ইসলামিক

ইসলামিক

সাহিত্য

সাহিত্য

আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক

কর্পোরেট

কর্পোরেট

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ

বইপত্র

বইপত্র

সম্পাদকের পছন্দ

এই সপ্তাহের সেরা

সর্বশেষ লেখা

অসমাপ্ত স্টেশনের ট্রেন যাত্রী

অসমাপ্ত স্টেশনের ট্রেন যাত্রী

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়শুক্রবার, আগস্ট ২১, ২০২৬মন্তব্য করুন

অসমাপ্ত স্টেশনের যাত্রী

প্রথম খণ্ড: মোহ ও মরীচিকা

অধ্যায় ১: বাসি খবরের ঘ্রাণ ও বড়দলের নিস্তব্ধ দুপুর

সাতক্ষীরার আশাশুনি। জায়গাটার নাম বড়দল।

ইটপাথরের শহরের যান্ত্রিক কোলাহল, যানবাহনের ধোঁয়া আর ব্যস্ততার নরক থেকে বহুদূরে এক শান্ত, স্নিগ্ধ জনপদ। এখানকার প্রকৃতি যেন অন্য কোনো সময়ের সাক্ষী। কপোতাক্ষ নদের নোনা পানির ঘ্রাণ এখানকার বাতাসে লেপটে থাকে। সকালের সোনাঝরা রোদ কিংবা দুপুরের তন্দ্রাচ্ছন্ন থমথমে ভাব—সব মিলিয়ে বড়দলে সময় বড্ড ধীরলয়ে হাঁটে। শহরের মানুষেরা যখন ভবিষ্যতের ইঁদুরদৌড়ে নিজেদের অস্তিত্ব ক্ষয় করতে ব্যস্ত, বড়দলের মানুষ তখনো প্রাগৈতিহাসিক ছায়ায় জিরিয়ে নেয়।

দুপুরের কড়া রোদ যখন টিনের চালে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে, তখন পুরো গ্রামটা এক অলস ঘুমে তলিয়ে যায়। মাঝে মাঝে কেবল দূরে কোনো গাছের ডালে একজোড়া ঘুঘুর ডাক কিংবা কপোতাক্ষের বুকে জেলের নৌকার বইঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ সেই নীরবতা ভেঙে দেয়। জীবন এখানে খুব ছিমছাম, বড্ড সরল এবং মাটির সাথে গাঁথা।

এই ছায়াঘেরা নিস্তব্ধতার মাঝেই দিন কাটে আবিরের।

সময়টা ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। সদ্য যৌবনে পা রাখা এক টগবগে তরুণ। চোখে তার একরাশ সোনালী স্বপ্ন, বুকে দুনিয়া জয়ের দুর্বার স্পৃহা। বড়দলের একটি স্বনামধন্য এনজিওর শাখায় সে তার কর্মজীবন শুরু করেছে। প্রতিদিনের একটি নির্দিষ্ট রুটিন আছে তার। সকালে ঘুম থেকে জেগে গ্রামের মেঠো ধূলিমলিন পথ ধরে বাই-সাইকেল চালিয়ে এনজিও’র কিস্তির টাকা আদায় করা, সবুজ ঘাসে ভরা ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটা, মেঠো বাতাসের সাথে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের খোঁজ নেওয়া এবং মাস শেষে কিছু কাগুজে নোটের হিসাব মেলানো।

কিন্তু মানুষের আত্মা তো কেবল কাগুজে নোটে বাঁচে না।

তাতে পেট হয়তো ভরে যায়, কিন্তু মনের অতল গহ্বরটুকু সবসময় এক অজানা তৃষ্ণায় হাহাকার করে। সে খোঁজে এমন কিছু, যা তাকে জড় পদার্থ বা নিছক হিসাব-নিকাশ থেকে বের করে অনন্তের সাথে যুক্ত করবে। আবিরের ভেতরেও সেই সুপ্ত তৃষ্ণা কাজ করত। সে সাহিত্য ভালোবাসত। খবরের কাগজের পাতায় চোখ রাখতে ভালোবাসত। শব্দের জাদুতে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে তার ভীষণ ভালো লাগত।

