বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মানবসভ্যতা বাহ্যিক চাকচিক্য, আকাশচুম্বী প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বৈষয়িক জাঁকজমকের এক চরম শিখরে আরোহণ করেছে। কিন্তু প্রদীপের নিয়ে অন্ধকারের মত এই চোখধাঁধানো আলোর নিচেই জমাট বেঁধেছে এক ঘোর অন্ধকার। সমাজবিজ্ঞানের চশমায় এবং কুরআন-সুন্নাহর শাশ্বত মানদণ্ডে যখন আমরা বর্তমান বিশ্বকে বিশ্লেষণ করি, তখন একটি নির্মম সত্য উন্মোচিত হয়—মানবসমাজ আজ এক চরম নৈতিক ও আত্মিক দেউলিয়াত্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় 'Anomie' বা সামাজিক নৈরাজ্য এবং ইসলামী পরিভাষায় 'জাহিলিয়াত'। বাহ্যিকভাবে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও, মানবাত্মার ভেতরটা আজ সম্পূর্ণ অন্তঃসারশূন্য।
১. সংকটের স্বরূপ: সমাজবৈজ্ঞানিক ও ইসলামিক দৃষ্টিকোণ
বর্তমান সংকটের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ‘দ্বিমুখিতা’ বা কপটতা। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে "সামাজিক মুখোশ পরা" (Social Masking), যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত অভিনয় করছে। ইসলামের ভাষায় যার প্রকৃত নাম—নেফাক (মুনাফিকী)।
আজকের কর্পোরেট লিডারদের মুখে 'মানবসম্পদ উন্নয়ন'-এর বুলি কিন্তু অন্তরে শোষণ; চাটুকারিতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ; কসাই ডাক্তার, ঘুষখোর ইঞ্জিনিয়ার, লেবাসধারী আলেম কিংবা অনৈতিক শিক্ষকের যে চিত্র আমরা দেখছি—তা মূলত আমানতের খেয়ানত এবং সামাজিক চুক্তির চরম লঙ্ঘন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুনাফিকের যে লক্ষণগুলো বলেছেন, তা আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দৃশ্যমান:
**آيَةُ المُنَافِقِ ثَلاَثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ**
“মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় সে তার খেয়ানত করে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩৩)
মানুষের লোভ আজ এতটাই লাগামহীন যে, পরকীয়া, জেনা-ব্যভিচার, পর্নোগ্রাফি আসক্তি, খুন, গুম, সাইবার বুলিং ও হ্যাকিংয়ের মতো অপরাধগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এগুলো এক নগ্ন প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছে। মহান আল্লাহ আল-কুরআনে এই মনস্তত্ত্বেরই চমৎকার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন:
> **أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ . حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ** *“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপস্থিত হও।” (সূরা আত-তাকাসুর: ১-২)*
যখন একটি সমাজের পারিবারিক বন্ধন—যা সমাজের ক্ষুদ্রতম ও সবচেয়ে শক্তিশালী একক (Unit)—সেখানেও স্বামী-স্ত্রী বা বাবা-ও-সন্তানের মধ্যে স্বার্থের অভিনয় ঢুকে পড়ে, তখন বুঝতে হবে সেই সভ্যতার পতন একেবারেই দ্বারপ্রান্তে।
২. রন্ধ্রে রন্ধ্রে পচনের মূল কারণ কী? ইসলামিক সমাজবিজ্ঞানীদের মতে এই অবক্ষয়ের পেছনে তিনটি মূল কারণ রয়েছে:
১. ‘অন্তরাত্মা’ বা ‘ক্বলব’-এর মৃত্যু: মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের শরীর নয়, তার আসল চালিকাশক্তি হলো রুহ বা আত্মা। যখন মানুষ আল্লাহ কে ভুলে কেবল বস্তুবাদী (Materialistic) সুখের পেছনে ছোটে, তখন তার অন্তরাত্মা মরে যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
> **فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَٰكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ**
“বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় বক্ষস্থিত হৃদয়।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৪৬)
>
২. জবাবদিহিতার অভাব (The Absence of Accountability): সমাজবিজ্ঞান বলে, মানুষ যখন মনে করে তার অপরাধ অলক্ষিত থেকে যাবে, তখন তার অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। আর ইসলাম শেখায় ‘আখিরাত’ বা পরকালের জবাবদিহিতা। যখন সমাজ থেকে আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) এবং পরকালের বিচার দিবসের বিশ্বাস উঠে যায়, তখন মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থে যেকোনো জঘন্য কাজ করতে দ্বিধা করে না।
