ট্রাম্পের 'কাগুজে বাঘ' ও তেহরানের অটল প্রাচীরঃ মার্কিন অবরোধ বনাম মজলুমের প্রতিরোধ

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

ট্রাম্পের 'কাগুজে বাঘ' ও তেহরানের অটল প্রাচীরঃ মার্কিন অবরোধ বনাম মজলুমের প্রতিরোধ

ইসফাহানের এক পুরনো গলি। সেখানে একটি ছোট্ট কারখানায় বসে আছেন ষাটোর্ধ্ব তাঁতি আব্বাস। তাঁর আঙুলগুলো অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কার্পেটের সুতো বুনছে। বাইরে তখন পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো চিৎকার করে প্রচার করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের খবর। আব্বাসের মুখে কোনো বিকার নেই। তিনি শান্ত। বিগত ৪৭ বছর ধরে তিনি এই একই খবর শুনে আসছেন। তাঁর পাশে বসে থাকা তরুণ নাতি যখন চিন্তিত মুখে অবরোধের কথা জিজ্ঞেস করে, আব্বাস শুধু মুচকি হাসেন। তিনি জানেন, এই সুতোর বুননের মতোই তাঁদের প্রতিরোধও মজবুত

 

তেহরানের কোনো এক জেলে, সিরাজের কোনো কৃষক কিংবা ইসফাহানের এই তাঁতি—ইরানের সাধারণ থেকে অতি সাধারণ মানুষের কাছে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ আজ আর কোনো আতঙ্ক নয়। এটি তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে, যাকে তারা জয় করতে শিখেছে। আধুনিক ভূ-রাজনীতির শুষ্ক ছকে বসে পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা কখনোই বুঝতে পারেন না যে, মানুষের হৃদয় যখন কোনো আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হয়, তখন কোনো অর্থনৈতিক শেকল তাদের আত্মাকে বন্দি করতে পারে না

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবরোধঃ পরাশক্তির একটি 'কাগুজে বাঘ'

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তববাদ (Realism) তত্ত্ব বলে, শক্তিশালী রাষ্ট্র দুর্বলকে তার অর্থনৈতিক ও সামরিক পেশিশক্তির জোরে নিয়ন্ত্রণ করবে। এই তত্ত্বের ওপর ভর করেই বিগত ৪৭ বছর ধরে আগ্রাসী আমেরিকা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে চাপ প্রয়োগের ব্যর্থ চেষ্টা করে আসছে

 

সম্প্রতি আমেরিকার ক্ষ্যাপাটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সেই পুরোনো অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু করেছেন। তিনি হুংকার দিয়েছেন নতুন অবরোধের। কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গভীর বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের এই তথাকথিত অর্থনৈতিক অবরোধ আক্ষরিক অর্থেই একটি 'কাগুজে বাঘ'একটি দেশের অর্থনীতিকে যখন কয়েক দশক ধরে বাইরের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করা হয়, তখন সেই দেশ বাধ্য হয়েই একটি 'প্রতিরোধমূলক অর্থনীতি' (Resistance Economy) গড়ে তোলে

 

ইরান ঠিক সেটাই করেছে। তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, বিকল্প বাণিজ্য রুট এবং ব্রিকস (BRICS) বা সাংহাই কো-অপারেশনের মতো অ-পশ্চিমা জোটগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করেছে। ট্রাম্পের এই নতুন হুংকার হয়তো কাগজে-কলমে কিছু ডলারের হিসেবে হেরফের ঘটাবে, কিন্তু যে সাধারণ জনগণ বুকের ভেতর আত্মমর্যাদার আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে, তাদের দমিয়ে রাখতে এই কাগুজে বাঘ কতটুকু কাজে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সংঘাতঃ বিশ্লেষকদের নীরবতা ও তেহরানের নৈতিক বিজয়

ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে গত ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একটি মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। যখন ইরান, আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাত বেধে যায়, তখন পশ্চিমা থিংক-ট্যাংক এবং বাঘা বাঘা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ উপসংহার টেনেছিলেন—আমেরিকা ও ইসরায়েলই এই যুদ্ধে অনায়াসে জয়ী হবে। সামরিক বাজেট আর আধুনিক সমরাস্ত্রের পরিসংখ্যান দেখিয়ে তারা ইরানের নিশ্চিত পতনের ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন

 

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র কেবল অস্ত্রের হিসেব দিয়ে চলে না। ইরানের অসম্ভব সাহসিকতা, নিখুঁত কৌশল এবং মৃত্যুভয়হীন প্রতিরোধ সেই সব বাঘা বিশ্লেষকদের মুখে কুলুপ পরিয়ে দিয়েছে। তারা আজ নীরব। কারণ, সামরিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে ইরান এই যুদ্ধে একটি বিশাল 'নৈতিক বিজয়' লাভ করেছে

 

ইসলামী রাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক কথা হলো—আমরা বা কেউই যুদ্ধ কামনা করি না। রক্তপাত কোনো উৎসব নয়। কিন্তু যখন কোনো পরাশক্তি অবৈধভাবে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়, তখন তা বৈধভাবে প্রতিরোধ করা সেই দেশের অবিচ্ছেদ্য সার্বভৌমিক অধিকার। ইরান ঠিক সেই অধিকারেরই চর্চা করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, মিলিয়ন ডলারের মিসাইল দিয়ে হয়তো বহুতল ভবন ধসিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতির প্রতিরোধ স্পৃহাকে ধ্বংস করা যায় না

 

ইসলামী দর্শনঃ আহলুল বাইতের (আ.) ত্যাগের আয়নায় মজলুমের প্রতিরোধ

ইরানের এই অদম্য সাহসের উৎস কেবল ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নয়; এর শেকড় প্রোথিত আছে ইসলামী ইতিহাস ও দর্শনের গভীর আধ্যাত্মিকতায়। এই প্রতিরোধের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে আমাদেরকে কারবালার প্রান্তরে ফিরে যেতে হবে। আহলুল বাইতের (আ.) পবিত্র রক্তে লেখা সেই অমর দর্শন—"হায়হাত মিন্নাজ জিল্লাহ" (অপমান আমাদের থেকে যোজন যোজন দূরে)

 

যখন জালিম তার সর্বশক্তি নিয়ে মজলুমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন মজলুমের কাজ আত্মসমর্পণ করা নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্পষ্ট ঘোষণা করেছেনঃ

 

وَالَّذِينَ إِذَا أَصَابَهُمُ الْبَغْيُ هُمْ يَنْتَصِرُونَ

(উৎস: সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৩৯)

অর্থ: "এবং তারা (মুমিনরা) এমন, যারা আক্রান্ত হলে (সীমালঙ্ঘনের শিকার হলে) প্রতিরোধ গড়ে তোলে।"

 

ইসলামী দর্শনে 'আদল' বা ন্যায়বিচারের স্থান সবার ওপরে। জালিমের অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করা, সবরের (ধৈর্য) সাথে মোকাবিলা করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা—এগুলোই তেহরানের মূল শক্তি। আমেরিকা ও ইসরায়েলের মতো পরাশক্তিরা যখন আধুনিক যুগের 'ইয়াজিদ'-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ দিয়ে একটি জাতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে মারতে চায়, তখন সেই জাতি ইমাম হুসাইনের (আ.) আদর্শকে বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে যায়। এটাই সেই আধ্যাত্মিক শক্তি, যা পেন্টাগনের সুপারকম্পিউটারগুলো হিসাব করতে ব্যর্থ হয়

 

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভণ্ডামি ও দ্বৈত নীতি

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর যুদ্ধ এবং তার আগে-পরের ঘটনাপ্রবাহ বৈশ্বিক ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা ও ভণ্ডামিকে নগ্ন করে দিয়েছে। লিবারেলিজম বা উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার প্রবক্তারা যে জাতিসংঘ, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের বুলি আওড়ান, তা আজ চরম হাস্যকর