তবে বড়দলে যোগাযোগের বড় অভাব ছিল।

এখানে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি দূরের কথা, সময়মতো খবরের কাগজটাও পৌঁছাত না। আজকের দুনিয়ায় বড় বড় শহরে কী ঘটছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা দেশের কী হাল—সেসব এখানকার মানুষ জানতে পারত ঠিক একদিন পর। ডাকপিয়ন যখন তার পুরোনো জংধরা সাইকেলের বেল বাজিয়ে মেঠো পথ বেয়ে ধুলো উড়িয়ে আসত, তখন সে নিয়ে আসত গতকালের বাসি পত্রিকা।

শহরের মানুষের কাছে যা বাসি ও অপ্রাসঙ্গিক, বড়দলের মানুষের কাছে সেটাই ছিল নতুন বিশ্বের জানালা। এই বাসি খবরগুলোই তাদের একঘেয়ে জীবনে নিয়ে আসত উত্তেজনার ছোঁয়া।

দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার।

দুপুরের চড়া রোদ কিছুটা নরম হয়ে এসেছে। বাতাসে হালকা একটা ভ্যাপসা গরম আর মিষ্টি আলস্য। আবির তার কাঠের পুরোনো ডেস্কে বসে গত মাসের হিসাবের খাতা মেলাচ্ছিল। দূরে কপোতাক্ষের পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন মসজিদটি থেকে জোহরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে এল।

‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’।

মহান রবের সেই পবিত্র আহ্বানে সাড়া দিয়ে আবির তার কলমটা টেবিলে রাখল। অজু করার জন্য সে যখন সবেমাত্র পানির পাত্র হাতে নিয়েছে, ঠিক তখনই অফিসের বারান্দায় সাইকেলের চাকা ব্রেক কষার পরিচিত শব্দ শোনা গেল।

"আবির বাবু, ও আবির বাবু!" ভাঙা গলায় হাঁক দিলেন হাশেম চাচা।

হাশেম চাচা এই বয়সেও সাইকেল চালিয়ে ডাক বিলি করেন। তার পরনের খাকি রঙের পোশাকটা ঘামে ভিজে পিঠের সাথে লেপ্টে আছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, কিন্তু চোখেমুখে একটা চিরচেনা দায়িত্ববোধ।

আবির পানির পাত্র রেখে বারান্দায় বেরিয়ে এল। "কী খবর চাচা? আজ এত দেরি হলো যে?"

হাশেম চাচা কপাল থেকে ঘাম মুছতে মুছতে মুচকি হাসলেন। "আর বলেন না বাবু। মেঠো রাস্তায় আজ মাটি কেটে কী যেন ঠিক করতেছে, তাই সাইকেল টাইনা আনতে হয়রান হয়ে গেছি। এই নেন আপনার কাগজ।"

হাশেম চাচা সাইকেলের হ্যান্ডেলের সাথে ঝোলানো চামড়ার ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা একটা পত্রিকা বের করে দিলেন।

পত্রিকাটি হলো 'প্রথম আলো'। গতকালের ছাপানো কাগজ।

আবির পত্রিকাটা নিজের হাতে তুলে নিল। কাগজের সেই পরিচিত সোঁদা গন্ধটা তার নাকে এসে লাগল। সে অজুর কথা সাময়িকভাবে ভুলে গিয়ে বারান্দার কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। কাজের ফাঁকে 'ছুটির দিনে' ক্রোড়পত্রটি আলতো করে খুলল সে।

অলস ও উদাসীন ভঙ্গিতে পৃষ্ঠায় চোখ বোলাতে বোলাতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি একটি জায়গায় থমকে গেল।

তার হৃদস্পন্দন যেন এক লহমায় থেমে গেল। বুকটা ধক করে উঠল। চোখের পাতা আর নড়ছে না।

একটি জাতীয় সাহিত্য প্রতিযোগিতার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। আর সেই লেখার ভিড়ে জ্বলজ্বল করছে তার নিজের নাম! প্রথম স্থান অধিকার করেছে আবির! শুধু নামই নয়, তার পুরো নাম এবং বড়দলের সেই আশাশুনির ঠিকানা পর্যন্ত মোটা হরফে ছাপা হয়েছে।

মুহূর্তের জন্য আবিরের মনে হলো, চারপাশের পৃথিবী যেন থমকে গেছে।

দূরের মসজিদের আজানের আওয়াজটা কেমন যেন মিলিয়ে গেল। সিলিং ফ্যানের পরিচিত কট কট শব্দটা আর কানে আসছে না। একটা অদ্ভুত আনন্দ, একটা শিরশিরে বিদ্যুৎ তরঙ্গ তার সারা শরীরে খেলে গেল। তার হাতের আঙুলগুলো সামান্য কাঁপতে শুরু করল।

