ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতির এক অনন্য পাঠশালা। শাহরুর রামাদান মুমিনের জীবনে আসে নফসের লাগাম টেনে ধরতে এবং আধ্যাত্মিক রিয়াজতের মাধ্যমে মহান রবের সান্নিধ্য অর্জনে। তবে বর্তমান সময়ে ইফতারের আড়ম্বর ও মাত্রাতিরিক্ত খাদ্য অপচয় এই পবিত্র মাসের মূল চেতনাকে ম্লান করে দিচ্ছে। যেখানে রমজানের শিক্ষা হলো অভাবীর কষ্ট অনুভব করা, সেখানে বিলাসিতা ও অপব্যয় এক আধ্যাত্মিক বিচ্যুতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
তাকওয়া
ও মিতব্যয়িতার গুরুত্ব
রমজানের মূল
উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন। যদি পেট ভরে খাওয়ার নামই রমজান হতো, তবে তা পশুর অভ্যাসের নামান্তর হতো। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা
এই মাসের মাধ্যমে আমাদের রুহকে খাদ্য দিতে চেয়েছেন।
১.
কুরআনিক দলিলঃ
আল্লাহ তাআলা
পবিত্র কুরআনে অপব্যয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর আধ্যাত্মিক অর্থ
হলো—যে সম্পদে অন্যের অধিকার আছে, তা নষ্ট করা শয়তানি খাসলত।
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াতঃ ২৭)
অনুবাদঃ নিশ্চয়ই
অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই; আর শয়তান তার রবের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ।
রুহ বা
আত্মা দুর্বল হয়ে পড়েঃ সুফি গবেষকদের মতে, অপচয় শুধু সম্পদের নয়, সময়েরও হয়। ইফতারের টেবিলে
ভুরিভোজের আয়োজন করতে গিয়ে মুমিন যখন ইবাদতের সময় নষ্ট করে এবং অতিরিক্ত আহার করে
নফসকে তৃপ্ত করে, তখন তার রুহ বা আত্মা দুর্বল হয়ে পড়ে।
শয়তান মানুষের রক্ত চলাচলের পথে বিচরণ করে; আর আহারের আধিক্য
সেই পথকে প্রশস্ত করে।
২.
হাদিসের প্রমাণঃ
রাসূলুল্লাহ
(সা.) সর্বদা পরিমিত আহারের ওপর জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে রমজানে ইফতার ও সেহরির
আড়ম্বর নিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন।
مَا مَلأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নম্বরঃ
২৩৮০)
অনুবাদঃ আদম
সন্তান তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট আর কোনো পাত্র পূর্ণ করেনি।
ইমাম গাজ্জালি
(রহ.) তার ‘এহিয়াউ উলুমিদ্দীন’ গ্রন্থে বলেছেন, রমজানের অন্যতম রহস্য
হলো ক্ষুধা। ক্ষুধা মানুষের অন্তরে বিনয় ও আরজি তৈরি করে। কিন্তু আজ আমরা ইফতারের
নামে যে রাজকীয় ভোজের আয়োজন করি, তা ক্ষুধার সেই মহিমাকে
হত্যা করে। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ অনেক মুসলিম দেশে ইফতারের পর যে পরিমাণ খাবার
ডাস্টবিনে যায়, তা ইসলামের মৌলিক দর্শনের পরিপন্থী।
খোদায়ী নূরের জায়গা হবে কোথায়
আহলুল বাইয়েতের
(আ.) জীবন ছিল কৃচ্ছ্রসাধন ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মাওলা আলী (আ.) এবং
সাইয়্যেদাতু নিসা ফাতিমাতুজ জাহরা (সা.আ.)-এর জীবনের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের
স্মরণে রাখা প্রয়োজন, যেখানে তাঁরা তিন দিন রোজা রেখে নিজেদের
ইফতারের খাবার মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে দিয়ে দিয়েছিলেন।
তাঁদের কাছে রমজান ছিল নিজের ক্ষুধা দিয়ে অন্যের ক্ষুধা মেটানোর মাস।
ইমাম জাফর সাদিক
(আ.) বলেছেন, "রমজানে তোমাদের জিহ্বা যেমন মিথ্যা থেকে বিরত
থাকে, তোমাদের পেটও যেন হারাম ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহার
থেকে মুক্ত থাকে।"
সুফি সাধক
মাওলানা রুমি (রহ.) তাঁর 'মসনবী'তে বলেছেন,
"তুমি যদি নফসকে রুটি দিয়ে ভরিয়ে দাও, তবে
তোমার ভেতরে খোদায়ী নূরের জায়গা হবে কোথায়?" তাসাউফের
ভাষায়, ইফতার হবে আধ্যাত্মিক মদিরা পানের ক্ষণ, পেটের ক্ষুধা মেটানোর উৎসব নয়। ফিলিস্তিনের ক্ষুধার্ত ভাই-বোনদের কথা
চিন্তা করলে একজন মুমিনের পক্ষে ইফতারে পনেরো পদের খাবার খাওয়া অসম্ভব। তাদের
হাহাকার আর আমাদের অপচয়—এই বৈষম্য ঈমানের জন্য এক বড় পরীক্ষা।
আমাদের
করণীয়
রমজান আমাদের
শেখায় 'কম খাওয়া, কম ঘুমানো এবং কম কথা বলা'। খাদ্য অপচয় করার অর্থ হলো একজন ক্ষুধার্ত
মানুষের হক নষ্ট করা। আসুন, আমরা এই কুসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসি।
আমাদের ইফতার হোক সাদামাটা, আমাদের মন হোক আল্লাহর প্রেমে
দেওয়ানা। রমজানের শেষ দশকে প্রবেশের আগেই আমরা যেন নিজেদের আমলনামা অপচয়ের কালিমা
থেকে মুক্ত করতে পারি। মনে রাখবেন, হাশরের ময়দানে এক দানা
রিজিকের জন্যও হিসাব দিতে হবে।
আল্লাহ আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইদের রক্ষা করুন এবং আমাদের হৃদয়কে তাকওয়ার নূরে আলোকিত করুন। আমীন।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।