 

যখন ইসরায়েল ফিলিস্তিন বা লেবাননে নিরীহ নারী-শিশুর ওপর বোমাবর্ষণ করে, তখন পশ্চিমা বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক আইন একে 'আত্মরক্ষার অধিকার' বলে সাফাই গায়। কিন্তু যখন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ইরান তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া অবৈধ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বৈধ প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তখন সেই একই বিশ্বব্যবস্থা তাকে 'সন্ত্রাসবাদ' বা 'আঞ্চলিক হুমকি' হিসেবে আখ্যায়িত করে

 

এই দ্বৈত নীতি প্রমাণ করে যে, বর্তমান বৈশ্বিক আইন আসলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার একটি হাতিয়ার মাত্র। মানবাধিকারের বুলি আজ পরাশক্তিদের রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি। এই ভণ্ডামিপূর্ণ ব্যবস্থায় মজলুমের জন্য কোনো ন্যায়বিচার নেই, যদি না সে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য নিজেই সোজা হয়ে দাঁড়ায়

 

সংকট উত্তরণ ও ইসলামী সমাধানঃ উম্মাহর ঐক্যের ডাক

এই অসম বিশ্বব্যবস্থায় মুসলিম উম্মাহ এবং মজলুম রাষ্ট্রগুলোর মুক্তির পথ কী? সিয়াসা শারিয়্যাহ (ইসলামী রাষ্ট্রনীতি) এবং আধুনিক ভূ-কৌশলগত বাস্তবতার আলোকে এর সমাধান তিনটি মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে:

 

ক. অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা: ট্রাম্পের মতো নেতাদের কাগুজে বাঘকে চিরতরে অকেজো করতে হলে মুসলিম বিশ্বকে ডলারের আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি, নিজস্ব মুদ্রা বা স্বর্ণভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা চালু করা এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই

 

খ. ইত্তেহাদ বা উম্মাহর ঐক্য: পরাশক্তিগুলোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল'শিয়া-সুন্নি, আরব-অনারব বিভেদ তৈরি করে তারা মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের অস্ত্র বিক্রির বাজারে পরিণত করেছে। এই ষড়যন্ত্র বুঝতে হবে। জালিমের কোনো ধর্ম নেই, সে শুধুই জালিম। তাই মজলুমকে তার নিজ অস্তিত্ব রক্ষার্থেই ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে

 

গ. আদর্শিক দৃঢ়তা ও তাওয়াক্কুল: কূটনীতি ও সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি চূড়ান্ত ভরসা রাখতে হবে আল্লাহর ওপর। আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, জমিনের উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত মজলুমরাই পাবে, যদি তারা অবিচল থাকে

 

ইতিহাস জালিমকে ক্ষমা করে না

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ফেরাউন, নমরুদ কিংবা রোমান সাম্রাজ্য—সবাই একসময় নিজেদের অজেয় মনে করত। তাদের অহংকার, তাদের সামরিক জৌলুস এবং তাদের অর্থনৈতিক অবরোধ একসময় তাদের নিজেদের পতনেরই কারণ হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাগুজে অবরোধ কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক হুংকারও এর ব্যতিক্রম নয়

 

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সংঘাত একটি বার্তা দিয়ে গেছে—অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে সত্যকে চিরকাল চাপা দেওয়া যায় না। ইসফাহানের সেই তাঁতি আব্বাস যখন তার কার্পেটে শেষ সুতোটি গাঁথবেন, তখন হয়তো পশ্চিমা পরাশক্তির দম্ভের সুতোগুলো ছিঁড়তে শুরু করবে। জালিমের পতন এবং মজলুমের বিজয় কেবল একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনা নয়, এটি একটি ঐশী প্রতিশ্রুতি। আর সেই প্রতিশ্রুতির সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় আজ প্রহর গুনছে পুরো বিশ্ব

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default