মানুষের মন বড়ই অদ্ভুত এবং রহস্যময় এক গোলকধাঁধা।

এক টুকরো সাধারণ কাগজের বুকে সামান্য কালো কালির আঁচড়ে নিজের নাম দেখলে সে ভাবে, সে বুঝি আসমান জয় করে ফেলেছে! এই বিশাল পৃথিবীর মানচিত্রে তার অস্তিত্ব যেন হঠাৎ করেই অনেক বেশি উজ্জ্বল ও মূল্যবান হয়ে উঠেছে। তার ভেতরের সুপ্ত অহংকার খুব সন্তর্পণে জেগে উঠতে চাইল।

ইসলামের সুফি সাধক ও দার্শনিক ইমাম গাজ্জালি (রহ.) মানুষের এই মনস্তত্ত্ব নিয়ে দারুণ এবং গভীর এক কথা বলেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দুনিয়ার খ্যাতি ও যশ হলো মরীচিকার মতো। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সুমিষ্ট পানির ঝরনা, তৃষ্ণার্ত মানুষ তার পেছনে ছুটে চলে। কিন্তু কাছে গেলে সে কেবলই বালুচর দেখতে পায়। খ্যাতি মানুষের আত্মার তৃষ্ণা মেটায় না, বরং তৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়। মানুষের প্রশংসা হলো আত্মার জন্য এক নীরব ও মিষ্টি বিষ, যা মানুষের ভেতর থেকে আল্লাহর প্রতি নিখাদ মুখাপেক্ষিতা কমিয়ে দেয় এবং তাকে অহংকারী করে তোলে।

কিন্তু তখন সদ্য তরুণ আবিরের মনে সেই আধ্যাত্মিক দর্শনের গভীরতা বোঝার মতো পরিপক্বতা ছিল না।

তার ভেতরে কেবল জেগে উঠল সাময়িক খ্যাতির তৃষ্ণা। সে বারবার নিজের নামটা পড়তে লাগল। মনের অজান্তেই তার শুষ্ক ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বিজয়ী হাসির রেখা। তার অবচেতন মন তাকে বোঝাতে চাইল, "তুমি সাধারণ কেউ নও। তোমার মাঝে বিশেষ প্রতিভা আছে।"

সেদিন জোহরের নামাজে আবিরের মন বিন্দুমাত্র বসল না।

সে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল ঠিকই, কিন্তু তার মনের কোণে ভাসতে লাগল ছাপার অক্ষরে লেখা নিজের নামটা। শয়তান মানুষের ইবাদতের গোড়ায় খুব সূক্ষ্মভাবে দুনিয়ার মোহ আর আত্মপ্রীতির বিষাক্ত বীজ বুঁনে দেয়। আবির তখনো তা টেরই পেল না।

পত্রিকায় নাম ছাপার সেই তীব্র উত্তেজনা আস্তে আস্তে ফিকে হতে সময় লাগল কয়েক দিন। গ্রামের সেই একঘেয়ে রুটিন, কিস্তি আদায় আর ধুলোবালিভাঙ্গা জীবন আবার তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরে এল। আবিরও নিজের কাজে মন দিল। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি যে, ওই ক্রোড়পত্রের একটা ছোট্ট কলাম তার সাজানো গোছানো জীবনে কী এক কালবৈশাখী ঝড় বয়ে নিয়ে আসতে চলেছে।

ডিসক্লেমার

এই উপন্যাসের সমস্ত চরিত্র, ঘটনা, পটভূমি এবং সংলাপ সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তব জীবনের কোনো ব্যক্তি, জীবিত বা মৃত, অথবা কোনো বাস্তব ঘটনার সাথে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া গেলে, তা সম্পূর্ণই অনিচ্ছাকৃত এবং নিছক কাকতালীয় মাত্র। লেখকের উদ্দেশ্য কেবল মানবিক অনুভূতি, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির একটি রূপক চিত্র ফুটিয়ে তোলা।

পরবর্তী পর্ব পড়তে চোখ রাখুন আমাদের এই সাইটে-

শেয়ার করুন: f W t ➤ in
এই লেখার মেধাস্বত্ব লেখক ও এই সাইটের। লিখিত অনুমতি ছাড়া লেখার অংশবিশেষ বা সম্পূর্ণ অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না।

মন্তব্যসমূহ