শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিশাল এক কনভেনশন হল। আজ সেখানে 'আন্তর্জাতিক নাশিদ সন্ধ্যা'। হাজার হাজার মানুষের ভিড়, চারিদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ। হলের ভেতরে সুগন্ধি আর মানুষের গুঞ্জনে এক অনন্য আবহ তৈরি হয়েছে। মঞ্চের আলোকসজ্জা এমনভাবে করা হয়েছে যেন মনে হচ্ছে আকাশের এক টুকরো নীল মেঘ মাটিতে নেমে এসেছে। ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাফওয়ান—সে আজ রাতের প্রধান আকর্ষণ।
কিন্তু সাফওয়ানের ভেতরের জগতটা আজ এক শ্মশানের মতো শান্ত ও ধূসর। মঞ্চের এই তীব্র আলো তার চোখের মনিকে কষ্ট দিচ্ছে। সে দেখছে হাজারো চোখ তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। এই মানুষগুলো তাকে একজন 'পবিত্র নক্ষত্র' মনে করে। তারা ভাবে, সাফওয়ানের প্রতিটি সুর আর প্রতিটি শব্দ সরাসরি আরশ থেকে নেমে আসে। কিন্তু সাফওয়ান জানে, সেই নক্ষত্রটি আজ কক্ষচ্যুত হয়েছে। সে আজ জ্বলছে না, বরং খসে পড়ছে।
মঞ্চের জৌলুস বনাম হৃদয়ের অন্ধকার
সাফওয়ান মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল। তার পরনে দুধসাদা জুব্বা, কাঁধে কাশ্মীরি শাল। সে দেখতে ঠিক একজন আধ্যাত্মিক নেতার মতো। কিন্তু তার পকেটে থাকা ফোনটি যখন ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে, তখন সাফওয়ানের মনে হচ্ছে সে যেন জ্বলন্ত অঙ্গার বহন করছে। সাহেলা বারবার মেসেজ দিচ্ছে—সেও কি এই ভিড়ের মাঝে কোথাও বসে আছে? নাকি সে দূর থেকে সাফওয়ানের এই আধ্যাত্মিক অভিনয় দেখে মনে মনে মনে হাসছে?
সাফওয়ান গাইতে শুরু করল তার সবচেয়ে জনপ্রিয় নাশিদ—"হে প্রভু, আমায় ক্ষমা করো।" তার কণ্ঠ যখন হলের চারদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন শ্রোতাদের মাঝে কান্নার রোল পড়ে গেল। মানুষ আবেগে চোখ মুছছে। কিন্তু সাফওয়ান অনুভব করছে, তার নিজের চোখ দুটো আজ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। তার কণ্ঠে সেই পুরনো ‘কাইফিয়াত’ বা আধ্যাত্মিক আবেশ নেই। সে আজ কেবল শব্দ উচ্চারণ করছে, সে সুর দিচ্ছে না। সে যেন একটি মৃতদেহ, যাকে সুন্দর পোশাকে সাজিয়ে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশের রূপক বর্ণনাঃ ধোঁয়াশা ও মরীচিকা
হলের ভেতরে তখন ড্রাই-আইস দিয়ে তৈরি কৃত্রিম ধোঁয়া ছাড়া হয়েছে। সেই সাদা ধোঁয়ায় সাফওয়ানের চারপাশটা ঝাপসা হয়ে এল। এই ধোঁয়া যেন তার জীবনের বর্তমান অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সে এক কুয়াশার চাদরের মাঝে আটকা পড়ে আছে, যেখানে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মঞ্চের ওপর থেকে সে দেখতে পাচ্ছে মরিয়মকে—সে একদম সামনের সারিতে বসে আছে।
মরিয়মের মুখটা এক শান্ত হ্রদের মতো। তার চোখে কোনো উত্তেজনা নেই, আছে কেবল এক গভীর বিষাদ মেশানো ভালোবাসা। সাফওয়ান যখন গাইছে 'ক্ষমা করো', তখন মরিয়মের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সেই অশ্রু কি সাফওয়ানের সুরের জন্য? নাকি সে বুঝতে পেরেছে তার স্বামী আজ এক বিরাট ভণ্ডামির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে?