৩. ভোগবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসন (Hyper-Consumerism): আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে শেখায়—"যেকোনো উপায়ে ভোগ করো এবং নিজেকে প্রদর্শন করো।" এই প্রদর্শনপ্রিয়তা (ইসলামী পরিভাষায় যাকে 'রিয়া' বা লোকদেখানো আমল বলা হয়) মানুষকে ভেতরে শূন্য করে বাইরে চাকচিক্যময় হতে বাধ্য করে।
৩. এই সংকট থেকে উত্তরণ ও নিরসনের স্থায়ী উপায়
এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করতে হলে শুধু আইনের শাসন বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি আমূল আত্মিক ও সামাজিক বিপ্লব। নিচে এর স্থায়ী সমাধানের পথগুলো তুলে ধরা হলো:
ক) তাকওয়া এবং আত্মশুদ্ধি (Tazkiyah)
যেকোনো পরিবর্তনের সূচনা হতে হবে ব্যক্তির ভেতর থেকে। যতক্ষণ না মানুষের অন্তরে এই বিশ্বাস দৃঢ় হবে যে, অন্ধকার ঘরে করা একটি সাইবার অপরাধ বা টেবিলের নিচ দিয়ে নেওয়া ঘুষের টাকাও মহাবিশ্বের প্রতিপালক দেখছেন, ততক্ষণ সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
> **إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ**
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে।” (সূরা আর-রাদ: ১১)
ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিদিন আত্মসমীক্ষা (মুহাসাবা) করতে হবে—আমি কি আজ কারও সাথে অভিনয় করলাম? আমার উপার্জন কি হালাল?
খ) নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে পারিবারিক কাঠামো পুনর্গঠন
পরিবার হলো চরিত্র গঠনের প্রথম পাঠশালা। সন্তানদের কেবল জিপিএ-৫, উচ্চ বেতন বা কর্পোরেট সাফল্যের অন্ধ ইঁদুর-দৌড়ে নামানো বন্ধ করতে হবে। তাদের শেখাতে হবে সততা, সহানুভূতি এবং হালাল-হারামের স্পষ্ট পার্থক্য। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দায়িত্বের পরিধি স্পষ্ট করে বলেছেন:
> **كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ**
“তোমাদের প্রত্যেকেই রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৮৯৩)
গ) ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)
সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে "Social Policing" বা সামাজিক প্রতিরোধ। সমাজে অন্যায় দেখলে মুখ বুজে থাকা বা "আমার কী" বলে এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিই আজ অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসলামিক নির্দেশনা হলো, সামাজিকভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
> **مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ**
“তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে দেয়; যদি সে (তাতে) সমর্থ না হয়, তবে যেন মুখ দিয়ে (প্রতিবাদ) করে; আর যদি সে (তাতেও) সমর্থ না হয়, তবে যেন অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে (ও পরিবর্তনের পরিকল্পনা করে)—আর এটা হলো ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৯)
ঘ) কর্পোরেট ও সামাজিক ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা
নেতৃত্ব বা চেয়ার কোনো ভোগের বস্তু নয়, এটি একটি গুরুভার আমানত। কর্পোরেট লিডারদের মুখে ও কাজে একতা আনতে হবে। শ্রমিক বা অধস্তনদের অধিকার সময়মতো বুঝিয়ে দেওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে চাটুকারিতার বদলে যোগ্যতার মূল্যায়ন করা সুন্নাহর অপরিহার্য অংশ।
বর্তমান বিশ্বের এই ক্রান্তিকাল বা নাজুক অবস্থা এক দিনে তৈরি হয়নি, আর এর থেকে মুক্তির পথও সহজ নয়। তবে হতাশা কোনো মুমিনের বা সমাজবিজ্ঞানীর কাম্য হতে পারে না। বাহ্যিক এই নকল চাকচিক্যের মোহ ত্যাগ করে আমাদের আবার ফিরে আসতে হবে সরল, প্রাঞ্জল এবং খোদাভীতিপূর্ণ বাস্তব জীবনে। যখন সমাজের একদল মানুষও অভিনয়ের মুখোশ ছুঁড়ে ফেলে সত্য, সততা এবং ইনসাফের পথে বুক টান করে দাঁড়াবে, তখনই এই সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া অন্ধকার দূর হতে শুরু করবে। অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটি ছোট মোমবাতির আলোও তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর সেই আলোর নাম হলো—ঈমান, তাকওয়া এবং নৈতিকতা।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।