সাফওয়ানের মনে পড়ল খালিদ হোসাইনির সেই কথা—"এক হাজার মিথ্যের চেয়ে একটি সত্য অনেক বেশি ভারী।" সাফওয়ান আজ হাজার হাজার মানুষের সামনে মিথ্যে আধ্যাত্মিকতা পরিবেশন করছে। সে নিজেকে একজন নক্ষত্র মনে করত, কিন্তু আজ সে বুঝল নক্ষত্র যখন খসে পড়ে, তখন সে আগুনের পিণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয়।
মানসিক দ্বন্দ্ব ও ইমানের আর্তনাদ
নাশিদের মাঝপথে সাফওয়ানের দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। তার মনে হলো, হলের বাতাস ফুরিয়ে গেছে। এই যে মানুষের এত প্রশংসা, এত এত 'মাশাআল্লাহ' আর 'সুবহানাল্লাহ'—এগুলো আজ তার কানে তপ্ত বালুর মতো লাগছে, মনে হচ্ছে তার কর্ণকুহরে গলিত সিসা ঢেলে দিচ্ছে। সে এক সময় এসব প্রশংসার জন্য তৃষ্ণার্ত থাকত, কিন্তু আজ সে বুঝল এই প্রশংসা আসলে এক মস্ত বড় বিষ। এটি মানুষকে নিজের ভুল দেখতে দেয় না। এটি মানুষের ভেতরের শয়তানকে পুষ্ট করে।
সে যখন গানের কলি ধরল—"আমার অন্তরের খবর তুমিই জানো হে রব"—তখন তার বুকটা যেন কেউ চেপে ধরলো, হৃদয়টা কেঁপে উঠল। সত্যিই তো, আল্লাহ তো সব জানেন! তিনি দেখছেন এই দামী জুব্বার নিচে একটি কলুষিত হৃদয়। তিনি দেখছেন এই সুরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিষিদ্ধ কামনার দহন। সাফওয়ানের মনে হলো, এখনই হয়তো আকাশ ভেঙে পড়বে। এখনই হয়তো তার সব খ্যাতি মাটির সাথে মিশে যাবে। তার সব যশ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে।
প্রথম ফাটলঃ একটি আকস্মিক ঘটনা
নাশিদ শেষ করে সাফওয়ান যখন মঞ্চ থেকে নামছিল, তখন এক তরুণ তার হাত ধরল। ছেলেটির চোখে জল। সে বলল, "সাফওয়ান ভাই, আপনার এই নাশিদ শুনে আমি পরকিয়ার পথ থেকে ফিরে এসেছি। আমি আমার স্ত্রীকে কথা দিয়েছি আমি আর কোনোদিন ভুল পথে যাব না।"
সাফওয়ান পাথরের মতো জমে গেল। তার মনে হলো কে যেন তাকে সপাটে সপাট চড় মেরেছে। যে গুনাহে সে নিজে ডুবে আছে, সেই গুনাহ থেকে অন্যকে বাঁচানোর কৃতিত্ব সে নিচ্ছে? এর চেয়ে বড় পরিহাস এর বড় আত্ম-প্রবঞ্চনা আর কী হতে পারে! সে কোনোমতে একটা শুকনো হাসি দিয়ে ভিড় ঠেলে মেকআপ রুমের দিকে দৌড়াল।
মেকআপ রুমে ঢুকে সে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল। আয়নার সামনে গিয়ে সে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল। আয়নায় সে দেখল একজন সুশ্রী মানুষকে, কিন্তু তার মনে হলো আয়নাটি চিৎকার করে বলছে—"ওরে ভণ্ড! ওরে আত্ম-প্রবঞ্চক!! তুই খসে পড়া এক নক্ষত্র, যার আলো অনেক আগেই নিভে গেছে, কেবল মানুষের চোখে মরীচিকা হয়ে আছিস!"
বাইরে তখনো হাততালির শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সাফওয়ানের কানে বাজছে সাহেলার সেই শেষ মেসেজের টোন। সে কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা বের করল। সাহেলা লিখেছে—"আপনার স্টেজ পারফরম্যান্স খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু আপনার চোখের সেই অপরাধবোধটা আমি দূর থেকে অনুভব করেছি। আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?"
সাফওয়ান ঘামতে শুরু করল। সাহেলা তাকে চিনে ফেলেছে। সাহেলা জানে সাফওয়ান আজ আর সেই 'পবিত্র শিল্পী' নেই। সে এখন সাহেলার হাতের পুতুল। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় টোকা পড়ল।
"সাফওয়ান, তুমি কি ভেতরে? আমি মরিয়ম।"
সাফওয়ানের হাত থেকে ফোনটা ফ্লোরে পড়ে গেল। ফোনের স্ক্রিনটা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, কিন্তু নীল আলোটা তখনো মিটমিট করছে। নক্ষত্রের পতন কি আজই পূর্ণতা পাবে?
ফোনের স্ক্রিন আর মরিয়মের শান্ত কণ্ঠ—সাফওয়ান কি পারবে এই মুহূর্তে নিজেকে সামলাতে? নাকি মরিয়মের একটি সাধারণ প্রশ্নই তার সব গোপন সত্যকে টেনে বের করে আনবে? জানতে চোখ রাখুন আমাদের এই সেইটে।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।